আসমাউল হুসনা (পর্ব-২৭)
মহান আল্লাহর আসমাউল হুসনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম বাসির। এ শব্দের আভিধানিক অর্থ দৃষ্টি শক্তির অধিকারী বা দেখার কাজ সম্পন্নকারী।
আর পারিভাষিক অর্থ হল যিনি ভবিষ্যত সম্পর্কে বলতে পারেন এবং এরই আলোকে নানা বিষয়ে সঠিক পদক্ষেপ নেন। এক কথায় বাসির শব্দের অর্থ দূরদৃষ্টি ও অন্তর্দৃষ্টির অধিকারী। বাসির শব্দটি পবিত্র কুরআনে ৪০ বারেরও বেশি এসেছে। আর এ শব্দটি দশ বার এসেছে মহান আল্লাহর আরেকটি নাম সামিই্ বা সামিইয়ু'র পাশে। যেমন, সুরা আসরার প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে: নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ শোনেন ও দেখেন।–
মহান আল্লাহ ছোটো-বড় এবং গোপন ও প্রকাশ্য সবই দেখেন। তিনি যে কেবলই গোপন ও প্রকাশ তৎপরতা দেখতে পান তা নয় তিনি এমনকি আমাদের গোপন ইচ্ছা ও পরিকল্পনার কথাও জানেন। পারিভাষিক অর্থে বাসির হচ্ছেন এমন কেউ যিনি নিখুঁত জ্ঞানের অধিকারী এবং সত্য ও মিথ্যাকে পৃথক করার যথাযথ জ্ঞান ও ক্ষমতার অধিকারী। এ ধরনের যোগ্যতা কুরআনের জ্ঞান ও আল্লাহর জিক্র, গভীর চিন্তা-ভাবনা, ঘটনা-প্রবাহ থেকে শিক্ষা গ্রহণ, খোদাভীতি ও মহান আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ বিশ্বাসের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব।
কখনও কখনও মানুষকেও বাসির বলা হয়। তবে আল্লাহর ক্ষেত্রে ও মানুষের ক্ষেত্রে বাসির-এর মাত্রার পার্থক্য সীমাহীন। মহান আল্লাহ হচ্ছেন নিরঙ্কুশ বাসির বা দূরদৃষ্টির অধিকারী। আমরা যা কল্পনার মাধ্যমেও ভাবতে বা দেখতে পারি না মহান আল্লাহ তাও দেখেন। আমিরুল মু'মিনিন হযরত আলী (আ) বলেছেন, প্রতিষ্ঠিত প্রশংসা আল্লাহর, যার এক অবস্থা অন্যটির শর্ত নয়, যাতে তিনি শেষ হবার পূর্বেই প্রথম হতে পারেন অথবা গুপ্ত হবার পূর্বেই স্বপ্রকাশ হতে পারেন। তিনি ছাড়া যাকেই ‘এক’ (একাকী) বলা হয়,তাকেই ক্ষুদ্রতার জন্য তা বলা হয় এবং তিনি ব্যতীত যে কোন সম্মানিত ব্যক্তিই নগণ্য। তিনি ব্যতীত যে কোন ক্ষমতাবান ব্যক্তিই দুর্বল। তিনি ছাড়া প্রত্যেক মনিবই দাসানুদাস। তিনি ব্যতীত প্রত্যেক জ্ঞানীই জ্ঞানানুসন্ধানী। তিনি ছাড়া সকল শক্তিমানই কখনও শক্তিশালী ও কখনও অক্ষম এবং তিনি ছাড়া সব নিয়ন্ত্রকই নিয়ন্ত্রিত। তিনি ব্যতীত সকল শ্রবণকারীই বধির,কারণ হালকা স্বর সে শুনতে পায় না,আবার উচ্চস্বর তাকে বধির করে দেয় এবং দূরবর্তী স্বরও তার কানে পৌঁছে না। তিনি ছাড়া সকল দৃষ্টিমান ব্যক্তিই অন্ধ, কারণ সে গুপ্ত রং ও সূক্ষ্ম জিনিস দেখতে পায় না।
মহান আল্লাহ সুরা আলে ইমরানের ১৫ নম্বর আয়াতের একাংশে নিজের বাসির হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে বলেছেন: .... যারা খোদা-সচেতন বা খোদাভীরু, আল্লাহর কাছে তাদের জন্যে রয়েছে বেহেশত, যার তলদেশে প্রস্রবণ প্রবাহিত-তারা সেখানে থাকবে অনন্তকাল। আর রয়েছে পরিচ্ছন্ন সঙ্গিনীগণ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ওপর দৃষ্টি রাখেন।–

দুনিয়াতে কাফির ও মুমিনদের নেয়ামত অভিন্ন। কিন্তু পরকালের নেয়ামত কেবল বিশ্বাসীদের জন্য নির্ধারিত। মহান আল্লাহ বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীদের মধ্যে এই যে পার্থক্যের নীতি গ্রহণ করেছেন তা অনেকের মতে মহান আল্লাহর বাসিরাত বা দূরদৃষ্টিরই প্রকাশ। আর এ জন্যই ওই আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে: আর আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ওপর দৃষ্টি বা সুদৃষ্টি রাখেন। মহান আল্লাহ বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী- এ দুই গ্রুপকেই দেখেন এবং তিনি জানেন পরকালে এ দুই গ্রুপের শরীর ও প্রাণের কি কি চাহিদা রয়েছে। তিনি তাদের চাহিদা সবচেয়ে সুন্দরভাবে পূরণ করবেন।
মানুষ কোনো কিছু দেখার জন্য দুই চোখের ওপর নির্ভরশীল। মানুষের দেখার ক্ষমতা তার চোখ ও সুস্থতার ওপর নির্ভর করে। মহান আল্লাহ সুরা নাহ্ল্-এর ৭৮ নম্বর আয়াতে বলেছেন: আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের মায়ের গর্ভ থেকে বের করেছেন। তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদেরকে কান, চোখ ও অন্তর দিয়েছেন, যাতে তোমরা অনুগ্রহ স্বীকার কর।– অন্য কথায় মানুষকে শ্রবণ-শক্তির মত দেখার শক্তিও দেয়া হয়েছে যাতে মানুষ তার দায়িত্ব বুঝতে পারে ও ধর্মীয় দায়িত্বগুলো পালন করতে পারে।
অবশ্য মানুষকে অন্তরের চোখ বলেও দুটি চোখ দেয়া হয়েছে যাতে তার মাধ্যমে মানুষ আধ্যাত্মিক বিষয়গুলো অনুধাবন করে এবং বিশেষ করে মহান আল্লাহর নানা গুণ বা সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে পারে। নিজেকে বাহ্যিক দৃষ্টিতে দেখতে মনের এই চোখ দেয়া হয়নি।
মানুষ পবিত্র কুরআনের আলোকে এবং মহানবী (সা) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের দিক-নির্দেশনার আলোকে পথ চললে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যে তখন সে আল্লাহ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না। মহান আল্লাহ যখন কারো মঙ্গল চান তখন তার অন্তরের এই দুই চোখ বড় করে দেন ফলে সে এ দুনিয়াতেই মহান আল্লাহর দেয়া ওয়াদাগুলো দেখতে পারে ও হৃদয়ের চোখ দিয়ে আল্লাহর ওয়াদাগুলোর প্রতি বিশ্বাসী হতে পারে।
একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) ফজরের নামাজের পর আসহাবে সুফফাহর কাছে গেলেন। রাসূলুল্লাহ(সা.) প্রায়ই তাদের দেখতে যেতেন। সে দিন হঠাৎ এক যুবকের উপর রাসূলের(সা.) চোখ আটকে গেল। তিনি দেখলেন এ যুবকের মধ্যে অন্য রকম অবস্থা বিরাজ করছে- পা দু’টি টলটলায়মান, চোখ দু’টি কোটরের মধ্যে ঢুকে গেছে। তার রংও স্বাভাবিক নেই।
একদিন এক যুবককে মহানবী (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, কিভাবে রাত কাটিয়েছ?” সে জবাব দিল, “হে রাসূলুল্লাহ্(সা.)! এমনভাবে সকালে প্রবেশ করেছি যে, নিশ্চিত বিশ্বাসের অধিকারী হয়েছি। যা আপনি মুখে বলেছেন ও আমি কান দিয়ে শুনেছি তা এখন চোখে দেখছি !।” রাসূল চাইলেন সে আরও কিছু বলুক। তিনি বললেন, “তোমার ইয়াকীনের আলামত কি?” সে বলল, আমার ইয়াকীন দিনে আমাকে তৃষ্ণার্ত ও রাতে আমাকে জাগিয়ে রাখে” অর্থাৎ দিনে রোযা আর রাত্রিতে ইবাদত আমার ইয়াকীনের আলামত। রাসূল -সা বললেন, “আরো কোন আলামত আছে কি?” সে বলল, “যদিও এখন এ পৃথিবীতে আছি কিন্তু আখেরাতকে দেখছি ও সেখানকার শব্দ শুনছি। বেহেশতবাসীদের কণ্ঠ আর দোযখবাসীদের চীৎকার শুনতে পাই। যদি অনুমতি দেন, তবে একে একে আপনার সাহাবীদের পরিচয় বলে দিই, কে বেহেশতী, আর কে জাহান্নামী।” রাসূল বললেন, “নীরব হও। আর কোন কথা বল না।” -এরপর মহানবী (সা) তাঁর সঙ্গীদের বললেন, আল্লাহ এই যুবকের হৃদয়কে ঈমানের আলোয় উজ্জ্বল করেছেন।– হ্যাঁ! হৃদয়ের চোখ ঈমান ও জ্ঞানের আলোয় এভাবেই ঔজ্জ্বল্য পায়।
হাদিসে কুদসিতে এসেছে, যখন আমার বান্দাহ আমার নফল ও মুস্তাহাবকে ভালবাসতে থাকে তখন আমিও তাকে ভালবাসতে থাকি। ফলে যখন সে দেখে আমি তার চোখ হয়ে যাই, যখন সে কথা বলে তখন আমি তার জিহ্বা হয়ে যাই...।- তাই হৃদয়ের চোখের জ্যোতি বাড়াতে চাইলে দুনিয়ার প্রেম কমিয়ে খোদার প্রেম বাড়াতে হবে। নফল নামাজ ওয়াজিব নামাজের ঘাটতিগুলো ও নফল রোজা ওয়াজিব রোজার ক্রুটি-বিচ্যুতিগুলো পূরণ করে দেয়। মুস্তাহাব সাদাক্বা যাকাত ও খুমসের ঘাটতিগুলো দূর করে দেয়।#
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ১৬
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।