জুলাই ০৭, ২০২১ ১৫:০৯ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'তে সূরা আশ-শূরার অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। মক্কায় অবতীর্ণ এ সূরার আয়াত সংখ্যা ৫৩। সূরার ৩৮ নম্বর আয়াতের আলোচনার বিষয়বস্তু থেকে এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে। এই আয়াতে মুমিন ব্যক্তিদেরকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার সময় শূরা বা পরামর্শ করে নিতে বলা হয়েছে। এই সূরার ৪৪ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَمَنْ یُضْلِلِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ وَلِیٍّ مِنْ بَعْدِهِ وَتَرَى الظَّالِمِینَ لَمَّا رَأَوُا الْعَذَابَ یَقُولُونَ هَلْ إِلَى مَرَدٍّ مِنْ سَبِیلٍ ﴿٤٤﴾

আর আল্লাহ যাকে (তার কৃতকর্মের শাস্তিস্বরূপ) পথভ্রষ্ট করেন, এরপর তার জন্য কোন অভিভাবক নেই। আর যালিমরা যখন শাস্তি দেখতে পাবে তখন আপনি তাদেরকে বলতে দেখবেন, (দুনিয়াতে) ফিরে যাওয়ার কোন উপায় আছে কি?(৪২: ৪৪)

আল্লাহ তায়ালার একটি বিধান হচ্ছে, মানুষকে ওহী ও আক্ল বা বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যমে হেদায়েত দান করা  এ কাজের উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষ যাতে অসংখ্য ভুল পথ থেকে সঠিক পথকে আলাদা করতে পারে এবং পরবর্তীতে এই অজুহাত তুলতে না পারে যে, তাদের পক্ষে সঠিক পথ চেনা সম্ভব হয়নি এবং তারা একথা বুঝতেই পারেনি যে, তারা যা করেছে তা সঠিক ছিল না

কিন্তু যারা সঠিক পথের সন্ধান পাওয়ার পরও তার বিপরীতে নিজেদের জীবন পরিচালনা করেছে তারা প্রকৃতপক্ষে হেদায়েতের পথ ছেড়ে ইচ্ছাকৃতভাবে ভ্রান্ত পথ বেছে নিয়েছে  কাজেই এই পথভ্রষ্টতার জন্য মানুষ নিজেই দায়ী কারণ, সে জেনেশুনে ভ্রান্ত পথ বেছে নেয়ার কারণে ধীরে ধীরে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে এবং খারাপ জিনিসকে সে ভালো মনে করতে শুরু করেছে

কাজেই একথা পরিষ্কার যে, হেদায়েত ও পথভ্রষ্টতা- এর উভয়ই মানুষের নিজেরই কর্মের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি কখনো কখনো মানুষ এত বেশি খারাপ কাজ করে ফেলে যে, আল্লাহ তায়ালা তার অন্তর থেকে হেদায়েতের আলো উঠিয়ে নেন এবং তাকে দিকভ্রান্ত করে দেন তার সঙ্গে আল্লাহর কোনো পূর্ব শত্রুতা ছিল না বরং তার এ পথভ্রষ্টতার জন্য সে নিজে দায়ী

অবশ্য কিয়ামতের দিন এসব মানুষ তাদের ভুল বুঝতে পারবে এবং কোন্মন্দ কাজের জন্য তারা পথভ্রষ্ট হয়ে গিয়েছিল তা তাদের সামনে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে যাবে সেদিনের অনুশোচনা তাদের কোনো কাজে আসবে না এবং তাদের পৃথিবীর জীবনে ফিরে আসার আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হবে মানুষ যেমন বৃদ্ধ অবস্থা থেকে যৌবনে বা যৌবন থেকে শিশুকালে ফিরে যেতে পারে না, তেমনি পরকালীন জীবন থেকে পার্থিব জীবনে ফিরে আসাও সম্ভব নয়

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

- আল্লাহ তায়ালা তাঁর মনের ইচ্ছা অনুযায়ী কাউকে পথভ্রষ্ট করেন না বরং পথভ্রষ্টতা ব্যক্তির কর্মের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি  

- পথভ্রষ্ট জালিম ব্যক্তিদের জানা উচিত আল্লাহর মহাশক্তির সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতা কারো নেই আল্লাহর ক্রোধ থেকে কেউ নিজেকে রক্ষা করতে পারবে না কাজেই আমাদের সবার উচিত একমাত্র তাঁর ওপর নির্ভর করা তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা

সূরা শুরার ৪৫ ও ৪৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

وَتَرَاهُمْ یُعْرَضُونَ عَلَیْهَا خَاشِعِینَ مِنَ الذُّلِّ یَنْظُرُونَ مِنْ طَرْفٍ خَفِیٍّ وَقَالَ الَّذِینَ آمَنُوا إِنَّ الْخَاسِرِینَ الَّذِینَ خَسِرُوا أَنْفُسَهُمْ وَأَهْلِیهِمْ یَوْمَ الْقِیَامَةِ أَلا إِنَّ الظَّالِمِینَ فِی عَذَابٍ مُقِیمٍ ﴿٤٥﴾ وَمَا کَانَ لَهُمْ مِنْ أَوْلِیَاءَ یَنْصُرُونَهُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَمَنْ یُضْلِلِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ سَبِیلٍ ﴿٤٦﴾

আর আপনি তাদেরকে দেখতে পাবেন যে, তাদেরকে জাহান্নামের সামনে উপস্থিত করা হচ্ছে; তারা অপমানে অবনত মস্তকে আড় চোখে তাকাচ্ছে; আর যারা ঈমান এনেছে তারা বলবে: নিশ্চয় ক্ষতিগ্ৰস্ত তারাই যারা নিজেদের ও নিজেদের পরিজনবর্গকে পরাজিত করেছে (অর্থাৎ পরিজনবর্গের ক্ষতি সাধন করেছে)  জেনে রাখুন, নিশ্চয় জালিমরা স্থায়ী শাস্তিতে নিপতিত থাকবে।” (৪২:৪৫)

আর আল্লাহ্‌র সামনে তাদেরকে সাহায্য করার জন্য তাদের কোন অভিভাবক থাকবে না। আর আল্লাহ যাকে (তার কৃতকর্মের ফলস্বরূপ) পথভ্রষ্ট করেন তার মুক্তির কোন উপায় নেই।” (৪২: ৪৬)

এই দুই আয়াতে কিয়ামতের দিন জালিমদের চরম ভয়াবহ পরিস্থিতির বর্ণনা দেয়া হয়েছে যারা পার্থিব জীবনে দম্ভভরে অন্যদেরকে ভয় দেখিয়েছে, যাদের জুলুম অত্যাচারে মানুষ সারাক্ষণ আতঙ্কিত থেকেছে আজ তারা এমন আতঙ্কজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে যে, ভয়ে মাথা তোলার সাহস পাচ্ছে না চরম অপমানিত অপদস্থ অবস্থায় তারা গুটিসুটি মেরে রয়েছে

তবে এই শারিরীক শাস্তির চেয়ে তারা বেশি কষ্ট পাচ্ছে মুমিন ব্যক্তিদের ভর্ৎসনায় মুমিনরা তাদেরকে বলছে: তোমরা দুনিয়ায় সম্পদ ক্ষমতার দম্ভ দেখাতে; অথচ এখন দেখো কত বিশাল ক্ষতির মুখোমুখি তোমরা হয়েছ আজ তোমরা খালিহাতে দীনহীন অবস্থায় এখানে দাঁড়িয়ে আছো 

মুমিন ব্যক্তিরা আরো বলবে: শুধু তোমরা নও তোমাদের সকল অনুসারীও আজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কারণ, এসব অনুসারী মনে করত তোমাদের সঙ্গে থাকলেই বুঝি চিরজীবন বিত্ত বৈভব নিয়ে সুখে জীবন কাটানো যাবে অথচ আজ তারা দেখতে পাচ্ছে তোমরা নিজেরাই নিজেদের রক্ষা করার ক্ষমতা রাখো না, তাদেরকে বাঁচাবে কীভাবে?

কাজেই এর চেয়ে ক্ষতি আর কিছু হতে পারে না যে, মানুষ ভ্রান্ত পথ অনুসরণ করে নিজের পাশাপাশি স্ত্রী-পুত্র-পরিজনকেও পরকালীন ক্ষতির সম্মুখীন করে এরপর বলা হচ্ছে: পার্থিব জীবনে তাদের যেসব মন্দকাজ তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল সেই মন্দ কাজই আজ তাদেরকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাচ্ছে; যে জাহান্নামের শাস্তি চিরস্থায়ী এবং কখনো শেষ হওয়ার নয় সেখানে জাহান্নামবাসীকে মুক্তি দেয়ার বা সাহায্য করার কেউ থাকবে না পার্থিব জীবনে নবী-রাসূল আউলিয়াদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কারণে সেদিন তাদেরকে সাহায্য করতে কেউ আসবে না

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

- প্রকৃত সম্মান অপমানের বিষয়টি কিয়ামতের দিন প্রকাশ পাবে পার্থিব জীবনের বহু সম্মানিত মানুষ কিয়ামতের দিন অপদস্থ হবে এবং দুনিয়ার জীবনে দৃশ্যত অপমানিত অবস্থায় থাকা বহু মানুষ কিয়ামতের দিন গর্বিত অবস্থায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে

- মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হচ্ছে তার সময় এই সময়কে যারা সঠিকভাবে ব্যবহার করে কিয়ামতের জন্য পুঁজি সংগ্রহ করবে না তারাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ

সূরা শুরার ৪৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

اسْتَجِیبُوا لِرَبِّکُمْ مِنْ قَبْلِ أَنْ یَأْتِیَ یَوْمٌ لا مَرَدَّ لَهُ مِنَ اللَّهِ مَا لَکُمْ مِنْ مَلْجَإٍ یَوْمَئِذٍ وَمَا لَکُمْ مِنْ نَکِیرٍ ﴿٤٧﴾

তোমরা তোমাদের রবের ডাকে সাড়া দাও আল্লাহর পক্ষ থেকে সে দিন আসার আগে, যা অপ্রতিরোধ্য; সেদিন তোমাদের কোন আশ্রয়স্থল থাকবে না এবং তোমাদের অস্বীকার করার কোনো শক্তি থাকবে না। (৪২:৪৭)

নবী-রাসূলরা সব যুগে সব সময় মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানাতেন, তাদের নিজেদের দিকে নয় সেই আহ্বানের সূত্র ধরে এই আয়াতে কাফির, জালিম গোনাহগার বান্দাদের উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: এই পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার এবং কিয়ামতের দিন আবার পৃথিবীতে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা করার আগেই তোমরা গোনাহের কাজ ছেড়ে দাও যে ভ্রান্ত পথ তোমরা অনুসরণ করছো তা ত্যাগ করে আল্লাহর পথ ধরো কারণ, কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে সেদিন আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কোনোকিছুই ঘটবে না সেদিন তোমরা তোমাদের কৃতকর্ম অস্বীকার করতে পারবে না এবং তোমাদেরকে সেদিন আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর ক্ষমতা রাখবে না।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

- যে বিষয়টি আমাদেরকে পরকালীন জীবনের মহা ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে এবং পার্থিব পরকালীন জীবনে আমাদের সুখ, সমৃদ্ধি মুক্তির মাধ্যম হবে তা হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালার আদেশ নিষেধের বাধ্যগত থাকা  

- পার্থিব জীবনের সময়, সম্পদ স্বাস্থ্য হারিয়ে ফেলার আগেই দুনিয়ার জীবন শেষে আরেক জগতে প্রবেশের কথা ভাবতে হবে যেখান থেকে ফিরে আসার কোনো পথ নেই#

পার্সটুডে/এমএমআই/আবুসাঈদ/০৭

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।