জুলাই ২৮, ২০২০ ১৪:০৩ Asia/Dhaka
  • প্রখ্যাত ইরানি চিন্তাবিদ ও আরেফ বা সুফি সাধক আলী বিন ওসমান হুযুইরি

গত কয়েক পর্বের ধারাবাহিকতায় আজও আমরা খ্রিস্টীয় একাদশ শতকের তথা হিজরি চতুর্থ ও পঞ্চম শতকের প্রখ্যাত ইরানি চিন্তাবিদ ও আরেফ বা সুফি সাধক আলী বিন ওসমান হুযুইরি তথা দাতাগঞ্জ বখশ (র)’র চিন্তাধারা ও অবদান সম্পর্কে আলোচনা করব।

গত পর্বের মত আজও আমরা তথা হিজরি চতুর্থ ও পঞ্চম শতকের প্রখ্যাত ইরানি চিন্তাবিদ ও আরেফ বা সুফি সাধক আলী বিন ওসমান হুযুইরি তথা দাতাগঞ্জ বখশ (র)’র বিখ্যাত বই কাশফুল মাহজুব তথা 'পর্দাবৃতের পর্দা উন্মোচন' শীর্ষক বইটির নানা দিক নিয়ে আলোচনা করব।

কাশফুল মাহজুব তথা 'পর্দাবৃতের পর্দা উন্মোচন' শীর্ষক বইটিতে রয়েছে ৫টি অধ্যায়। প্রথম অধ্যায়ে রয়েছে বইটির ভূমিকা। দ্বিতীয় অধ্যায়ে রয়েছে প্রখ্যাত সুফিবাদী আলেম ও শেইখদের পরিচয়ের পটভূমি। এ অধ্যায়ে তাসাউফ বা সুফিবাদের নানা পরিভাষার ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। তৃতীয় অধ্যায়ে রয়েছে প্রখ্যাত সুফিবাদী আলেম ও শেইখদের পরিচয়। চতুর্থ অধ্যায়ে সুফিদের নানা সম্প্রদায় বা ফেরকার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। কাশফুল মাহজুব তথা 'পর্দাবৃতের পর্দা উন্মোচন' শীর্ষক বইটির পঞ্চম অধ্যায়ে খোদাপ্রেমের পথের নানা ধরনের পর্দা বা বাধা দূর করার উপায় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

আবু সাইয়িদ হুজুইরির প্রশ্নের জবাব দেয়াকে উপলক্ষ করে আলী বিন ওসমান হুযুইরি তথা দাতাগঞ্জ বখশ কাশফুল মাহজুব তথা 'পর্দাবৃতের পর্দা উন্মোচন' শীর্ষক বইটি লিখেছিলেন। আবু সাইয়িদ জানতে চেয়েছিলেন তাসাউফ বা সুফিবাদের পন্থা, ধর্ম বা মাজহাবগুলোর বর্ণনা ও খোদাপ্রেমের নানা পর্যায় এবং অন্তর ও বিবেকের ওপর যেসব কারণে পর্দা পড়ে ইত্যাদি কয়েকটি বিষয়ে। জবাবে দাতাগঞ্জ এ বইটিতে এসব বিষয়ে ব্যাখ্যা করেন এবং খোদা-প্রেমের পথের ১১টি বাধা বা পর্দা উন্মোচন সম্পর্কে আলোচনা করেন। তিনি এসব প্রশ্নের অবতারণা করে বড় বড় সুফি সাধক ও আরেফ-মাশায়েখের মুখ দিয়ে তাসাউফ তথা খোদাপ্রেমের পথ মানুষের কাছে তুলে ধরার অঙ্গীকার করেছেন তার কাশফুল মাহজুব নামক বইয়ের ভূমিকায়। গোটা বইটির আলোচনা এসব প্রশ্নেরই জবাব এবং বইটির নানা অধ্যায়ের আলোচনাগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।  তবে গোটা বইয়ের মূল সুর বা বক্তব্য আবর্তিত হয়েছে খোদাপ্রেমের উপায় অনুসন্ধান ও কুপ্রবৃত্তি-দমন বা নাফসে আম্মারাকে দমনসহ এ পথের বাধাগুলো দূর করা সম্পর্কে।

কাশফুল মাহজুব বইয়ের আলোচনার পরতে পরতে, বিশেষ করে ভূমিকাসহ নানা ফের্কার বিশ্বাস ও বিখ্যাত ব্যক্তিদের মতামত উপস্থাপন ও বিশ্লেষণের সময় লেখকের জোরালো উপস্থিতি বা অস্তিত্ব খুব ভালোভাবেই বোঝা যায়।

বিভিন্ন বিষয়ে বিখ্যাত ব্যক্তিদের বক্তব্য ও মতামত তুলে ধরে তিনি নিজেই বার বার এ বাক্যটি ব্যবহার করেছেন যাতে বলা হয়েছে: এবং আমি আলী বিন ওসমান বলছি যে বা আমার মত হল এই যে,... । নিজের নানা ঘটনার স্মৃতিচারণের মাধ্যমেও এ বইয়ে হুজুইরি নিজের উপস্থিতিকে জোরালো রেখেছেন। তার লেখার বিশেষ যে স্টাইলের কারণে কাশফুল মাহজুব বইটি গবেষকদের নজর কেড়েছে তা হল প্রথমেই কোনো বিষয় বা মতামতের সারাংশ ও সামগ্রিক বক্তব্য তুলে ধরা এবং এর পরে এর নানা অংশ ও বিভাগকে ভেঙ্গে ভেঙ্গে বিশ্লেষণ করা।  এ বইয়ের আরও একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল লেখকের শিক্ষকসুলভ ভঙ্গী ও ভাষা ব্যবহার। উপমা, কাহিনী ও কুরআন-হাদিসের উদ্ধৃতি বইটিকে করেছে সহজবোধ্য।

মহান আল্লাহর জ্ঞানের তুলনায় মানুষের জ্ঞান যে খুবই নগণ্য তা তুলে ধরতে গিয়ে কাশফুল মাহজুব বইয়ে দাতাগঞ্জ লিখেছেন, আমার জ্ঞানের বিষয়ে বলতে হলে বলতে হয় আমি কেবল এটাই জানি যে আমি কিছুই জানি না... তাই জ্ঞান অর্জন খুবই গুরুত্বপূর্ণ, পূর্ণতাগামী হওয়া জরুরি এবং মহান আল্লাহর জ্ঞানের তুলনায় মানুষের পরিপূর্ণ জ্ঞানও অজ্ঞতার সমতুল্য; আর প্রত্যেক মানুষেরই এই জ্ঞান থাকা দরকার যে সে জানে না বা অজ্ঞ।

দাতাগঞ্জের কাশফুল মাহজুব বইয়ের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল নানা শিক্ষণীয় বিষয় তুলে ধরার ক্ষেত্রে প্রশ্ন উত্থাপন, বিতর্ক ও সংলাপের বিশেষ ভঙ্গির ব্যবহার। ফলে বইটি পড়ার ক্ষেত্রে পাঠক একঘেয়েমি অনুভব করেন না। বিশেষ করে বিরোধীদের বোঝানোর ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি খুবই কার্যকর। দাতাগঞ্জ তথা হুজুইরি প্রখ্যাত সুফি ও আলেমদের মন্তব্য তুলে ধরা এবং নানা কাহিনী বর্ণনার ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। সুফিদের অন্য অনেক বইয়েও এই পদ্ধতির ব্যবহার দেখা যায়।

নানা মতকে পরস্পরের মুখোমুখি করে তুলে ধরা তথা বিতর্কের মাধ্যমে উপসংহারে যাওয়ার যে পদ্ধতি দাতাগঞ্জ কাশফুল মাহজুব বইয়ে ব্যবহার করেছেন তা শিক্ষণ ও যোগাযোগের অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি। তার এ বইয়ে দেখা যায় কখনও মানুষ ও খোদার মধ্যে বিতর্ক, মানুষ ও তার আত্মার মধ্যে বিতর্ক বা সংঘাত।  এ বইয়ের ৫ টি অধ্যায়েই সংলাপ ও বিতর্ক দেখা যায়।  জ্ঞান প্রমাণের অধ্যায় বা ‘বাবুল ইসবাতিল ইলম’ শীর্ষক অধ্যায়ে দাতাগঞ্জ দারিদ্র ও প্রাচুর্যকে তুলনা করেছেন দ্বান্দ্বিক বিষয় হিসেবে। একইভাবে তিনি এ অধ্যায়ে তুলনার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন মহান আল্লাহ ও তার দাস বা সৃষ্টি, দরবেশ ও শক্তিমান এবং বাস্তবতা ও কল্পনার মত বিষয়গুলোকে দ্বান্দ্বিক বিষয় হিসেবে।

দাতাগঞ্জ কাশফুল মাহজুব বইয়ে নানা বক্তব্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআন, হাদিস, আলেম বা মাশায়েখের কথা ও নানা কাহিনীকে দলিল বা যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন অত্যন্ত ব্যাপক মাত্রায়। আর এ বৈশিষ্ট্য বইটিকে করেছে যথেষ্ট প্রামাণ্য। বার্তাগত দিক থেকে এ বইটির সর্বত্র রয়েছে একই সুর বা বিষয়বস্তুগত ঐকতান।  #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/২৮

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।