জুলাই ২৯, ২০২০ ১৩:৫৩ Asia/Dhaka

আজ আমরা হিজরি দশম শতকের তথা খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতকের তথা প্রখ্যাত ইরানি কবি গাজালি মাশহাদির চিন্তাধারা ও অবদান সম্পর্কে আলোচনা করব।

হিজরি দশম শতক বা খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতকের প্রখ্যাত ইরানি কবি গাজালি মাশহাদি ছিলেন সেইসব ইরানি কবিদের অন্যতম যারা সাফাভি যুগে ইরান ছেড়ে ভারতে এসে স্থায়ীভাবে ভারতে বসবাস করেছেন।  এ ধরনের মোট ইরানি কবির সংখ্যা ছিল ৭০০ জনেরও বেশি।  গাজালি মাশহাদি এক সময় ছিলেন ইরানের সাফাভি সম্রাট শাহ তাহমাসবের দরবারের অন্যতম প্রধান কবি। কিন্তু খোদাদ্রোহীতা বা মন্দ ধর্মমত পোষণের অভিযোগে তার ওপর নানা ধরনের হয়রানি চলতে থাকায় তিনি ভারতে চলে যেতে বাধ্য হন।

গাজালি মাশহাদির নাম মুহাম্মাদ ও তার বাবার নাম আবদুল্লাহ বলে একটি বিখ্যাত জীবনী গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অন্য একটি বইয়ে এই কবির নাম আলী রেজায়ি মাশহাদি বলে দাবি করা হয়েছে। তার জন্ম-তারিখ নিয়েও মতভেদ দেখা যায়।  কারো কারো মতে গাজালি মাশহাদির জন্ম হয়েছিল ৯৩০ হিজরিতে অথবা কারো কারো মতে তার জন্মের সনটি ছিল হিজরি ৯৩৬ । তবে সব লেখকের মতেই তার জন্ম হয়েছিল পবিত্র মাশহাদ শহরে।

গাজালি মাশহাদির শৈশবকাল ও প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের সময়টা কেটেছে জন্মভূমি মাশহাদেই। বলা হয় কিশোর বা তরুণ বয়সে ও এমনকি তারও আগে তিনি কবি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। প্রচলিত জ্ঞান, কাব্য-সাহিত্য ও নানা শাস্ত্রের পাশাপাশি সুফি-তরিকার দিকেও গাজালি মাশহাদির ঝোঁক ছিল। রিয়াজুল আরেফিন নামক জীবনী-গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, গাজালি মাশহাদি প্রচলিত নানা জ্ঞান ও বিজ্ঞানে দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি সুফি তরিকা বা ইরফান বিষয়েও পড়াশুনা করেছিলেন এবং মারেফাত বিষয়েও পণ্ডিত হয়ে ওঠেন। অজার বিগদেলি নামক লেখকও গাজালি মাশহাদির সুফি বা দরবেশভাবাপন্ন হওয়ার কথা লিখে গেছেন।

ইরানের বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকের নামেই গাজালি উপাধিটি দেখা যায়। তাদের কেউ কেউ স্পষ্টভাবে গাজ্জাল অর্থে গাজ্জালি উপাধি ব্যবহার করেছেন। আবার অনেকে গাজালি উপাধিকে ফার্সি ‘গাজাল’ শব্দ তথা হরিন থেকে নেয়া বলে উল্লেখ করেছেন। গাজালি মাশহাদিও তার কাব্য সংকলন ‘আসার আশশাবাব’ শীর্ষক বইয়ে হরিন অর্থে তার গাজালি নামক উপাধি বা ছদ্মনামটি ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন। গাজালির অন্য এক কবিতা থেকে স্পষ্ট হয় যে তিনি ছিলেন শিয়া মুসলমান। (বাজনা)

গাজালি একজন কবি হিসেবে সাফাভি সম্রাট তাহমাসবের দরবারের সদস্য হওয়ার পর কিছুকাল ক্বাজভিন শহরে এই সম্রাটের কাছেই থেকেছেন। এ সময় তিনি এই সম্রাটের নামেই একটি মাসনাভি বা দ্বিপদী ছন্দের কাব্য লেখার কাজ শুরু করেন। হিজরি ৯৫৮ সনে সম্রাট তাহমাসব গাজালিকে একটি বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে শিরাজ শহরে পাঠান। বলা হয় খাজা আমির বেগ কাজজি নামের একজন রেজিস্টারকে অপমান করাই ছিল কথিত ওই দায়িত্ব।  কারণ এই রেজিস্টারের কোনো কোনো আচরণের কারণে সম্রাট তাহমাসব বেশ বিরক্ত হয়েছিলেন। এ সময় কবি গাজালির বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর।

শিরাজ থেকে ফিরে এসে গাজালি মাশহাদি কোনো এক কারণে ভারতে চলে যান। তার এই হিজরতের কারণ সম্পর্কে খুব কম বইয়েই স্পষ্ট আলোচনা দেখা যায়। তবে মনে করা হয় যে যেসব কারণে সে যুগে গাজালিসহ অনেক ইরানি কবি ভারতে চলে গিয়েছিলেন সাফাভি শাসকদের কঠোর ও সহিংস আচরণ ছিল সেসবের অন্যতম।  সাফাভি সম্রাটদের কঠোরতা ও সহিংসতা সম্রাট ইসমাইল ও তার ছেলে তাহমাসবের যুগে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। অনেক আমির বা কর্মকর্তা অস্পষ্ট নানা কারণে এই সাফাভি সম্রাটদের ক্রোধের আগুনে দগ্ধ হয়েছিলেন। সম্রাট শাহ ইসমাইলের শেষ মন্ত্রী জালালউদ্দিন খন্দমির কোনো কারণে সম্রাট তাহমাসবের ক্রোধের শিকার হন এবং সম্রাটের নির্দেশে তাকে পুড়িয়ে মারা হয়। রুক্‌ন্‌উদ্দিন কজেরুনিও একজন বিখ্যাত আলেম ও চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও সাফাভি সম্রাটের ক্রোধের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন।

খাজা আমির বেগ কাজজির সঙ্গে সাফাভি সম্রাটের নির্দয় আচরণ দেখার পর গাজালি মাশহাদি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন এবং সম্ভবত এমন নিষ্ঠুরতার শিকার হওয়ার আশঙ্কা এড়াতে তিনি ভারতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ভারতে গাজালির মত কবি-সাহিত্যিকদের হিজরতের আরেকটা কারণ হল সুফিদের সঙ্গে সাফাভি সম্রাটদের যুদ্ধংদেহী আচরণ। অথচ এক সময় সাফাভি বংশের শাসন ইরানে শুরু হয়েছিল একদল সুফিবাদীর আন্দোলনের সুবাদেই! পুরোপুরি সুফিবাদী হওয়ার কারণে গাজালি মাশহাদির জন্য বিপদের আশঙ্কা ছিল।

ডক্টর জাবিউল্লাহ সাফা ভারতে গাজালি মাশহাদির হিজরতের কারণ প্রসঙ্গে 'ইরানের সাহিত্যের ইতিহাস' শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন, গাজালি মাশহাদি স্বাধীনচেতা মন নিয়ে কবিতা লিখতেন এবং এই স্বাধীন মানসিকতা ত্যাগ করতে তিনি কখনও প্রস্তুত ছিলেন না। ফলে তার ওপর খুব শিগগিরই নেমে আসে খোদাদ্রোহী হওয়ার অপবাদ! ফলে হিংসুকদের মাধ্যম কলুষিত পরিবেশের ইরানে থাকা তার পক্ষে আর সহনীয় ছিল না।

অন্যদিকে ইরানের সাফাভি শাসনামলের সমসাময়িক যুগে ভারত উপমহাদেশে চলছিল মোগল সম্রাটদের রাজত্ব। চেঙ্গিস ও তৈমুরের মিশ্র-ধারার রক্তের অধিকারী বাবরের প্রতিষ্ঠিত এই মোগল বংশের সম্রাটরা ছিলেন ফার্সি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রেমিক এবং ভারতবর্ষে এই ভাষা ও সংস্কৃতির বিস্তারে তারা রেখেছেন অমূল্য অবদান। সাফাভি সম্রাটদের বিপরীতে তারা ইরানি কবি ও সাহিত্যিকদের খুবই সমাদর করতেন ও তাদেরকে সব ধরনের উৎসাহ দিতেন। ফলে ভারতে ইরানি লেখক, পণ্ডিত, শিল্পী, গুণী ও কবি-সাহিত্যিকদের অভিবাসনের ঢল নেমেছিল।

মোগল সম্রাট  হুমাউন শেরশাহ আফগানের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ইরানের সম্রাট তাহমাসবের দরবারে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং এক বছর ধরে ইরানে থাকার পর সাফাভিদের সহায়তায় কান্দাহার দখল করেন এবং আরও পরে ৯৬২ হিজরিতে দিল্লী দখল করেন। হুমাউন ইরানে থাকার সময় ইরানি কবি-সাহিত্যিকদের ভারতে যাওয়ার উৎসাহ দিতেন। হুমাউনের পর তার ছেলে আকবর ভারতের সম্রাট হন। তার শাসনামলেরও একাংশে ইরানের মসনদে ক্ষমতাসীন ছিলেন সাফাভি সম্রাট তাহমাসব। এ সময় সুফিবাদীদের সঙ্গে তাহমাসব সরকারের বিরোধ দেখা দেয় এবং তা ৯৯৬ হিজরি সন পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এ বছরই ইরানে ক্ষমতাসীন হয়েছিলেন সাফাভি সম্রাট প্রথম শাহ আব্বাস। #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/২৯

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।