সূরা আশ-শূরা: আয়াত ৩৬-৩৯ (পর্ব-৮)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'তে সূরা আশ-শূরার অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। মক্কায় অবতীর্ণ এ সূরার আয়াত সংখ্যা ৫৩। সূরার ৩৮ নম্বর আয়াতের আলোচনার বিষয়বস্তু থেকে এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে। এই আয়াতে মুমিন ব্যক্তিদেরকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার সময় শূরা বা পরামর্শ করে নিতে বলা হয়েছে। এই সূরার ৩৬ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
فَمَا أُوتِيتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَمَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَمَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ وَأَبْقَى لِلَّذِينَ آمَنُوا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ ﴿۳۶﴾
“সুতরাং তোমাদেরকে যা কিছু দেয়া হয়েছে তা পার্থিব জীবনের ভোগ্য সামগ্ৰী মাত্র। আর আল্লাহর কাছে যা আছে তা উত্তম ও স্থায়ী, তাদের জন্য যারা ঈমান আনে এবং তাদের প্রতিপালকের ওপর নির্ভর করে।”(৪২: ৩৬)
এই আয়াতে বলা হচ্ছে: আল্লাহ তায়ালা পার্থিব জীবনে তাঁর বান্দাদেরকে যা কিছু দিয়েছেন তার সবই ক্ষণস্থায়ী। কেউ যেন একথা না ভাবে যে, এসব সম্পদ, প্রাচুর্য ও ক্ষমতা তার কাছে চিরদিন থাকবে। পক্ষান্তরে পরকালে ঈমানদার ও সৎকর্মশীল বান্দাদের জন্য পুরস্কার হিসেবে যা কিছু অপেক্ষা করছে তা চিরস্থায়ী। কাজেই কেউ যদি এই ক্ষণস্থায়ী ও দ্রুত ধ্বংসশীল পার্থিব ভোগ্যসামগ্রীর বিনিময়ে পারলৌকিক চিরস্থায়ী পুঁজি ক্রয় করে তাহলে সে মহা লাভজনক এক ব্যবসা করল। আল্লাহ তায়ালা পার্থিব জীবনের ভোগসামগ্রী ঈমানদার-কাফির নির্বিশেষে সবাইকে দান করেছেন। কিন্তু পরকালীন পুরস্কার শুধুমাত্র সেইসব ঈমানদার ও পবিত্র মানুষদের জন্য নির্ধারিত যারা পার্থিব জীবনের এই ভোগসামগ্রীর সঠিক ব্যবহার করে নিজেদের পরকালকে ফুলে-ফলে সুশোভিত করতে পেরেছেন।
মুমিন ব্যক্তি তাঁর ধর্মীয় বিধিনিষেধ পালন করতে গিয়ে সব ধরনের পাপ ও গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকেন এবং অনেক লোভনীয় ইন্দ্রীয়সুখ থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখেন। আর আল্লাহ তায়ালা তাঁর এসব বান্দার এই বঞ্চনা পরকালীন জীবনে বহু গুণে মিটিয়ে দেবেন এবং দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ইন্দ্রীয়সুখের চেয়ে হাজারো গুণ উত্তম সুখ দান করবেন।
পৃথিবীতে একদল মানুষ অত্যন্ত কৃপণ এবং তারা সম্পদ জমা করার কাজে দিনরাত ব্যস্ত। পক্ষান্তরে ঈমানদার ব্যক্তি আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ নির্ভরশীল হওয়ার কারণে প্রয়োজন অতিরিক্ত সম্পদ জমা না করে দরিদ্র ও অসহায়দের মধ্যে বিলিয়ে দেন। তারা সম্পদ ও ক্ষমতাকে ক্ষণস্থায়ী মনে করেন বলে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালার ওপর নির্ভর করেন। তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, আল্লাহ তায়ালার ওপর ভরসা করলে দুর্দিনে তিনি অবশ্যই কোনো না কোনো উপায়ে তাদের প্রয়োজন পূরণ করবেন; সেদিনের জন্য সম্পদ জমিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই।
এই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:
১- মুমিন ব্যক্তি দুনিয়ায় জীবনযাপন করে ঠিকই কিন্তু তার চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকে আখিরাত। তিনি পৃথিবীতে যা কিছু থেকে বঞ্চিত হন আখিরাতে আল্লাহ তায়ালা তা লক্ষকোটি গুণ বাড়িয়ে তাকে দান করেন।
২- যারা দুনিয়ার সম্পদ ও ক্ষমতার ওপর নির্ভর না করে মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করেন তারাই প্রকৃত ঈমানদার।
সূরা শুরার ৩৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
وَالَّذِينَ يَجْتَنِبُونَ كَبَائِرَ الْإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ وَإِذَا مَا غَضِبُوا هُمْ يَغْفِرُونَ ﴿۳۷﴾
“এবং যারা গুরুতর পাপ ও অশ্লীল কাজ হতে দূরে থাকে এবং ক্রোধান্বিত হলে ক্ষমা করে দেয়।” (৪২: ৩৭)
এই আয়াতে বলা হচ্ছে: যারা পরকালে ঐশী পুরস্কার লাভ করবে তারা দুনিয়ার জীবনে অশ্লীলতা ও কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে এবং সব ধরনের অপবিত্রতা থেকে নিজেদের মুক্ত রাখে। কারণ, ঈমান ও অপবিত্রতা এক পাত্রে থাকতে পারে না।
নিজেদের নফ্স বা প্রবৃত্তির ওপর মুমিন ব্যক্তিদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে। তারা ক্রোধের সময় নিজেদের হাত ও মুখ নিয়ন্ত্রণে রাখেন এবং কোনো অশ্লীল কথা বলেন না। ক্রোধ হচ্ছে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের মতো যা মানুষের অন্তরকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। বেশিরভাগ মানুষ এরকম পরিস্থিতিতে নিজের নফ্স বা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না। নানা কারণে যেকোনো মানুষ রাগান্বিত হতেই পারে কিন্তু সেই রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারাটাই ঈমানদারিত্বের পরিচায়ক।
ঈমান মানুষের মধ্যে ক্ষমা করে দেয়ার মানসিকতাকে শক্তিশালী করে। ঈমানদার ব্যক্তি ক্রোধের সময় প্রতিশোধ নেয়ার পরিবর্তে প্রতিপক্ষকে ক্ষমা করে দেন। তারা কিয়ামতের দিন আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার আশা করেন বলে পার্থিব জীবনে এই গুণ প্রদর্শন করতে পারেন। হাদিসে এসেছে, রাগের সময় কেউ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে কিনা তা দেখে বন্ধু নির্বাচন করা উচিত।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- ঈমান শুধু অন্তরে পোষণ করে রাখার মতো কোনো বিষয় নয় বরং ব্যক্তির কথা ও আচরণে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে হবে। গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং কুপ্রবৃত্তি ও ক্রোধ নিয়ন্ত্রণে রাখা ঈমানের পরিচায়ক।
২- ক্রোধের সময় যে অপরকে ক্ষমা করতে পারে না সে প্রকৃত ঈমানদার নয়।
সূরা শুরার ৩৮ থেকে ৩৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
وَالَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِرَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ ﴿۳۸﴾ وَالَّذِينَ إِذَا أَصَابَهُمُ الْبَغْيُ هُمْ يَنْتَصِرُونَ ﴿۳۹﴾
“এবং যারা তাদের প্রতিপালকের আহবানে সাড়া দেয়, নামায প্রতিষ্ঠা করে, এবং তাদের কার্যাবলী পরস্পর পরামর্শের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়। আর তাদেরকে যে রুজি দিয়েছি, তা হতে ব্যয় করে।” (৪২:৩৮)
“আর যখন তাদের উপর সীমালঙ্ঘন হয় তখন তারা [আত্মসমর্পণ না করে সীমালঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে] সাহায্য চায়।” (৪২:৩৯)
এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: ঈমানদার ব্যক্তিরা সরল পথে চলার জন্য তাদের প্রতিপালক যে আহ্বান জানিয়েছেন তাতে সর্বান্তকরণে সাড়া দেন এবং একমাত্র তাঁর সামনে মাথা নত ও নামাজ আদায় করেন। সেইসঙ্গে দরিদ্র ব্যক্তিদের খোঁজখবর নেয় এবং নিজেদের সম্পদের একাংশ হতে তাদেরকে দান করে।
এ ধরনের মানুষ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে অপরের মতামতের প্রতি সম্মান জানান এবং সবার সঙ্গে পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করেন। ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখব রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবীরা এই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। বিশ্বনবী (সা.) সামাজিক বিষয়াদিতে সবার সঙ্গে পরামর্শ করতেন এবং তাঁর মতের বিপরীত হলেও অধিকাংশের মতামতের প্রতি তিনি সম্মান জানাতেন।
ওহুদের যুদ্ধ এরকম ঘটনার স্পষ্ট উদাহরণ। ওই যুদ্ধের পদ্ধতি নিয়ে পরামর্শ করতে গিয়ে তিনি অধিকাংশের মতামতকে প্রাধান্য দেন; যদিও শেষ পর্যন্ত ওই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী পরাজিত হয় এবং রাসূলের ৭০ জন সাহাবী নিহত হন।
অবশ্য মনে রাখতে হবে, যেসব বিষয়ে আল্লাহর স্পষ্ট নির্দেশ বা নিষেধ রয়েছে সেসব বিষয়ে পরামর্শ করা যাবে না। পরামর্শ করতে হবে স্পষ্ট বিধান নেই এমন সব পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে।
পরের আয়াতে ঈমানদারের যে বৈশিষ্ট্যটি বর্ণনা করা হয়েছে তা হলো- তারা সীমালঙ্ঘন ও সীমালঙ্ঘনকারীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। মুমিন ব্যক্তি জুলুম সহ্য করেন না বরং জালেমের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য অন্যের সাহায্য চান।
এই দুই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:
১- শুধু ইবাদতে ঈমানদার হলেই চলবে না বরং অন্যান্য সামাজিক বিষয়াদিতেও আল্লাহর বিধান পরিপূর্ণভাবে মেনে চলতে হবে।
২- কোনো বিষয়ে একক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ঈমানের পরিচয় বহন করে না। মুমিন ব্যক্তি অপরের মতামতকে গুরুত্ব দেন
৩- অন্যায় ও সীমালঙ্ঘনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো ঈমানদার ব্যক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।#
পার্সটুডে/এমএমআই/আবুসাঈদ/০৭
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।