আগস্ট ০১, ২০২০ ১২:১৪ Asia/Dhaka

আজ আমরা হিজরি দশম-একাদশ শতকের তথা খ্রিস্টীয় ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি কবি, জীবনী-লেখক ও অভিধান-বিশেষজ্ঞ তাকিউদ্দিন আওহাদি বালিয়ানির জীবন ও অবদান সম্পর্কে আলোচনা করব।

হিজরি দশম-একাদশ শতকের তথা খ্রিস্টীয় ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি কবি ও লেখক তাকিউদ্দিন আওহাদি বালিয়ানি কাজিরুনির জন্ম হয়েছিল ৯৭৩ হিজরির তেসরা মুহররম ইস্পাহান শহরে। তার বাবা মু'য়িন উদ্দিন মোহাম্মাদ ছিলেন বালিয়ানি নামে খ্যাত একটি সভ্রান্ত ধার্মিক বংশের সন্তান। তিনি ছিলেন  একজন নেতৃস্থানীয় আলেম। এই বংশে অতীতে জন্ম নিয়েছিলেন অনেক ওলি-দরবেশ ও আরেফ। তাদের কেউ কেউ ছিলেন মহাকবি হাফেজ ও সাদির সমসাময়িক। আওহাদি বালিয়ানির কয়েক প্রজন্ম আগের পূর্ব-পুরুষ ছিলেন হিজরি চতুর্থ ও পঞ্চম শতকের সুফি-সাধক  আবু আলী দাক্কাক্ব নিশাপুরি। বালিয়ানিরা অতীতে ছিলেন ফার্স প্রদেশের অধিবাসী। পরে এই বংশের অনেক সদস্য ইরানের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন।

শৈশবেই পিতাকে হারিয়েছিলেন আওহাদি। ইস্পাহান শহরেই প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন তিনি। নয় বছর বয়সেই কবিতা লেখা শুরু করেন আওহাদি। এ সময় সাফাভি সম্রাট শাহতামাসবের একটি এতিমখানায়ও আশ্রয় পান শিশু আওহাদি। সেখানে এতিমদের জন্য জ্ঞান অর্জনের সুযোগ ছিল। তিনি সে সময় এই প্রতিষ্ঠানে থেকেই কয়েকজন বড় শিক্ষকের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পেয়েছিলেন।

 আওহাদি বালিয়ানি ১২ বছর বয়স পর্যন্ত সম্রাট শাহতামাসবের ওই এতিমখানায় থেকে আরবি ব্যাকরণ, পবিত্র কুরআন, যুক্তিবিদ্যা ও গণিত অধ্যয়ন করেন। এরপর তিনি দর্শন ও নীতি শাস্ত্রও  পড়েন। শিশু বয়সেই কবিতা লেখা শুরু করলেও মায়ের বাধার কারণে আওহাদি এক পর্যায়ে কবিতা চর্চা বন্ধ করে দেন এবং যতদিন তার মা জীবিত ছিলেন ততদিন এদিকে অগ্রসর হননি। অবশেষে এক সময় তার মা মারা যান।

মায়ের মৃত্যুর পর তাকিউদ্দিন আওহাদি বালিয়ানি ইয়াজদে যান এবং সেখানে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে এক বছর কাটান। এ সময় সম্রাট প্রথম শাহ তাহমাসবও মারা যান। কয়েক বছর ধরে ইরানে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছিল। এ সময় তাকিউদ্দিন আওহাদি বালিয়ানি ইস্পাহানে ফিরে আসেন। তিনি ষোল বছর বয়স পর্যন্ত ইস্পাহানে থাকেন এবং উচ্চতর পড়াশুনায় মশগুল হন। এরপর আওহাদি শিরাজে যান এবং এখানে তিনি তার আত্মীয় মাওলানা মিরক্বারী গিলানির কাছে চার বছর থাকেন।  মাওলানা মিরক্বারী গিলানি ছিলেন আনিসুল আকেলিন নামক বইয়ের লেখক। মিরকারীর কোনো পুত্র সন্তান না থাকায় তিনি আওহাদিকে ছেলের মত স্নেহ করতেন ও তার কাছে নিজ কন্যাকে বিয়ে দেন।

মাওলানা মিরক্বারী গিলানির সাহচর্যে থাকার সময়ই তাকিউদ্দিন আওহাদি বালিয়ানি সুফিবাদ ও ইরফান তথা আধ্যাত্মবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এ অবস্থায় তিনি সফরে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বিশ বছর বয়সে ইস্পাহানে ফিরে আসার সময় আওহাদি সাফাভি সম্রাট মোহাম্মাদ খোদাবান্দাহর কাফেলায় যোগ দেন। এর কিছুকাল পর প্রথম শাহ-আব্বাস ইরানের সম্রাট হলে তিনি তার কাফেলা ও দলবলের সঙ্গে খোরাসান থেকে ক্বাজভিনে আসেন। এ সময় অন্য অনেক বড় কর্মকর্তার সঙ্গে আওহাদিও কাশান ও কোম হয়ে শাহ-আব্বাসের কাফেলা বা শিবিরে যোগ দেন।

কবি তাকিউদ্দিন আওহাদি কাজভিনে এক বছর থাকেন। শাহ আব্বাসের দরবারের কবিদের সঙ্গে কবিতা রচনা এবং কাব্য ও কবিতা বিষয়ে আবৃত্তি, আলোচনা ও মত বিনিময়ে তার সময় কাটত। এরপর আওহাদি ফিরে আসেন শিরাজে। এখানে আরও ৫ বছর থাকেন তিনি।

শিরাজেও কবিদের সভা বা কাব্য-চর্চার আসরে যোগ দিতেন আওহাদি। এইসব আসরে তিনি যখন নিজের কবিতা পড়ে শোনাতেন তখন উপস্থিত কবিরা বিস্ময়ে অভিভূত হত। আওহাদি অন্য সবার চেয়ে কম বয়স্ক ও যুব শ্রেণীর হওয়ায় কেউ কেউ তার কবিতা নিজস্ব না অন্যের কবিতার নকল তা নিয়ে সন্দিহান হতেন ও বার বার তার পরীক্ষা নিতেন। এসব পরীক্ষায় উৎরে যেতেন আওহাদি। তাকে তারা যেভাবেই কবিতা লিখতে বলতেন তিনি সেভাবেই কবিতা লিখতেন। যেমন, তাকে যদি বলা হত বাবা ফগানির কবিতার স্টাইলে কবিতা লিখতে তাহলে তিনি ওই স্টাইলে চমৎকার কবিতা-শৈলি দেখিয়ে সবাইকে অবাক করে দিতেন।  

এক হাজার হিজরি সনে ইরানি সম্রাট শাহ আব্বাস উজবেকিস্তানের যুদ্ধে জয়ী হয়ে ইস্পাহান থেকে খোরাসানে আসেন। এ সময় তাকিউদ্দিন আওহাদিও ইস্পাহানে যান। ওই বিজয় উপলক্ষে আয়োজিত উৎসব অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি। উৎসবে আওহাদি তাৎক্ষণিকভাবে একটি  রোবাইয়াত বা চতুষ্পদী কবিতা রচনা করে তার আবৃত্তি শোনান। কবিতাটি শাহ-আব্বাসের কাছে খুবই ভালো লাগে।  এর অল্প ক’দিন পর সম্রাট শাহ আব্বাসের কাফেলার সঙ্গেই ক্বাজভিনে যান আওহাদি। কিছুকাল সেখানে থেকে তিনি আবারও ইস্পাহানে ফিরে আসেন। এই সময়টাতে আওহাদি শাহ-আব্বাসের এত প্রিয়-ভাজন হন যে আওহাদির আশপাশের লোকেরা তাকে শাহ-পাসান্দ বা শাহের পছন্দের মানুষ বলে অভিহিত করতেন!

ইরানের বহু শহরে ভ্রমণ ও বসবাসের পর হিজরি ১০০৫ সনে কবি তাকিউদ্দিন আওহাদি ইরাকের ধর্মীয় পবিত্র স্থানগুলো জিয়ারত করতে যান এবং দীর্ঘ চার বছর ধরে পবিত্র কারবালা, নাজাফ, কাজেমাইন ও বাগদাদে থাকেন। বাগদাদে ফার্সিভাষী কয়েকজন কবির সান্নিধ্য পেয়েছিলেন তিনি। এই কবিদের একজন ছিলেন মাওলানা তারজি শুশতারি। আওহাদি তার মূল্যবান বই আরাফাতুল আশেকিন-এ ইরাক-প্রবাসী কয়েকজন ইরানি কবির নাম উল্লেখ করেছেন।

ইরাকের পবিত্র স্থানগুলো থেকে ফেরার পর আওহাদি হিজরি ১০১৪ সন পর্যন্ত ইস্পাহানে ছিলেন। এখানে তিনি লেখালেখি এবং কাব্য ও সাহিত্য চর্চায় মশগুল থাকতেন। এরপর আওহাদি তার কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবসহ ভারতে যান। এই সফরে মির আবুল কাসেমসহ কয়েকজন কবি ছিলেন তার সঙ্গী। তারা শিরাজ, কেরমান ও কান্দাহার হয়ে লাহোরে যান। আওহাদি দেড় বছর লাহোরে থাকার পর আগ্রায় মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে কিছুকাল থাকার পর তিনি গুজরাটে যান এবং এখানে কয়েক বছর কবি-সাহিত্যিক ও পণ্ডিতদের সান্নিধ্যে থাকেন।

আওহাদি হিজরি ১০২০ সালে হজে যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু সফল হননি। আধাআধি পথ পর্যন্ত অগ্রসর হয়ে আগ্রায় ফিরে আসেন এবং এখানে কয়েক বছর বসবাস করেন। এখানেই কবি আওহাদি লিখেছিলেন আরাফাতুল আশেকিন নামক বইটি। ১০২২ হিজরিতে তিনি এ বই লেখা শুরু করেন এবং দুই বছর পর বইটি লেখা শেষ করেন। ইরানের নানা শহরের মত ভারতেরও নানা শহরে ভ্রমণ করেন আওহাদি। এইসব শহরের জ্ঞানী-গুণী ও কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ হয়েছিল তার। গুজরাটে প্রখ্যাত ইরানি কবি নাজিরি নিশাপুরি ও আজমির শরিফে তালেব অ’মুলির সান্নিধ্যে তার থাকার কথা আওহাদি আরাফাতুল আশেকিন বইয়ে উল্লেখ করেছেন। ভারতে সুবিধাজনক অবস্থা ও স্বাচ্ছন্দ্যের কারণে আরাফাতুল আশেকিন বইটি ছাড়াও ব্যাপক লেখালেখি ও কবিতা লেখার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। আওহাদির জীবনের শেষের দিকের বছরগুলো ও মৃত্যুর স্থান সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য নেই। জানা যায় যে তিনি হিজরি ১০৩৯ সনেও বেঁচে ছিলেন। কবিদের জীবনী সংক্রান্ত একটি বইয়ের তথ্য অনুযায়ী আওহাদি হিজরি ১০৫০ সনে ইন্তেকাল করেন। তবে এই বর্ণনার মূল উৎস স্পষ্ট নয়। #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/০১

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।