সূরা আশ-শূরা: আয়াত ১১-১৪ (পর্ব-৩)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'তে সূরা আশ-শূরার অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। মক্কায় অবতীর্ণ এ সূরার আয়াত সংখ্যা ৫৩। সূরার ৩৮ নম্বর আয়াতের আলোচনার বিষয়বস্তু থেকে এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে। এই আয়াতে মুমিন ব্যক্তিদেরকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার সময় শূরা বা পরামর্শ করে নিতে বলা হয়েছে। এই সূরার ১১ ও ১২ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
فَاطِرُ السَّمَاوَاتِ وَالأرْضِ جَعَلَ لَکُمْ مِنْ أَنْفُسِکُمْ أَزْوَاجًا وَمِنَ الأنْعَامِ أَزْوَاجًا یَذْرَؤُکُمْ فِیهِ لَیْسَ کَمِثْلِهِ شَیْءٌ وَهُوَ السَّمِیعُ الْبَصِیرُ ﴿١١﴾ لَهُ مَقَالِیدُ السَّمَاوَاتِ وَالأرْضِ یَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ یَشَاءُ وَیَقْدِرُ إِنَّهُ بِکُلِّ شَیْءٍ عَلِیمٌ ﴿١٢﴾
“তিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা। তিনি তোমাদের মধ্য হতে তোমাদের জোড়া সৃষ্টি করেছেন এবং পশুদের মধ্য হতে (সৃষ্টি করেছেন) পশুদের জোড়া; এভাবে তিনি তোমাদের বংশ বিস্তার করেন। কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয় এবং তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। ” (৪২: ১১)
“তাঁরই কাছে (রয়েছে) আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর চাবিকাঠি। তিনি যার জন্য ইচ্ছে রিযিক বাড়িয়ে দেন কিংবা সংকুচিত করেন। নিশ্চয় তিনি সবকিছু সম্পর্কে সর্বজ্ঞ।” (৪২: ১২)
এই আয়াতে বলা হচ্ছে: একমাত্র আল্লাহই আসমানসমূহ ও যমিন সৃষ্টি করেছেন এবং এখানকার সবকিছু প্রতিপালনের দায়িত্বও তিনি নিয়েছেন। তিনি মানুষের জন্য জোড়া অর্থাৎ স্বামী বা স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন। এরা পরস্পরের কাছে মানসিক প্রশান্তি লাভ করে এবং বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে মানুষের বংশ বিস্তার হয়। চতুষ্পদ জন্তুসহ অন্য সব উদ্ভিদ ও প্রাণীর ক্ষেত্রেও আল্লাহ তায়ালা একই বিধান নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
পৃথিবীতে আর কাউকে পাওয়া যাবে কি যে এমন প্রজ্ঞাবান ও ক্ষমতাধর? না, আল্লাহর সমকক্ষ বা তাঁর মতো আর কেউ নেই। তিনি সব ধরনের ত্রুটিবিচ্যুতি থেকে পবিত্র।
দুঃখজনকভাবে কিছু মানুষ বিশ্বাস করে, আল্লাহ বলে যদি কেউ থেকেও থাকেন তবে তিনি বিশ্বজগত সৃষ্টি করে এর পরিচালনার দায়িত্ব মানুষের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন এবং এখন বিশ্ব পরিচালনায় তাঁর কোনো ভূমিকা নেই। পবিত্র কুরআনে তীব্র ভাষায় এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রত্যাখ্যান করে বলা হয়েছে: আল্লাহ তায়ালা একইসঙ্গে বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা ও পরিচালনাকারী এবং তিনি সব কিছু দেখেন ও সব কিছু শোনেন। আমরা যা কিছু করি ও বলি তা তিনি দেখেন ও শোনেন। আসমানসমূহ ও জমিনের সব ধনভাণ্ডারের চাবিকাঠি তাঁর হাতে রয়েছে। প্রতিটি জীবের রিজিকের নিয়ন্ত্রণও আল্লাহ নিজ হাতে রেখেছেন। তিনি বান্দাদের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে কারো রিজিক বাড়িয়ে দেন আবার কারোটা সীমিত করে দেন।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- মানব জাতির বংশ বিস্তার ও পৃথিবীর বুকে টিকে থাকা নির্ভর করে নারী ও পুরুষের মধ্যে বিবাহ নামক বিধানের ওপর।
২- রিজিকের সংকীর্ণতা ও পর্যাপ্ততা আল্লাহ তায়ালার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে রিজিক বৃদ্ধি বা কম আল্লাহর সন্তুষ্টি বা ক্রোধের নিদর্শন নয়। এটি তাঁর প্রজ্ঞার ওপর নির্ভরশীল। বহু কাফের কাছে যাদেরকে তিনি প্রচুর ধনসম্পদ দান করেছেন, আবার অনেক মুমিন ব্যক্তি আছেন যারা দরিদ্র।
সূরা শুরার ১৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
شَرَعَ لَکُمْ مِنَ الدِّینِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِی أَوْحَیْنَا إِلَیْکَ وَمَا وَصَّیْنَا بِهِ إِبْرَاهِیمَ وَمُوسَى وَعِیسَى أَنْ أَقِیمُوا الدِّینَ وَلا تَتَفَرَّقُوا فِیهِ کَبُرَ عَلَى الْمُشْرِکِینَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَیْهِ اللَّهُ یَجْتَبِی إِلَیْهِ مَنْ یَشَاءُ وَیَهْدِی إِلَیْهِ مَنْ یُنِیبُ ﴿١٣﴾
“তিনি দ্বীনের যে বিধি-ব্যবস্থা নূহকে দিয়েছিলেন তোমাদের জন্যও তা-ই নির্ধারণ করেছেন। আর যা কিছু আপনাকে ওহীর মাধ্যমে দিলাম যার হুকুম দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে- (তা এই) যে, তোমরা দ্বীন প্রতিষ্ঠিত কর, আর তাতে বিভক্তি সৃষ্টি করো না। যার দিকে আপনি মুশরিকদের আহবান জানাচ্ছেন তা তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছে (তাকে) তাঁর নিজের প্রতি আকৃষ্ট করেন এবং যে তাঁর অভিমুখী হয় তাকে তিনি নিজের দিকে হেদায়েত করেন।” (৪২: ১৩)
সব নবী-রাসূলের দাওয়াতের মূল বিষয়বস্তু যে এক ছিল এই আয়াতে তার প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হচ্ছে: বিশ্বনবী (সা.) আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি যে আহ্বান জানাচ্ছেন তা নতুন কিছু নয়। অতীতের নবী-রাসূলগণও মানুষকে একই দাওয়াত জানিয়েছেন। তাঁরা সবাই যে কথাটি বলার জন্য নবুওয়াত লাভ করেছিলেন তা হলো: আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত করো এবং তাঁর বিধিবিধান পালন করো। মনের কুপ্রবৃত্তি যা চায় তা পরিত্যাগ করে আল্লাহর নির্দেশের সামনে আত্মসমর্পণ করো।
তবে যুগে যুগে ঐশী ধর্মগুলো যে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে তা হলো দ্বীনের অনুসারীদের মধ্যে বিভক্তি। সঠিকভাবে দ্বীন উপলব্ধি করতে ব্যর্থতা কিংবা দ্বীনের মধ্যে ব্যক্তিগত কামনা-বাসনাকে অন্তর্ভুক্ত করার কারণে এ অবস্থা সৃষ্টি হয়। এ কারণে এই আয়াতে দ্বীনের অনুসারীদেরকে বিভক্তির হাত থেকে বেঁচে থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এই আয়াতে আরো বলা হয়েছে, মুশরিকদের জন্য এক আল্লাহর ইবাদতের আহ্বান মেনে নেয়া কঠিন। কারণ, তাদের বিশ্বাসের মধ্যে শিরক এমনভাবে অনুপ্রবেশ করেছে যে, আল্লাহর একত্ববাদের কথা শুনলে তারা সহ্য করতে পারে না। আয়াতের পরের অংশে বলা হচ্ছে: আল্লাহ তায়ালা নিজের প্রজ্ঞা অনুযায়ী যাকে যোগ্য মনে করেছেন তাকে রিসালাতের দায়িত্ব অর্পন করেছেন। এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর অভিমুখী হবে সে তাঁর দয়া ও করুণা লাভ করবে এবং হেদায়েত প্রাপ্ত হবে।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- হযরত নূহ (আ.) ছিলেন পূর্ণাঙ্গ শরিয়তের অধিকারী প্রথম নবী এবং হযরত মুহাম্মাদ (সা.) হলেন পূর্ণাঙ্গ শরিয়তপ্রাপ্ত শেষ নবী ও রাসূল। অতীতের সব নবী-রাসূলের শিক্ষা শেষ নবীকে প্রদান করা হয়েছে বলে ইসলাম হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা পূর্ণাঙ্গতম ধর্ম।
২- দ্বীনের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হলে সমাজে আল্লাহর শিক্ষা সঠিকভাবে বাস্তবায়নের পথে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়।
সূরা শুরার ১৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
وَمَا تَفَرَّقُوا إِلا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْعِلْمُ بَغْیًا بَیْنَهُمْ وَلَوْلا کَلِمَةٌ سَبَقَتْ مِنْ رَبِّکَ إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى لَقُضِیَ بَیْنَهُمْ وَإِنَّ الَّذِینَ أُورِثُوا الْکِتَابَ مِنْ بَعْدِهِمْ لَفِی شَکٍّ مِنْهُ مُرِیبٍ ﴿١٤﴾
“আর (ঐশী ধর্মগুলোর অনুসারীদের) কাছে জ্ঞান আসার পর তারা শুধুমাত্র পারস্পারিক বিদ্বেষবশত নিজেদের মধ্যে মতভেদ ঘটায়। আর এক নির্ধারিত কাল পর্যন্ত (কাফেরদের অবকাশ দেয়া) সম্পর্কে আপনার রবের পূর্ব সিদ্ধান্ত না থাকলে তাদেরকে (ধ্বংস করার) ফয়সালা হয়ে যেত। ওদের পর যারা গ্রন্থের উত্তরাধিকারী হয়েছে, নিশ্চয় তারা এ (কুরআন) সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর সন্দেহে রয়েছে।” (৪২:১৪)
প্রতিটি যুগেই যে নবী বা রাসূল এসেছেন সেই যুগের মানুষের কর্তব্য ওই নবী বা রাসূলের আহ্বানে সাড়া দেয়া। নতুন শরিয়ত এসে গেলে কারো পক্ষে একথা বলার সুযোগ নেই যে, আমি পূর্ববর্তী নবীর অনুসারী এবং যারা নতুন দ্বীন গ্রহণ করেছে তারা সবাই কাফির। কেউ যদি নতুন নবীকে সঠিকভাবে চেনার পরও এই বক্তব্য দেয় তাহলে বুঝতে হবে শুধুমাত্র বিদ্বেষ ও শত্রুতার কারণে সে এই বক্তব্য দিচ্ছে। ঠিক এই কারণেই বর্তমান পৃথিবীর ইহুদি ও খ্রিস্টানরা ইসলাম গ্রহণ করতে রাজি হয়নি। আরো দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, ওই দুই ধর্মের কিছু অনুসারী প্রচারযন্ত্র ব্যবহার করে ইসলাম ও কুরআনে কারিমের সত্যতা নিয়ে মারাত্মক সংশয় ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেয়ার কাজে লিপ্ত রয়েছে।
আয়াতের পরবর্তী অংশে বলা হচ্ছে: কাফেরদের মৃত্যুর সময় আগে থেকে নির্ধারণ করা না থাকলে আল্লাহ বাতিলের অনুসারী সবাইকে ধ্বংস করে দিতেন এবং দ্বীনের অনুসারীদেরকে বিজয়ী করতেন। আয়াতের শেষাংশে সন্দেহবাতিক লোকদের ঈমান না আনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের এই সন্দেহের উৎস গোয়ার্তুমি ও হঠকারিতা হওয়ার কারণে তারা বিভ্রান্তির অতলে হারিয়ে গেছে।
এই আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় দিক হলো:
১- দ্বীনের অনুসারীদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা আলেমদের দায়িত্ব; বিভক্তি সৃষ্টি করা নয়।
২- কোনো কিছু নিয়ে গবেষণা করার উদ্দেশ্যে যদি কেউ সন্দেহ করে তাহলে সে ব্যক্তি গবেষণার মাধ্যমে সঠিক পথের দিশা পেয়ে যায়। কিন্তু গোয়ার্তুমি বা অহংকার করলে তার পক্ষে সঠিক পথ পাওয়া সম্ভব হয় না।#
পার্সটুডে/এমএমআই/আবুসাঈদ/০৬
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।