মে ০৮, ২০১৬ ১১:১৯ Asia/Dhaka

'পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব' শীর্ষক নতুন ধারাবাহিক আলোচনার প্রথম পর্বে আপনাদের জানাচ্ছি সাদর আমন্ত্রণ! এই ধারাবাহিকে আমরা এমন সব মহান ইরানি ব্যক্তিত্বদের পরিচয় তুলে ধরব যাদের কবর ইরানের বর্তমান সীমান্তের বাইরে অবস্থিত। এই ব্যক্তিত্বদের চিন্তাধারা ও অবদানের প্রভাব ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হয়েছে। তাই তাঁরা কেবল ইরানের নন, বরং গোটা বিশ্ব-সভ্যতারই সম্পদ ও ঐতিহ্য।

 যেমন, মাওলানা রূমি, নিজামি গাঞ্জাভি,  শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দি, আবু রায়হান বিরুনি ও খাজা নাসিরউদ্দিন তুসি প্রমুখ বিখ্যাত ইরানি মনীষীর চিন্তাধারার কাছে বিশ্ব-সভ্যতা ঋণী। আজও মানবজাতি তাদের রেখে-যাওয়া জ্ঞানের ঝর্ণাধারা থেকে উপকৃত হচ্ছে।

ইরানি সভ্যতা ৫ হাজার বছরেরও পুরোনো। এমনকি আদিম বা প্রাচীনতম যুগের মানুষেরা ইরান অঞ্চলেই বসবাস করত বলে অনেকেই মনে করেন। তাদের হাতে গড়ে উঠেছিল গ্রাম্য-বসতি। প্রাচীন যুগে ইরানিদের  বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা ও বিশ্বের নেতৃস্থানীয় হওয়ার বিষয়টিও সভ্যতার অন্যতম নিয়ামক। এইসব বিষয়ের নানা নিদর্শন ও স্মৃতি-চিহ্ন এখনও টিকে রয়েছে।

ক্রুসেডের যুদ্ধগুলো মুসলমানদের জন্য ব্যাপক ক্ষতি বয়ে এনেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও এইসব যুদ্ধের সুবাদে ইউরোপীয়রা এশিয়ার সভ্যতাগুলো সম্পর্কে আরো বেশি জানতে পারে এবং ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চলের উপকূলগুলোতে তাদের প্রবেশের পথ সুগম হয়। আব্বাসীয় খিলাফতের পতনের পর পোপ ও কোনো কোনো ইউরোপীয় রাজদরবার থেকে বহু কাফেলা এশিয়ায় প্রবেশ করে। খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারক ও ব্যবসায়ীরা ইরান অঞ্চলেও প্রবেশ করে। ভেনিসের পর্যটক ও ব্যবসায়ী মার্কো পোলো গত তেরশট শতকে ইরান হয়ে চীনে যান এবং বিশ বছর পর আবারও ইরান হয়ে ইউরোপে ফিরে যান। মোঙ্গল সম্রাট হালাকু খানের যুগে ইরান ও বিশেষ করে তাব্রিজ শহর ইউরোপীয়দের জন্য সবচেয়ে বড় বাণিজ্য-কেন্দ্রে পরিণত হয়।

সাফাভি সম্রাটদের যুগে ইরানে শিয়া মুসলিম মাজহাব জোরদার হয়। এ সময় ইরান তুর্কি সুলতানদের পক্ষ থেকে হুমকীর মুখে ছিল। ওসমানিয় সুলতানরা নিজেদেরকে সব মুসলমানের খলিফা বলে মনে করতেন। এ সময় সাফাভি সম্রাটরা স্বাধীন সাংস্কৃতিক নীতি জোরদার করায় ইরান ইউরোপীয়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তুর্কি ওসমানিয়দের সঙ্গে সব সময়ই যুদ্ধে জড়িত ছিল ইউরোপীয়রা। এ অবস্থায় ইরানে ইউরোপীয় অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নানা প্রতিনিধি দল আসতে থাকে। এইসব  ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে পর্তুগাল, স্পেন, ব্রিটেন, হল্যান্ড, রাশিয়া, ফ্রান্স ও ইতালি। এই যুগে যেসব ইউরোপীয় পর্যটক ইরান সফর করে সফরনামা বা ভ্রমণ কাহিনী লিখেছেন তাদের মধ্যে শার্লি ব্রাদার্স, পিয়েত্রো দেল্লা ভাল্লে, রাফায়েল দো, ভার্নিয়ার, শার্দিন ও অ্যাডাম ওলিরিয়াসের নাম উল্লেখযোগ্য।

কাজারদের যুগে ইউরোপের সঙ্গে ইরানের যোগাযোগ আরো বাড়ে। কিন্তু ইউরোপীয় শাসকরা ইরানের ওপর শোষণ ও কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেয়ারই চেষ্টা করেছে সব সময়। তেহরানে খোলা হয় ইউরোপীয় দেশগুলোর দূতাবাস। এভাবে রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সম্পর্ক ছাড়াও ইরানের সঙ্গে ইউরোপের  বহু বণিক ও পর্যটকদেরও সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ইরানের আধ্যাত্মিক ও প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে প্রাকৃতিক বা বস্তুগত সম্পদের দিকেই বেশি নজর ছিল ইউরোপের। ১৯৫৮ সালে পশ্চিম ইরানের হাসানলু অঞ্চলের নাক্বদে শহরে আবিস্কৃত হয় একটি বিশাল স্বর্ণের পাত্র। এটি খ্রিস্টপূর্ব ছয় হাজার বছর আগের শিল্পকর্ম। আরো একটি সোনার পাত্র আবিস্কৃত হয়েছে উত্তর ইরানের রুদবারে। পাখাযুক্ত দু'টি গাভীর ছবির নক্সা রয়েছে এতে। নক্সাটি করা হয়েছে পাত্রটির গায়ে প্রমিনেন্স করে বা পাত্রের বাইরের সমান অংশের ওপর উঁচু করে। এ পাত্রটি প্রায় তিন হাজার বছরের পুরোনো।

ইরানের প্রাচীন ঐতিহ্যের অনেক নিদর্শনই চুরি করা হয়েছে। 'গাঞ্জে শয়গন' এইসব নিদর্শনের মধ্যে অন্যতম। 'গাঞ্জে শয়গন' বা শয়গনের সম্পদ আবিস্কৃত হয়েছিল কাজার সম্রাট মুজাফফরউদ্দিন শাহের শাসনামলে পশ্চিম ইরানের নাহাওয়ান্দ অঞ্চলের একটি প্রাচীন কেন্দ্রে যেখানে জরথ্রুস্তরা তাদের মৃত ব্যক্তিদের লাশ রেখে আসত। বহু মূর্তিসহ হাজার হাজার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে এখানে। এই নিদর্শনগুলো ছিল সাসানিয় ও পার্থিয়ান শাসনামলের। কিন্তু এইসব অমূল্য নিদর্শনকে গলিয়ে সোনা ও রূপার খণ্ডে পরিণত করে বিদেশে পাচার করা হয়। উনবিংশ শতকের প্রথম দিকেও ইরানে আসেন অনেক ইউরোপীয় পর্যটক ও প্রত্নতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞ। ব্রিটেনের উইলিয়াম কেনেট লোফটুস ১৮৮৮ সালে প্রথমবারের মতো শুশ অঞ্চলে খননকাজ চালান। তিনি অনেক মূল্যবান ঐতিহাসিক নিদর্শন ব্রিটেনে নিয়ে যান।

এরপর জ্যাকস ডি মোরগান ইরানের নানা অঞ্চলে খননকাজ চালান। তিনি শুশ অঞ্চলে প্রায় ১২০০ শ্রমিককে এই কাজে ব্যবহার করেন এবং প্রতি ১৮ মাস পর পর একটি মূল্যবান ইরানি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নিজের সঙ্গে ফ্রান্সে নিয়ে যান। পরে তিনি প্যারিসে ইরান থেকে লুট করে আনা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো প্রকাশ্যে প্রদর্শন করেন। 'হামুরাবি ফলক'ও সেখানে দেখানো হয়। বাবেল সাম্রাজ্যে ইরানের গৌরবময় বিজয়ের নিদর্শন হিসেবে এটি এখন প্যারিসের লুভর যাদুঘরে শোভা পাচ্ছে।  ফরাসিরা ইরানের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শনগুলো আবিস্কার এবং সেগুলোকে ফ্রান্সে নিয়ে যাওয়া অব্যাহত রাখে। এরপর ব্রিটেন ও আমেরিকাও আরো ব্যাপক মাত্রায় একই কাজ চালিয়ে যায়। লুটপাটের এই দুঃখজনক ধারা পাহলাভী শাসনামলে সর্বোচ্চ মাত্রায় উন্নীত হয়।

কিন্তু ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ী হলে সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো লুটের ধারা প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে ইরানের বিপ্লবী পরিষদ দেশটিতে যে কোনো ধরনের বানিজ্যিক খননকাজ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। অবশ্য সরকার অনুমতি-সাপেক্ষে বৈজ্ঞানিক খনন-কাজ চালাতে পারবে বলে পরিষদ জানিয়ে দেয়। এ আইনের ফলে ইরানের ঐতিহাসিক নিদর্শন আবিস্কারের কাজে বিদেশি প্রতিনিধিদের সফর এবং এ জাতীয় নিদর্শন বিদেশে নেয়া পুরোপুরি নিষিদ্ধ হয়ে যায়। অবশ্য এখনও মাঝে-মধ্যে চোরাই পথে ইরানের ঐতিহাসিক নিদর্শন বিদেশে পাচারের চেষ্টা করছে বিজাতীয় অসাধু বণিকরা ও তাদের একদল স্থানীয় সহযোগী যাদের বিবেক ও দেশপ্রেম বলতে কিছু নেই।

এদিকে ইরানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে লুট করার এক নতুন প্রচেষ্টা শুরু করেছে কোনো কোনো সরকার। এবার তারা ইরানের ঐতিহাসিক বা বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের পরিচিতিকে লুট করার টার্গেট নিয়ে কাজ করছে। এই লক্ষ্যে তারা কোনো কোনো খ্যাতিমান ইরানি ব্যক্তিত্বকে ইরানি না বলে ভিন্ন কোনো জাতির পরিচিতি আরোপ করছে তাদের ওপর। কিন্তু চাঁদের বা সূর্যের আলোকে যেমন ফুঁ দিয়ে নেভানো সম্ভব নয়, তেমনি বর্তমান ইরানের বাইরে দাফন হওয়া ইরানি ব্যক্তিত্বদের প্রকৃত, স্পষ্ট ও স্থায়ী ইরানি পরিচিতিকে মিথ্যার বেসাতি দিয়ে কখনও গোপন রাখা সম্ভব হবে না। #