নভেম্বর ০৮, ২০২১ ১৯:৩০ Asia/Dhaka

ইরানের কালজয়ী গল্পের পসরা "গল্প ও প্রবাদের গল্প"।

দুটি কবুতরের একটি জুটি পরম আনন্দে বাস করতো একটি খামারে। ঋতুও ছিল বসন্তকাল। সুখে শান্তিতেই ছিল তারা। একদিন বৃষ্টি হচ্ছিলো। পুরুষ কবুতরটি তখন তার স্ত্রীকে বললো: আমাদের বাসাটা তো ভিজে গেল। এখানে তো আর বাস করার মতো অবস্থা নেই। কবুতরটি জবাব দিলো: দেখো! আর তো মাত্র কটা দিন। তারপরই তো গ্রীষ্মকাল আসবে। তখন গরম পড়বে। তাই বলছিলাম কী..এখুনি না গেলে হয় না! ভেবে দেখো! তুমি কতো কষ্ট করে এই বাসাটা বানিয়েছো! খাবার জমিয়ে রাখার জন্যে গুদামের মতো ছোট্টো আরেকটি ঘরও বানিয়েছো। এখুনি যদি এখান থেকে চলে যাও এরকম আরেকটি বাসা কি বানাতে পারবে? এত্তোবড়ো বাসা এবং এতো তাড়াতাড়ি?

পুরুষ কবুতরটি তার স্ত্রীর কথায় একটু চিন্তা করলো। কিছুক্ষণ চিন্তাভাবনা করে বললো: 'তুমি মন্দ বলো নি! ঠিক আছে। তাহলে নাইবা গেলাম'। এই সিদ্ধান্তের পর কবুতর জুটি তাদের সেই আগের বাসাতেই থেকে গেল গ্রীষ্মকাল আসা পর্যন্ত। গ্রীষ্মকাল যখন এলো সূর্যতাপে তাদের বাসাটা একেবারে শুকিয়ে গেল। ফলে তারা আবারো আগের মতো সুখে শান্তিতে এই খামারের বাসাতেই বাস করতে লাগলো। কবুতর জুটি ছিল বেশ দূরদর্শী। ক্ষেত খামারে তো আর ফসলের অভাব ছিল না। তারা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার খেত। সেইসাথে ভবিষ্যতের চিন্তা করে কিছু খাবার জমিয়ে রাখতো। 

তো খাবার জমাতে জমাতে একদিন তারা দেখলো জমানোর জায়গাটা পূর্ণ হয়ে গেছে। সেখানে আর খাবার রাখার মতো অবস্থা নেই। গুদামভর্তি খাবার দেখে কবুতর দম্পতি খুশি হয়ে গেল। একজন আরেকজনের দিকে দিকে তাকিয়ে বললো: এখন তো গুদাম ভর্তি খাবারের মজুদ আছে। সুতরাং আসছে শীতেও না খেয়ে মরতে হবে না, বেঁচে থাকতে পারবো।

এই বলে তারা গুদামের দরোজা বন্ধ করে দিলো। গ্রীষ্মকাল যতোদিন ছিল ওই গুদামের দরোজা আর খুললো না। প্রয়োজনই পড়ে নি খোলার। পুরুষ কবুতরটা দূর দূরান্তে উড়ে উড়ে গিয়ে খাবার খেত এবং স্ত্রীর জন্যও নিয়ে আসতো। এভাবে দিন যেতে যেতে গ্রীষ্মকালও শেষের দিকে এসে গেল।

শরত ঋতুতে বৃষ্টিপাতের সূত্রপাত হয়। ওই বৃষ্টি ভেদ করে কবুতর দম্পতি আর খাদ্যশস্য কুড়োতে খামারে গেল না। যাবেই বা কেন, তাদের তো খাবারের মজুদ আছেই। বৃষ্টি উপেক্ষা করে খাবারের সন্ধানে না গিয়ে বাসায় থাকতে থাকতে যখন খিদে লাগলো পুরুষ কবুতরটি তখন গেল জমানো শস্য ভাণ্ডারের দরোজা খুলতে। দরোজা খুলে তো কবুতর হতবাক হয়ে গেল। পুরো একটা গুদাম ভর্তি শস্যদানা রাখা হয়েছিল এখন দেখা যাচ্ছে অর্ধেক নেই। কোথায় গেল! পুরুষ কবুতরটি রেগে গেল। বিরক্ত হলো তার স্ত্রীর ওপর। তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করলো: আজব এক খাই খাই স্বভাব তোমার। ভবিষ্যতের কোনো চিন্তা নেই। আমরা এই শস্যদানাগুলো তো শীতকালের জন্যে জমিয়েছিলাম। অথচ তুমি কিনা....

আমি কিনা কী...? জিজ্ঞেস করলো স্ত্রী কবুতর।

কবুতর বললো: কী আর। মাত্র কটা দিন আমি বাসায় ছিলাম না। তোমার জন্য খাবার আনতে দূর দূরান্তে গিয়েছি। আর তুমি এই কটা দিনে গুদামের অর্ধেক খাবার খেয়ে শেষ করে দিলে?

স্ত্রী কবুতর ভীষণ বিরক্ত হয়ে বললো: “আমি গুদামের খাবার খাই নি এবং জানি না গুদামের অর্ধেক খাদ্যশস্য কোথায় গেল..”।

এই বলে সে নিজেও গুদামের দিকে গেল এবং অর্ধেক গুদাম খালি দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। বললো: শোনো! বিরক্ত হয়ে লাভ নেই। আমাকেও খামোখা অভিযুক্ত করার কোনো মানে হয় না। তারচে বরং ধৈর্য ধরো। অপেক্ষা করো। এমনও তো হতে পারে গুদামের মেঝেটা মাটির ভেতর দেবে গেছে। কিংবা ইঁদুরেরা গুদামের খোঁজ পেয়ে ধীরে ধীরে খেয়ে এই অবস্থা করেছে। এমনও তো হতে পারে অন্য কেউ আমাদের গুদামের অর্ধেক শস্য চুরি করে নিয়ে গেছে। তাই হুট করেই আমার ওপর দোষ চাপিয়ে দিয়ো না। শান্ত হও! ধৈর্য ধরো! দেখবে সত্য ঘটনাটা বেরিয়ে আসবে।

পুরুষ কবুতর বললো: এবার একটু থামো! আমাকে আর উপদেশ দিতে এসো না। এখানে তো তুমি ছাড়া আর কেউ আসে নি। কেউ যদি এসেও থাকে তাহলে তুমি ভালো করেই জানো কে এসেছিলো। তুমি যদি না ই খেয়ে থাকো তাহলে তোমার উচিত সত্য করে বলা। যদি চাও এখন না বলে পরে বলবে, তাও পারো।

নারী কবুতরটি আসলেই জানতো না কেন গুদামের খাদ্যশস্য এভাবে কমে গেল। নিরুপায় হয়ে তাই কাঁদতে শুরু করলো। কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো: আমি গুদামের খাবারে হাত দেই নি, কী হয়েছে কিছুই জানি না আমি।

স্বামী কবুতরকে বললো: তুমি অপেক্ষা করো। অন্তত কেন খাদ্যশস্য কমে গেল সেটা প্রমাণ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করো। কিন্তু নর কবুতরটি কিছুতেই তার স্ত্রীর কথা মানলো না। উল্টো বরং আরো রেগে গিয়ে স্ত্রী কবুতরটিকে বাসা থেকে বের করে দিলো।     

নারী কবুতরটি বললো: রাগের মাথায় এতো দ্রুত আমাকে দোষারোপ করাটা তোমার উচিত হয় নি। উচিত হয় নি আমাকে না জেনে অভিযুক্ত করা। তুমি যা করেছো তার জন্য তোমাকে দ্রুতই পস্তাতে হবে দেখো! তখন হয়তো অনেক দেরিও হয়ে যেতে পারে। এই বলে সে খামারের উদ্দেশ্যে উড়াল দিলো এবং সেখানে এক শিকারির ফাঁদে আটকা পড়ে গেল।

পুরুষ কবুতরটি একা একা তার বাসায় বাস করতে লাগলো। মনে মনে সে খুশি এজন্যে যে তার স্ত্রী তাকে ধোঁকা দিতে পারে নি। কিছুদিন পরই আবহাওয়া আবারো পরিবর্তিত হয়ে গেল। বৃষ্টিপাত শুরু হলো। আর্দ্রতা বাড়লো। গুদামের শস্যগুলো ওই আবহাওয়ায় ফুলে উঠতে শুরু করলো এবং খাদ্য গুদাম আবারো সেই প্রাথমিক অবস্থায় ফিরে গেল। পূর্ণ হয়ে গেল গুদাম। কবুতরটি গুদামের এই অবস্থা দেখে বুঝলো তার স্ত্রীর ব্যাপারে যে সিদ্ধান্তটা সে নিয়েছে সেটা একেবারেই ঠিক ছিল না। ভীষণ অনুতপ্ত হলো সে। কিন্তু এখন আর তওবা করে কী হবে। স্ত্রীকে হারিয়ে এবং তার কৃতকর্মের জন্যে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সে অনুতাপ করে গেল।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ০৮

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।