প্রখ্যাত ইরানি কবি গাজালি মাশহাদির অবদান
গত পর্বের ধারাবাহিকতায় আজও আমরা হিজরি দশম শতকের তথা খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতকের প্রখ্যাত ইরানি কবি গাজালি মাশহাদির জীবন, চিন্তাধারা ও অবদান সম্পর্কে আলোচনা করব।
গত পর্বের আলোচনায় আমরা জেনেছি, হিজরি দশম শতক বা খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতকের প্রখ্যাত ইরানি কবি গাজালি মাশহাদি কিছুকাল ইরানের সাফাভি সম্রাট তাহমাসবের দরবারের সদস্য ছিলেন। কিন্তু সে সময়কার ইরানের পরিস্থিতি স্বাধীনচেতা ও সুফি-প্রবণ কবি-সাহিত্যিকদের জন্য প্রতিকূল হওয়ায় বিশেষ করে মাশহাদি তার প্রাণনাশের আশঙ্কা করায় তিনি সমুদ্রপথে ভারতে চলে যান। যুবক কবি গাজালি মাশহাদি যখন ভারতে যান তখন সেখানে চলছিল মোগল সম্রাট আকবরের রাজত্ব। এ সময় সেখানে ফার্সি ভাষা, সাহিত্য ও শিল্পের প্রসারের প্রতি মোগলদের পৃষ্ঠপোষকতা ও গুরুত্বারোপ ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের।
গাজালি মাশহাদি ভারতে আসার পর কিছুকাল অজ্ঞাত ও অখ্যাত অবস্থায় সময় কাটান। তিনি প্রথমে দাক্ষিণাত্যে যান এবং সেখানে তার ঔজ্জ্বল্য তখনও কারো চোখে পড়েনি। এরপর সম্রাট আকবরের দরবারের অন্যতম সদস্য ও জৈনপুরীর শাসক খানে জামান নামে খ্যাত আলি কুলি খান এই অমূল্য রত্নকে চিনতে পারেন। তিনি গাজালি মাশহাদির সহযোগী হওয়ায় তার কবিতার খ্যাতি গোটা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এ সময় খানে জামানের রাজ্য দখল করেন ও খানে জামান নিহত হন। এ সময় গাজালি মাশহাদিও সম্রাট আকবরের অভিভাবকদের হাতে বন্দি হন। ফলে তিনি সম্রাট আকবরের নজরে পড়েন এবং এক পর্যায়ে তার দরবারের প্রধান কবি হন।
গাজালি মাশহাদি জীবনের শেষ ছয়টি বছর সম্রাট আকবরের সান্নিধ্যে অত্যন্ত সসম্মানে কাটিয়েছেন। তিনিই প্রথম কবি যিনি মোগল রাজ-দরবারে মালেক আশ শোয়ারা বা প্রধান কবির পদবি লাভ করতে সক্ষম হন। এ সময় রাজ দরবারে বড় বড় অনেক কবির পাশে থাকার সুযোগ হয়েছিল তার। অবশেষে হিজরি ৯৮০ সনের ২৭ রজব শুক্রবার গুজরাটের আহমাদাবাদে মারা যান গাজালি মাশহাদি। সম্রাট আকবরের নির্দেশে তাকে সারেগাঞ্জ নামক বিশেষ অভিজাত গোরস্তানে দাফন করা হয়। রাজা-বাদশাহ, বড় আলেম ও ব্যক্তিত্বদের কবরের জন্য নির্ধারিত ছিল এই বিশেষ গোরস্তানটি।
গদ্যে ও পদ্যে অনেক লেখা রেখে গেছেন মাশহাদি গাজালি। তার কবিতার মোট পঙক্তির সংখ্যা ৫০ হাজার থেকে এক লাখ। ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে গাজালির একটি দিওয়ান বা কাব্য সংকলনের হাতে-লেখা দুর্লভ পাণ্ডুলিপি রয়েছে। এতে রয়েছে কাসিদা, রোবাইয়াত বা চতুষ্পদী কবিতা, গজল ও মাসনাভিসহ নানা ধরনের কবিতার ১২ হাজার পঙক্তি। গাজালির লেখা গদ্য ও পদ্য ভূমিকাও রয়েছে ওই পাণ্ডুলিপির সঙ্গে। তার এই কাব্যটির নাম আসার আশশাবাব। এ কাব্যে রয়েছে ৫৫৫টি গজল। গাজালি মাশহাদি বইটি লেখা শেষ করেন হিজরি ৯৬৬ সালে। এ সময় তার বয়স হয়েছিল ত্রিশ বছর।
আসরার আল মাকতুম গাজালির লেখা আরেকটি একটি কাব্য। খোদাপ্রেম বা সুফিবাদের বিষয়ে মাসনাভি বা দ্বিপদী কবিতার এই সংকলনের কথা তুলে ধরেছেন ডক্টর জাবিউল্লাহ সাফা। সুফিবাদের বিষয়ে রাশাহাত আল হায়াত ও নৈতিক বিষয়ে মিরাত আল কায়েনাত শীর্ষক দু'টি বই গাজালির দুটি বিখ্যাত গদ্য বই। গাজালি মাশহাদি সম্রাট তাহমাসব ও আকবরের প্রশংসা করে পৃথক দু'টি কাব্য লিখেছেন।
নাকশে বাদিই, মাশহাদে আনোয়ার, কুদরাতে আসার ও মিরাত আস সাফা মাশহাদি গাজালির লেখা কয়েকটি দ্বিপদী কাব্য। নিজামির মাখজানুল আসরার কাব্যের ছন্দরীতি অনুসরণ করে গাজালি লিখেছেন এইসব কাব্য। আইনেইয়ে খিয়াল তার লেখা আরেকটি কাব্যগ্রন্থ। এতে রয়েছে গজল, রোবাইয়াত ও ক্ষুদ্র কবিতা।
মাশহাদি গাজালি ছিলেন একজন বড় মাপের শক্তিমান কবি। আবুল ফজল আল্লামি তার ভাষার সুমিষ্টতা ও ভাষা উপলব্ধির ক্ষমতাকে অনন্য বলে প্রশংসা করেছেন। বদায়ুনি তাকে সমসাময়িক যুগের কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে ডক্টর জাবিউল্লাহ সাফার মতে গোটা দশম হিজরি বা খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতকে গাজালির মত বড় মাপের কবি খুব কমই জন্ম নিয়েছেন। এমনকি একাদশ ও দ্বাদশ হিজরিতেও তার মত বড় মাপের কবি খুব কমই দেখা যায় বলে ডক্টর জাবিউল্লাহ সাফা মন্তব্য করেছেন।
গাজালির সামাজিক ব্যাঙ্গ ও উপহাসমূলক কবিতায় মহাকবি হাফিজের প্রভাব দেখা যায় বলে কুরবানপুর অরানি উল্লেখ করেছেন। হাফিজ তার অনেক কবিতায় কপট সুফি, আলেম বা পণ্ডিত ও দরবেশদের ওপর চাবুক মেরেছেন। একইভাবে গাজালিও তার অনেক কবিতায় ভণ্ড সুফি, পণ্ডিত ও দরবেশদের ওপর চাবুকের কষাঘাত হেনেছেন। তবে শব্দের চাবুক মারার ক্ষেত্রে তিনি উদ্দিষ্ট ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করতেন না। সে যুগের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নানা অংশে বা ক্ষেত্রে ভণ্ড সুফি, পণ্ডিত ও দরবেশদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। গাজালির যুগে ধর্ম হয়ে পড়েছিল কপট লোকদের খেলার সামগ্রী। এই শ্রেণীর লোকদের কথা ও কাজের মধ্যে কোনো মিল ছিল না। তাই গাজালি মাশহাদি প্রকৃত ধর্ম ও কপটতার পার্থক্য তুলে ধরতে সচেষ্ট হয়েছিলেন তার অনেক কবিতায়।#
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/২৯
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।