সূরা আশ-শূরা: আয়াত ৪০-৪৩ (পর্ব-৯)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'তে সূরা আশ-শূরার অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। মক্কায় অবতীর্ণ এ সূরার আয়াত সংখ্যা ৫৩। সূরার ৩৮ নম্বর আয়াতের আলোচনার বিষয়বস্তু থেকে এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে। এই আয়াতে মুমিন ব্যক্তিদেরকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার সময় শূরা বা পরামর্শ করে নিতে বলা হয়েছে। এই সূরার ৪০ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَجَزَاءُ سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِثْلُهَا فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ ﴿۴۰﴾
“আর মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ। অতঃপর যে ক্ষমা করে দেয় ও আপস-নিষ্পত্তি করে তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে আছে। নিশ্চয় তিনি জালিমদেরকে পছন্দ করেন না।”(৪২: ৪০)
আগের আসরে আমরা সর্বশেষ যে আয়াত নিয়ে আলোচনা করেছিলাম তাতে সীমালঙ্ঘনকারীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কথা বলা হয়েছিল। মুমিন ব্যক্তি কখনো সীমালঙ্ঘন মেনে নেয় না বরং প্রয়োজনে সীমালঙ্ঘনকারীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য অপরের সাহায্য চায়।
এরপর এই আয়াতে বলা হচ্ছে: কিন্তু যে খারাপ কাজ করেছে তাকে দণ্ড দিতে গিয়ে তার খারাপ কাজের চেয়ে বেশি শাস্তি দেয়া যাবে না বরং সে যতটুকু মন্দ কাজ করেছে ঠিক ততটুকু শাস্তি দিতে হবে। সূরা বাকারার ১৯৪ নম্বর আয়াতেও মন্দ কর্মের অনুরূপ শাস্তি প্রদান সম্পর্কে দিকনির্দশনা রয়েছে।
আয়াতের পরের অংশে বলা হচ্ছে: যদি জালিম বা সীমালঙ্ঘনকারী ব্যক্তি তার কৃতকর্মের ব্যাপারে অনুতপ্ত হয় ও ক্ষমা চায় তাহলে তাকে ক্ষমা করে তার সঙ্গে আপোস করে ফেলতে হবে। আল্লাহ তায়ালা প্রতিশোধ নেয়ার চেয়ে এই ক্ষমা প্রদানকে বেশি ভালোবাসেন এবং এই ক্ষমার জন্য তাঁর কাছে মহামূল্যবান পুরস্কার রয়েছে।
নিঃসন্দেহে আল্লাহ তায়ালা এই নির্দেশের মাধ্যমে জালিমের পক্ষ অবলম্বন করে তাঁকে সমর্থন করেননি; বরং সমাজে বসবাসকারী মানুষের মধ্যকার হিংসা-বিদ্বেষ মিটিয়ে দিয়ে তাদের মধ্যে শান্তি ও ভালোবাসার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে এই আয়াত নাজিল করেছেন।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- যে ব্যক্তি জুলুমের শিকার হয়েছেন জালিমের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার একমাত্র অধিকার তার। তিনি ইচ্ছা করলে জুলুমের সমপরিমাণ শাস্তি প্রদান করতে অথবা জালিমকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। তবে মনে রাখতে হবে, শাস্তি দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো অবস্থাতেই অনুরূপ পরিমাণের বেশি হতে পারবে না। যদি বেশি হয়ে যায় তাহলে সমাজে হিংসা-হানাহানি লেগেই থাকবে।
২- ইসলাম অপরাধী ব্যক্তিকে বাগে পাওয়ার পরও তাকে ক্ষমা করে দিতে উৎসাহিত করেছে। আর এজন্য আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা প্রদানকারী ব্যক্তির জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা রেখেছেন।
সূরা শুরার ৪১ ও ৪২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
وَلَمَنِ انْتَصَرَ بَعْدَ ظُلْمِهِ فَأُولَئِكَ مَا عَلَيْهِمْ مِنْ سَبِيلٍ ﴿۴۱﴾ إِنَّمَا السَّبِيلُ عَلَى الَّذِينَ يَظْلِمُونَ النَّاسَ وَيَبْغُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ ﴿۴۲﴾
“এবং যারা অত্যাচারিত হওয়ার পর সাহায্য চায় (ও প্রতিশোধ গ্রহণ করে), তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্ৰহণ করা হবে না।” (৪২:৪১)
“ব্যবস্থা শুধু তাদের বিরুদ্ধে অবলম্বন করা হবে যারা মানুষের উপর জুলুম করে এবং জমিনে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহাচরণ করে বেড়ায়, তাদেরই জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (৪২: ৪২)
আগের আয়াতের ধারাবাহিকতায় এই আয়াতে আবারো তাগিদ দেয়া হয়েছে যে, যিনি অত্যাচারিত হয়েছেন ক্ষমা বা শাস্তি দেয়ার একমাত্র অধিকার তার। অন্য কেউ তাকে এ কাজে বাধ্য করতে পারবে না। তবে নির্যাতিত ব্যক্তি একাকি জালিমকে শাস্তি দিতে সক্ষম না হলে তিনি এ কাজে অপরের সাহায্য নিতে পারবেন।
কাজেই নির্যাতিত ব্যক্তি যদি নির্যাতনের শিকার হওয়ার কারণে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে চায় তাহলে সে কোনো অন্যায় করেনি। কাজেই এজন্য তাকে ভর্ৎসনা করা যাবে না; বরং ভর্ৎসনা করতে হবে তাকে যে অপরের উপর জুলুম করেছে বা অন্যায়ভাবে কারো অধিকার কেড়ে নিয়েছে। এ ধরনের মানুষ অন্যায়ভাবে নিজেদেরকে সমাজের অন্যদের তুলনায় উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন মনে করে এবং আইন লঙ্ঘনের মাধ্যমে অন্য মানুষের উপর অত্যাচার চালায়। এসব জালিম পার্থিব জীবনে মানুষের ভর্ৎসনা ও প্রতিশোধের শিকার হয় এবং পরকালে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- নির্যাতিত ব্যক্তি প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য অপরের সাহায্য চাইতে পারে এবং সমাজের উচিত এ কাজে তাকে সহযোগিতা করা।
২- অপরের অধিকার লঙ্ঘন করার অধিকার পৃথিবীর কাউকে দেয়া হয়নি। কাজেই কেউ তা করলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
৩- আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা বা সমাজের প্রচলিত আইন লঙ্ঘন করলে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও গোলযোগ দেখা দেয়। কাজেই কেউ এমন কাজ করলে সমাজের বাকি লোকদের উচিত তাকে ভর্ৎসনা করা ও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যাতে সমাজকে বিশৃঙ্খলার হাত থেকে রক্ষা করা যায়।
সূরা শুরার ৪৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
وَلَمَنْ صَبَرَ وَغَفَرَ إِنَّ ذَلِكَ لَمِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ ﴿۴۳﴾
“আর যে ধৈর্যধারণ করে এবং ক্ষমা করে, নিশ্চয় তা দৃঢ়সংকল্পেরই কাজ।” (৪২:৪৩)
এই আয়াতে আবারো অপরাধী ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলা হচ্ছে: আল্লাহ তায়ালা জালিমকে শাস্তি দেয়ার অনুমতি দিয়েছেন ঠিকই কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, মানুষ ক্ষমা ও অনুকম্পা প্রদর্শনের মহান গুণের কথা ভুলে যাবে এবং একে অপরের দোষত্রুটি ক্ষমা করবে না।
আয়াতে বলা হচ্ছে: অন্যের অপরাধ ক্ষমা করে দেয়া একটি কঠিন কাজ এবং এজন্য চরম ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই কঠিন কাজটি আল্লাহর দরবারে অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ। স্বাভাকিভাবেই প্রতিশোধস্পৃহাকে দমনের মাধ্যমে নিজের অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টিকে ভুলে যাওয়া সবার পক্ষে সম্ভব নয়। কাজটি অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু যারা মহান ও প্রশান্ত আত্মার অধিকারী এবং যাদের অন্তরে দৃঢ় সংকল্প রয়েছে তারা সহজেই এই কঠিন কাজটি সম্পন্ন করেন।
সার্বিকভাবে আজকের সবগুলো আয়াতে যে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলা হয়েছে তা হলো: যে ব্যক্তি জুলুম বা অপরের অধিকার লঙ্ঘন করেছে তার সঙ্গে দুই ধরনের আচরণ করা যায়। একটি হচ্ছে তাকে শাস্তি দেয়া এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে তাকে ক্ষমা করে দেয়া। এক্ষেত্রে সমাজের প্রচলিত বিধান, আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা এবং নির্যাতনকারী ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির অবস্থা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কখনো এমন হতে পারে যে, নির্যাতনকারী ব্যক্তি অনুতপ্ত হয়ে ব্যক্তি ও সমাজের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। আবার কখনো নির্যাতনকারী ব্যক্তি তার কৃতকর্মের জন্য মোটেও অনুতপ্ত হয় না বরং অর্থ, ক্ষমতা বা গায়ের জোরে নিজের অপরাধকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করে।
আবার নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি কখনো উন্নত চরিত্রের অধিকারী ঈমানদার ব্যক্তি হন এবং সহজেই অপরাধীকে ক্ষমা করে দেন। আবার কখনো নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিটি এমন পরিস্থিতিতে পড়েন যে তার পক্ষে তার অধিকার লঙ্ঘন বা নির্যাতনের বিষয়টি ক্ষমা করে দেয়া সম্ভব হয় না বরং তিনি যেকোনো মূলে অপরাধীর শাস্তি বা প্রতিশোধ চাইতে থাকেন। এ ধরনের প্রতিটি পরিস্থিতিতে করণীয় কি- সে সম্পর্কে আজকের আয়াতগুলোতে আলোচনা করা হয়েছে।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি বিষয় হচ্ছে:
১- পবিত্র কুরআনের মর্মবাণী হচ্ছে ধৈর্যধারণ ও ক্ষমা প্রদর্শন। একই সঙ্গে ইসলাম অপরাধী ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়ার বিধানও উন্মুক্ত রেখেছে।
২- ক্ষমা একটি মহৎ গুণ যা করতে খোদ আল্লাহ তায়ালা উৎসাহিত করেছেন।#
পার্সটুডে/এমএমআই/আবুসাঈদ/০৭
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।