সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০ ১৯:৩০ Asia/Dhaka

গত আসরে আমরা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফাতহুল মুবিন অভিযানের অভিযানের প্রভাব এবং ১৯৮০’র দশকের মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছি। আজকের আসরে আমরা বায়তুল মুকাদ্দাস অভিযানের প্রস্তুতি এবং খোররামশাহরের পতনের ঘটনা সংক্ষেপে আরেকবার বর্ণনা করব।

১৯৮০ সালের শেষ দিকে ইরাকি বাহিনী যখন ইরানে আগ্রাসন চালায় তখন তেহরান এ ধরনের যুদ্ধ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত ছিল। ফলে আগ্রাসনের প্রথম প্রহরেই ইরানের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নেয় ইরাক। তবে এক বছরের মাথায় ঘুরে দাঁড়ায় ইরান। সাদ্দাম বাহিনীর আগ্রাসনের এক বছর পূর্তিতে ইরান আক্রমণাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর সামেনুল আয়েম্মে, তারিকুল কুদস ও ফাতহুল মুবিন নামের তিনটি বড় অভিযান চালায় ইরান এবং ইরানি যোদ্ধারা এসব অভিযানে নিজেদের তেমন কোনো ক্ষতি হতে না দিয়ে আগ্রাসী ইরাকি সেনাদের বড় ধরনের ক্ষতি করতে সক্ষম হন। 

ওই তিন অভিযানে ইরাকি বাহিনী যতটা দুর্বল ও নড়বড়ে হয়ে পড়ে ইরানি যোদ্ধাদের মনোবল, সাহস ও সংহতি ততটাই বেড়ে যায়। ইরানি যোদ্ধাদের একের পর এক সফল অভিযানে সারাদেশ থেকে ইরানি তরুণদের মধ্যে যুদ্ধে যাওয়ার আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়।  প্রকৃতপক্ষে সেনাবাহিনী ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি’র পাশাপাশি বেসামরিক তরুণরা ব্যাপক সংখ্যায় ওই যুদ্ধে অংশ না নিলে ইরানের পক্ষে এতটা সফলতা অর্জন করা সম্ভব হতো না।  আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে সংঘাতকে ইরানি যোদ্ধারা কোনো প্রচলিত যুদ্ধ হিসেবে নেননি। তারা বরং এটিকে নিয়েছিলেন গণযুদ্ধ হিসেবে।

ইরাকি সেনারা যতবারই ইরানি যোদ্ধাদের হাতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতো ততবারই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ৫৬টি দেশ মিলে বাগদাদকে বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত করে তুলত। কিন্তু  এসব অস্ত্র সাহায্য ইরাকি সেনাদের ভেঙে পড়া মনোবল চাঙ্গা করতে পারত না। ইরানি তরুণ যোদ্ধারা যখন মাতৃভূমি রক্ষার লক্ষ্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য লাইন ধরত তখন ইরাকি সেনাদেরকে ভয় ও হত্যা করার হুমকি দিয়ে ফ্রন্টে পাঠানো হতো। ইরানের কৃষক, শ্রমিক, চাকুরিজীবী, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ও শিক্ষকসহ সমাজের সব শ্রেণিপেশার মানুষ দেশরক্ষার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।  ইরাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে চালানো বায়তুল মুকাদ্দাস অভিযান ছিল ইরান-ইরাক আট বছরের যুদ্ধের অন্যতম বড় গণযুদ্ধ যাকে ইরানের দৃষ্টিতে অন্যতম বীরত্বগাঁথা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

ফাতহুল মোবিন অভিযান সমাপ্ত হওয়ার পর ইরাকি বাহিনী বুঝতে পেরেছিল যে, ইরানি যোদ্ধারা এর পরবর্তী অভিযান চালাবে খোররামশাহর ও কারুন নদীর পশ্চিম তীর এলাকায়। ফাতহুল মোবিন অভিযান শেষ হওয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় বায়তুল মুকাদ্দাস অভিযান চালানো হয়। এত অল্প সময়ের মধ্যে বেসামরিক ও অপেশাদার যোদ্ধাদেরকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা ছিল আইআরজিসি’র জন্য একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ।  তবে এই অভিযানে মূল যে কারণে ইরাকি বাহিনী পরাজিত হয় তা হচ্ছে ইরানি যোদ্ধাদের কারুন নদী পার হওয়া।  আগ্রাসী বাহিনী কল্পনাই করতে পারেনি ইরানি যোদ্ধারা খরস্রোতা কারুন নদী পার হতে পারবে। ফলে তারা নদীর দিকে তেমন কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাখেনি। এ কারণে ইরাকি বাহিনী এই অংশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখিন হয়।

এই অভিযানের জন্য ইরান ১৯৬ ব্যাটেলিয়ান সৈন্য প্রস্তুত করে। এগুলোর মধ্যে ১৩৫ ব্যাটেলিয়ান ছিল আইআরজিসি’র এবং বাকি ৬১ ব্যাটেলিয়ান ছিল সেনাবাহিনীর। এই অভিযানে ইরাকি সেনাদের তুলনায় ইরানি যোদ্ধাদের সংখ্যা ছিল দ্বিগুণ। কিন্তু সমরাস্ত্র, জঙ্গিবিমান ও অন্যান্য যুদ্ধ সরঞ্জামের দিক দিয়ে ইরাকি বাহিনী ছিল ইরানের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রগামী। ইরান এ অভিযানের সময় যে দিক দিয়ে ইরাকের চেয়ে এগিয়ে ছিল তা হলো  ইরানি যোদ্ধাদের সাহসিকতা, উচ্চ মনোবল ও শত্রুসেনার হাত থেকে মাতৃভূমি মুক্ত করার দৃঢ় প্রত্যয়।

আমরা এ আসরের গোড়ার দিকে ইরাকি সেনাদের হাতে খোররামশাহর শহরের পতনের বর্ণনা দিয়েছি।  তবে শহরটি মুক্ত করার অভিযানের আগে সংক্ষেপে পতনের ঘটনাটি আরেকবার উপস্থাপন করছি।  আমরা বলেছি, ইরানি যোদ্ধারা সীমিত অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে টানা ৩৪ দিন পর্যন্ত শহরটির পতন ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। অকুতোভয় লড়াই চালিয়ে শহর রক্ষার প্রচেষ্টায় নিয়োজিত যোদ্ধারা শেষ পর্যন্ত শহীদ হন এবং তাদের লাশের উপর দিয়ে আগ্রাসী ইরাকি সেনারা শহর দখল করে। জীবিত থাকতে ইরানি যোদ্ধারা শহরের পতন হতে দেননি।

১৯৮০ সালে খোররামশাহরের জনসংখ্যা ছিল প্রায় আড়াই লাখ। তখন এটি ছিল ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক বন্দর এবং বছরে ১৫ লাখ টন আমদানি পণ্য খালাস করে তা সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার ব্যবস্থা এ বন্দরে ছিল। এই বন্দরনগরীর কিছু উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সারাদেশের সঙ্গে এটির রেল যোগাযোগ রয়েছে, এই বন্দরে সবচেয়ে বড় জাহাজ ভিড়তে পারে এবং এই শহরের কাছেই রয়েছে তেলের খনি।  এ ছাড়া, সবুজ শ্যামল প্রকৃতি ও বিশাল বিশাল খেজুরের বাগান খোররামশাহরের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। ১৯৮০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর এই নগরীতে আগ্রাসী ইরাকি বাহিনী ভয়াবহ হামলা চালায়। মুহুর্মুহু কামানের গোলা ও মর্টার হামলায় নগরবাসী হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। শহরের বিভিন্ন স্থানে আগুন ধরে যায় এবং কামান ও মর্টারের গোলার বিস্ফোরণের শব্দে শহরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই নগরীর হাসপাতালগুলো হতাহত ইরানি নাগরিক দ্বারা পূর্ণ হয়ে যায়। ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা রাস্তার পাশে ও খোলা জায়গায় আশ্রয় নেন। তরুণ ও যুবকরা শহরের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদসহ অন্যান্য ঘাঁটিতে জড়ো হন শহর রক্ষার কাজে সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করার জন্য। দ্রুততম সময়ের মধ্যে বেসামরিক নাগরিকদের নিয়ে প্রতিরোধ ফ্রন্ট গড়ে তোলে সেনাবাহিনী ও আইআরজিসি। তবে যুদ্ধে ছিল চরম ভারসাম্যহীনতা। ইরাকি বাহিনীর হাতে ছিল ট্যাংক, কামান, মর্টার ও সাঁজোয়া যানসহ অন্যান্য ভারী যুদ্ধাস্ত্র। কিন্তু ইরানি যোদ্ধাদের কাছে ছিল কয়েক ধরনের বন্দুক ও কিছু আরপিজি। ৩৪ দিনের প্রতিরোধ যুদ্ধে খোররামশাহরের অনেক তরুণ ও যুবক শহীদ হয়ে গেলেও ইরাকিরা কয়েক দিনের ব্যবধানে গোটা ইরান দখল করবে বলে যে স্বগ্ন দেখেছিল তার বাস্তবায়ন কার্যকরভাবে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হয়।

শেষ পর্যন্ত যদিও শত্রুদের হাতে খোররামশাহরের পতন হয় তারপরও ইরানি যোদ্ধারা বীরের মতো লড়াই করে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে প্রতিরোধ চালিয়ে যান।  ১৯৮০ সালের ২৮ অক্টোবর ইরাকি সেনারা খোররামশাহর দখল করে নেয়।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ৩০

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।