সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২০ ১৮:১০ Asia/Dhaka

ইরাক-ইরান যুদ্ধ শুরুর ১৮ মাসের মাথায় চালানো ফাতহুল মোবিন অভিযানে বিশাল বিজয় অর্জন করে ইরান। ওই অভিযানে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসিরি ১৩৫টি ব্যাটালিয়ান অংশ নেয় এবং অভিযানের আগে এই বাহিনীর প্রথম সাঁজোয়া ডিভিশন প্রতিষ্ঠিত হয়।

ফাতহুল মোবিন অভিযান শেষে ইরানি যোদ্ধারা খুজিস্তান প্রদেশের দুই হাজার ৫০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীর হাত থেকে পুনরুদ্ধার করেন।  তারা ইরাকিদের বহু যুদ্ধাস্ত্র ও রসদ ধ্বংস করেন এবং ‘দেজফুল’, ‘শুশ’ ও ‘আন্দিমেশ্‌ক’ শহরকে ইরাকিদের কামানের গোলার আওতামুক্ত করতে সক্ষম হন। ওই অভিযান সম্পর্কে মার্কিন দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছিল: "যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটি ছিল ইরাকিদের সবচেয়ে বড় পরাজয়। তাদের তিনটি ডিভিশন ধ্বংস হয়ে যায় এবং তারা সীমান্তের দিকে বেশ কয়েক কিলোমিটার পিছু হটে যেতে বাধ্য হয়।

ফাতহুল মোবিন অভিযানে ইরাকিদের হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণের দিকে দৃষ্টি দিলেই এই অভিযানের বিশালতা উপলব্ধি করা সম্ভব হবে।  দুই হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা পুনরুদ্ধার করা ছাড়াও দেজফুল শহরের পশ্চিম অংশে ইরাকি বাহিনীকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পর্যন্ত ঠেলে দেয়া, ৪ ও ৫ নম্বর রাডার স্থাপনা এবং বহু গ্রাম ও ইউনিয়ন পুনরুদ্ধার করা, কৌশলগত দেজফুল-দেহলোরান মহাসড়কের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ, ‘দেজফুল’, ‘শুশ’ ও ‘আন্দিমেশ্‌ক’ শহরকে ইরাকিদের কামানের গোলার আওতামুক্ত করা ছিল এই অভিযানে ইরানি যোদ্ধাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। অন্যদিকে ওই অভিযানে ইরাকিদের অন্তত চারটি ব্রিগেড ধ্বংস হয়,  ১৫ হাজার ইরাকি সেনা ইরানি যোদ্ধাদের হাত বন্দি হয়, ইরাকিদের ৩৬১টি ট্যাংক ও সাঁজোয়া যানের পাশাপাশি ১৮টি জঙ্গিবিমান ও তিনটি হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়। একইসঙ্গে ইরানি যোদ্ধারা ইরাকিদের ৩০০টি গাড়ি, ৫০টি কামান ও ৩০টি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিভাইস ধ্বংস করেন।

ফাতহুল মোবিন অভিযানে বিপুল পরিমাণ গনিমতের মাল ইরানি যোদ্ধাদের হস্তগত হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ৩৩০টি ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান, ৫০০টি গাড়ি, ১৬৫টি কামান, ৫০টি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিভাইস এবং প্রচুর অস্ত্রসস্ত্র ও গোলাবারুদ।  অভিযানে প্রায় ২৫ হাজার ইরাকি সেনা হতাহত হয়। এই বিশাল পরাজয়ের ফলে ইরাকি বাহিনী চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়।  এই বিপর্যয়ে ইরাকের তৎকালীন শাসক সাদ্দাম যেমন উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে তেমনি তার আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকরাও দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। ওই অভিযানে বিজয়ের ফলে যুদ্ধের ভারসাম্য যে ইরাকের কাছে থেকে ইরানের অনুকূলে চলে আসে তা পশ্চিমা গণমাধ্যমের খবরেও বেরিয়ে আসে।  টাইমস ম্যাগাজিনের বৈরুত প্রতিনিধি রবার্ট ফিস্ক এ সম্পর্কে লেখেন: “যুদ্ধের সাম্প্রতিক যে চিত্র আমাদের সামনে এসেছে তাতে মনে হয়, ইরাকি সেনাবাহিনী এখন ইরানি যোদ্ধাদের হাতে চূড়ান্ত পরাজয়ের প্রহর গুণছে। এখন আর সাদ্দাম ইরানের আরভান্দ নদী দখলে রাখার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেন না এবং এখনই যদি যুদ্ধবিরতির আলোচনা শুরু হয় তাহলে তিনি ইরান থেকে পর্যায়ক্রমে সেনা সরিয়ে নিতেও রাজি হবেন। ”

ফাতহুল মোবিন অভিযান শেষ হওয়ার পর বিবিসি রেডিও এক বিশ্লেষণে জানায়, “পশ্চিমা গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক সংঘর্ষে (অর্থাৎ ফাতহুল মোবিন অভিযানে) ইরান বড় ধরনের বিজয় অর্জন করেছে। এর ফলে ইরানি যোদ্ধাদের মনোবল বহুগুণ বেড়ে গেছে।” বিবিসি রেডিও টানা দু’দিন ধরে ফাতহুল মোবিন অভিযানের ফলাফল ও এ সম্পর্কিত বিশ্লেষণ প্রচার করে। বিবিসি জানায়: “এ যুদ্ধে চূড়ান্তভাবে ইরান বিজয়ী হলে এবং সাদ্দাম হোসেনের পতন ঘটলে তা হবে আঞ্চলিক বেশ কিছু দেশের জন্য বড় ধরনের বিপদ।” এদিকে ওই অভিযানে ব্যাপক পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হওয়ার পর ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম ইরানের সঙ্গে আবারো যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাঠান। এমন সময় ওই প্রস্তাব দেয়া হয় যখন ইরানের কয়েকটি শহর এবং শত শত বর্গকিলোমিটার এলাকা ইরাকি বাহিনীর দখলে ছিল।

এ সম্পর্কে ইরাকি সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়: সাদ্দাম হোসেন শান্তিপূর্ণ উপায়ে ইরানের সঙ্গে সংঘাত বন্ধের দাবি জানাচ্ছেন। তিনি চান ঐতিহাসিক ও আইনি দলিল অনুযায়ী, দু’দেশের স্বার্থ সংরক্ষিত হোক। ” সে সময় সাদ্দামের মিত্র  ও মিশরের তৎকালীন একনায়ক হোসনি মুবারক ইরানের মোকাবিলায় ইরাকের সাদ্দাম সরকারকে রক্ষা করার জন্য আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলোর  প্রতি আহ্বান জানান।  সাদ্দামের দুই মিত্র মরক্কোর বাদশাহ হাসান এবং সুদানের তৎকালীন একনায়ক জাফর নিমেরি ইরাক সরকারকে রক্ষা করতে ব্যাপক তোড়জোড় শুরু করেন।  এভাবে তারা কথিত শান্তির দামামা বাজিয়ে খোররামশাহর মুক্ত করার অভিযান চালানো থেকে ইরানকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন। ওদিকে সাদ্দাম শান্তির দাবি করার পর আরব ও পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে ইরাকের কাছে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ও সামরিক সহযোগিতা আসতে থাকে। মিশর, জর্দান,সুদান ও মরক্কো বাগদাদের কাছে হাজার হাজার ভাড়াটে সেনা পাঠায়।

এসব সাহায্য-সমর্থন পেয়ে ইরাক যুদ্ধক্ষেত্রে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে এবং ইরানের আসন্ন বায়তুল মোক্কাদাস অভিযান প্রতিহত করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু ফাতহুল মোবিন অভিযানে ইরাকিদের এত বেশি ক্ষতি হয়ে যায় যে, বিদেশি সাহায্য পাওয়া সত্ত্বেও তা যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে যায়। এ অবস্থায় ইরাকিদের হাতে দখলীকৃত খোররামশাহর ও আশপাশের এলাকায় নতুন করে টানাপড়েন শুরু হয়ে যায়। ধীরে ধীরে এ উত্তেজনা চরমে পৌছোয়। ইরানি যোদ্ধারা যাতে খোররামশাহরে পৌঁছাতে না পারে সেজন্য ইরাকিরা ওই শহরের প্রবেশ পথগুলোতে অসংখ্য মাইন স্থাপন করে। সেইসঙ্গে অতিরিক্ত সেনা তলব করে খোররামশাহরের প্রতিরক্ষা শক্তি জোরদার করা হয়। তৎকালীন প্রাচ্যের পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন আসন্ন সংঘর্ষে ইরাককে রক্ষা করার জন্য বাগদাদের হাতে টি-৭২ ট্যাংকের বিশাল বহর তুলে দেয়। সেইসঙ্গে সাদ্দাম সরকারের জন্য বহু জঙ্গিবিমানও পাঠায় মস্কো।

ওদিকে পশ্চিমা দুই শক্তি তৎকালীন পশ্চিম জার্মানি এবং ইতালি ইরাকের সাদ্দাম সরকারের জন্য ট্যাংক বিধ্বংসী গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র ‘মিলান’- এর বিশাল চালান পাঠায়। কুয়েত ও সৌদি আরবসহ পারস্য উপসাগর তীরবর্তী ধনী আরব দেশগুলো তাদের জনগণের সম্পদ- তেল বিক্রির ডলারের ভাণ্ডার সাদ্দাম সরকারের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। দৃশ্যত ইরান যাতে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করতে না পারে সেজন্য প্রাচ্য, পাশ্চাত্য ও মধ্যপ্রাচ্যের সকল শক্তি ঐক্যবদ্ধভাবে আগ্রাসী ইরাকের পাশে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের জনগণ ও সরকার ‘বায়তুল মুকাদ্দাস’ অভিযান চালিয়ে খোররামশাহর মুক্ত করার সংকল্পে অটুট থাকে। #

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ১৯

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।