জুলাই ২৯, ২০২০ ১৩:১৪ Asia/Dhaka

গত কয়েক পর্বের ধারাবাহিকতায় আজও আমরা খ্রিস্টীয় একাদশ শতকের তথা হিজরি চতুর্থ ও পঞ্চম শতকের প্রখ্যাত ইরানি চিন্তাবিদ ও আরেফ বা সুফি সাধক আলী বিন ওসমান হুযুইরি তথা দাতাগঞ্জ বখশ (র)’র চিন্তাধারা ও অবদান সম্পর্কে আলোচনা করব।

গত পর্বের মত আজও আমরা হিজরি চতুর্থ ও পঞ্চম শতকের প্রখ্যাত ইরানি চিন্তাবিদ ও আরেফ বা সুফি সাধক আলী বিন ওসমান হুযুইরি তথা দাতাগঞ্জ বখশ (র)’র বিখ্যাত বই কাশফুল মাহজুব তথা 'পর্দাবৃতের পর্দা উন্মোচন' শীর্ষক বইটির নানা দিক নিয়ে আলোচনা করব।

গত পর্বের আলোচনায় আমরা জেনেছি, কাশফুল মাহজুব তথা 'পর্দাবৃতের পর্দা উন্মোচন' শীর্ষক বইটিতে রয়েছে বড় ৫টি অধ্যায় ও নানা বিষয়ে ছোট ছোট উপ-অধ্যায়। দাতাগঞ্জ এ বইটিতে খোদা-প্রেমের পথের ১১টি বাধা বা পর্দা উন্মোচন সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। গোটা বইয়ের মূল সুর বা বক্তব্য আবর্তিত হয়েছে খোদাপ্রেমের উপায় অনুসন্ধান ও কুপ্রবৃত্তি-দমন বা নাফসে আম্মারাকে দমনসহ এ পথের বাধাগুলো দূর করা সম্পর্কে।

আলী বিন ওসমান হুযুইরি তথা দাতাগঞ্জ বখশ (র)’র বিখ্যাত বই কাশফুল মাহজুব তথা 'পর্দাবৃতের পর্দা উন্মোচন' শীর্ষক বইটির ভূমিকা কাঠামোগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই ভূমিকাতে রয়েছে সূচনার বক্তব্য, ৮টি অনুচ্ছেদ ও সমাপনী বক্তব্য। মহান আল্লাহ ও রাসুলের প্রশংসা এবং দরুদের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে সূচনার বক্তব্য। চার পঙক্তির আরবি ছন্দময় কবিতায় এ প্রশংসা উল্লেখিত হয়েছে। বিন্দুর মাঝে সিন্ধুর প্রতিফলনের মত এই কবিতার মধ্যে ফুটে ওঠে গোটা বইয়ের মূল বক্তব্য ও ভাব যা পাঠককে বইটির ইরফানি বা সুফি-তাত্ত্বিক প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা দেয়। এরপর লেখক দাতাগঞ্জ নিজের পরিচয় তুলে ধরেছেন এবং সহজ-সরল ভাষায় বইটি লেখার উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইঙ্গিত করেছেন। 

দাতাগঞ্জ কাশফুল মাহজুব বইয়ে নানা বক্তব্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআন, হাদিস, আলেম বা মাশায়েখের কথা ও নানা কাহিনীকে দলিল বা যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন অত্যন্ত ব্যাপক মাত্রায়। আর এ বৈশিষ্ট্য বইটিকে করেছে যথেষ্ট প্রামাণ্য।

হযরত দাতাগঞ্জ কাশফুল মাহজুব বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ে পবিত্র কুরআন ও হাদিসের উদ্ধৃতি এবং সুফি সাধনায় বিখ্যাত ব্যক্তিদের উদ্ধৃতির পাশাপাশি গল্প বা কাহিনীও তুলে ধরেছেন।  তিনি কাহিনী বা গল্পগুলো তুলে ধরার ক্ষেত্রে অসাধারণ দক্ষতা ও মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। ইরফান বা সুফি-সাধনার সঙ্গে সম্পর্কিত গল্প বা কাহিনী ফার্সি ক্লাসিক্যাল সাহিত্যের অতি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। ইরফানি বিষয়গুলোকে সাধারণ মানুষের কাছে খুব সহজভাবে তুলে ধরা তথা এসব বিষয়ের সহজ-সরল ব্যাখ্যাই ওইসব কাহিনী বা গল্প বর্ণনার প্রধান উদ্দেশ্য।

শীর্ষ-স্থানীয় সুফি-সাধকদের তৈরি করা শিক্ষামূলক নানা গল্প বা কাহিনী তাদের শিষ্যদেরকে খোদাপ্রেমে উজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে যুগে যুগে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। 

হযরত দাতাগঞ্জ কাশফুল মাহজুব বইয়ে যেসব গল্প লিখেছেন সেসব খুবই ছোট গল্প এবং সেসবের মধ্যে চরিত্রের সংখ্যাও খুব কম। ইরফানি বিষয় ছাড়াও নিজ দৃষ্টিভঙ্গি সহজে তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে এসব গল্পের মাধ্যমে। ধর্ম, ইরফান বা খোদাপ্রেমের গুঢ় তত্ত্ব ও জনগণ এসব গল্পের উপজীব্য। কোনো কোনো বিষয়ের ওপর খুব বেশি জোর দেয়ার জন্য হুজুইরি তথা দাতাগঞ্জ কখনও কখনও প্রায় একই গল্পের পুনরাবৃত্তি করেছেন সামান্য পরিবর্তন এনে। তার এসব গল্পের চরিত্রের সংখ্যা ও ঘটনার সংখ্যা খুবই কম হওয়ায় এবং গল্পের শুরু ও সমাপ্তি খুব কাছাকাছি হওয়ায় এসব গল্পের বার্তা বা মূল শিক্ষা খুব সহজেই পাঠকের কাছে অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আধুনিক গবেষকদের ভাষায় এসব গল্পকে মিনিমালিস্ট গল্প বলা যায়।

দাতাগঞ্জের এসব গল্পে রয়েছে অলৌকিকভাবে ঐশী প্রেরণার মাধ্যমে এবং সংযম সাধনা ও খোদাপ্রেমের অনুশীলনের মাধ্যমে অদৃশ্যের কোনো বার্তা শোনা বা উপলব্ধি করার মত ঘটনা। এসব ঘটনা অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ পরিস্থিতিতে সৃষ্ট বা মুহূর্তের মধ্যে ঘটে যাওয়া দৈব ঘটনার মত। কখনও কখনও এসব ঘটনা সুফি-সাধক বা গল্পের নায়কের ইচ্ছার বাইরেই ঘটে যায়। সাধারণ যুক্তিতে ব্যাখ্যাতীত এসব ঘটনার পরিস্থিতি অনেক সময় রহস্যাবৃতই থেকে যায়। আধুনিক যুগের অনেক গল্পেও এমন রহস্যময় ও অচিন্তনীয় ঘটনার ব্যবহার দেখা যায়। দাতাগঞ্জের অতি ক্ষুদ্র গল্পগুলোর প্লট সহজ মনে হলেও এবং গল্পের চরিত্র ও নায়ক নির্বাচন খুব কম সংখ্যায় ঘটলেও এ ধরনের গল্প নির্বাচনকে বড় বা দীর্ঘ কোনো জটিল গল্পের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক অংশকে কিংবা তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ নাটকীয় পরিবর্তনের অংশটুকুকে কেটে নেয়ার সঙ্গে তুলনা করা যায় যা খুব সহজ কাজ নয়। তীব্র সংকটের সময় যখন সংকট সমাধানে সবার চেষ্টা ব্যর্থ হয় তখনই একটা অলৌকিক ঘটনা বা কারামতের মাধ্যমে ওই সংকটের সমাধান ঘটিয়ে সুফিদের মর্যাদা এবং মহান আল্লাহর অশেষ ক্ষমতা তুলে ধরার মত ঘটনাগুলো দাতাগঞ্জের গল্পগুলোকে করেছে চিত্তাকর্ষক।

দাতাগঞ্জের কাশফুল মাহজুব বইয়ের গল্পগুলো হচ্ছে মূলত খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ের বা মুহূর্তের গল্প এবং তার বেশিরভাগ গল্পের চরিত্রের সংখ্যা দুই বা তিনের বেশি নয়।

ইরফানি গল্পের চরিত্র বা ব্যক্তিত্বগুলোকে ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের মত মনে হলেও তারা অবিকল ঐতিহাসিক চরিত্র নাও হতে পারেন। দাতাগঞ্জ তার গল্পের চরিত্র ঠিক করেন নিজের পছন্দের দুনিয়া থেকে যাতে তাদেরকে গল্পের লক্ষ্য ও কাঠামোর সঙ্গে খাপ খাওয়ানো যায়। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের আলোকে দাতাগঞ্জ তার গল্পের প্লটেও এনেছেন বৈচিত্র্য।

দাতাগঞ্জের কাশফুল মাহজুব বইয়ের গল্পগুলোর মূল নায়ক বা চরিত্র মূলত সুফি বা পির-মুর্শিদের মধ্যেই সীমিত। এসব চরিত্রের মধ্যে অনেকেই হুজুইরির সমসাময়িক যুগের এবং অনেকে অতীত যুগের খ্যাতনামা সুফি। যেমন, জুনাইদ বাগদাদি, শিবলি, জুন্নুন মিসরি, ইব্রাহিম খাওয়াস, আবু সায়িদ আবুল খাইর, বায়েজিদ বোস্তামি, ইব্রাহিম আদহাম, হাসান বাসরি ও দাতাগঞ্জের শিক্ষক আবুল কাসেম গোরগানি। #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/২৯

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।