'প্রকৃত সুন্নিরা ইয়াজিদের সমর্থক নয়, আসল ইতিহাস জানতে হবে'
-
বক্তব্য রাখছেন সেমিনারের সভাপতি পীর সাহেব জনাব আহসানুল হাদি ও প্রধান অতিথি হুজ্জাতুল ইসলাম ইউনুস আলী গাজী (নীচে)
‘প্রকৃত শিয়া ও সুন্নির মধ্যে বিরোধ নেই। প্রকৃত সুন্নিরা কখনো ইয়াজিদের সমর্থক নয়। কারবালার ব্যাপারে শিয়া-সুন্নি একমত। শিয়া-সুন্নির ঐক্যের চর্চা বাড়াতে হবে... যারা ইয়াজিদকে নির্দোষ বলতে চান তারা ঐতিহাসিক সত্যকে ঘুরিয়ে ফেলতে চান।’ —এ কথাগুলো উচ্চারিত হয়েছে ‘শোহাদায়ে কারবালা ও আহলে বাইত-এর মর্যাদা’ শীর্ষক ঢাকার এক সেমিনারে।
কারবালার মহাবিপ্লব সাড়ে তেরো’শ বছর পর আজও কেবল মু’মিন মুসলমানের অন্তরের অন্তঃস্থলে আদর্শিক দিক-নির্দেশনা এবং আলোচনার অন্যতম প্রধান প্রেরণাই নয়। একইসঙ্গে তা ইসলামী ঐক্যেরও যে সোপান- বিষয়টি স্পষ্ট করছে এ জাতীয় সেমিনার।
শুক্রবার ঢাকার মিরপুর লালকুঠি দরবার শরিফ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় ওই মহতী সেমিনার। আহলে বাইত সঙ্ঘ ও শিয়া সুন্নি ঐক্য পরিষদ-এর যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সেমিনারটির সভাপতিত্ব করেন লালকুঠি দরবার শরিফের পীর ও ঢাকা ভার্সিটির ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আহসানুল হাদি।
এতে প্রধান অতিথি ছিলেন ইরানিয়ান আল মোস্তফা ইউনিভার্সিটির শিক্ষক হুজ্জাতুল ইসলাম ইউনুস আলী গাজী। আলোচনায় অংশ নেন ড. জহির উদ্দিন মাহমুদ, অধ্যাপক এম এ হামিদ, অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম। মূল প্রবন্ধ পেশ করেন কবি আমিন আল আসাদ।
সভাপতির ভাষণে লালকুঠি দরবার শরিফের পীর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জনাব আহসানুল হাদি বলেন, ‘প্রকৃত শিয়া ও প্রকৃত সুন্নিদের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। প্রকৃত সুন্নিরা কখনো ইয়াজিদের সমর্থন করতে পারে না এবং করেনি। শোহাদায়ে কারবালার কথা মানুষ কখনো ভুলবে না। এই ইতিহাস চর্চা অব্যাহত থাকবে। কেউ তা বন্ধ করতে পারবেনা। শিয়া ও সুন্নির ঐক্যের মৌলিক বিষয়গুলোর চর্চা বাড়াতে হবে। শিয়াকে বদলে দিয়ে সুন্নি বানানো যাবে না, আবার সুন্নিকে বদলে শিয়া বানানো যাবে না, কিন্তু ঐক্যের মুল বিষয়গুলো চর্চা তাদের মধ্যে দূরত্ব কমবে ও মহব্বত বাড়বে।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে হুজ্জাতুল ইসলাম ইউনুস আলী গাজী বলেন, ‘মুসলমানদের মধ্যে যখন ঐক্য ও স্থিতিশীল অবস্থা থাকে তখন মুসলমানেরা শিল্প, বিজ্ঞান, কলা, সাহিত্য, গবেষণা ইত্যাদিতে চরম উন্নতি সাধন করে। তখন মুসলমানদের মধ্যে গড়ে ওঠে ইবনে সিনা, আল বিরুনি, আল গাজ্জালি, আল ফারাবি প্রমুখ। আর যখন পরস্পর ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হয় তখন তাদের মন মগজ ব্যস্ত থাকে বিবাদে। তখন কোন মহান কাজ তাদের দিয়ে হয় না। রাসুলের সুন্নতকে শিয়া-সুন্নি সবাই আঁকড়ে ধরেছে, আর রাসুলের আহালে বাইতকে শিয়া সুন্নি সবাই ভালবাসে, তাহলে কিসের বিভেদ? সাম্রাজ্যবাদীরা 'ডিভাইড এন্ড রুল' তথা 'ভাগ কর ও শাসন কর' নীতিতে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করছে।’
ইউনুস আলী গাজী আরও বলেছেন, ‘আমরা মুসলমান। আমাদের আল্লাহ্ এক, রাসুল এক, কিবলা এক, কলেমা এক। শিয়া-সুন্নির মধ্যে বিয়ে শাদি সামাজিক সম্পর্ক আছে। কারবালার ঘটনার ব্যাপারে শিয়া সুন্নি সবাই একমত। এখানে নবী-পরিবারের উপর জুলুম করা হয়েছে। ইমাম হুসাইন শাহাদাত বরণ করে এমন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন যা কিয়ামত পর্যন্ত সব মানুষ স্মরণ রাখবে। ইমাম হুসাইন আহালে বাইতের সদস্য। আহালে বাইতকে মহব্বত করা ঈমানের অঙ্গ। ইয়াজিদকে মহব্বত করা নয়। ইয়াজিদ- ইমাম হুসাইন (আ), আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর ও আবদুল্লাহ ইবনে জোবাইর- এ তিনজন থেকে বাইয়াত আদায়ে চাপ প্রয়োগ করতে আদেশ দিয়েছিলো। বাইয়াত না হলে হত্যার আদেশ দিয়েছিলো।’
ওই সেমিনারে ড. জহিরউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন,‘আজকাল আমাদের দেশে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়, পত্র-পত্রিকায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে, ওয়াজের মঞ্চে, মিম্বরে আশুরা ও কারবালার ব্যাপারে একটা ধূম্রজাল তৈরি করা হচ্ছে। কারবালার আত্মদান ও ইমাম হুসাইন (আ)-এর আন্দোলনকে খাটো করে এবং একে গৌণ করার জন্যে ইনিয়ে-বিনিয়ে নানা ঘটনার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে- এটাই একমাত্র ঘটনা নয় আরও অনেক ঘটনা ঘটেছে। কিংবা বলা হয় এ ঘটনা হটাৎ করেই এদিনে ঘটে গেছে। বলা হয় ইয়াজিদ নির্দোষ। সে এই ঘটনার জন্যে অনুতপ্ত। বলা হয় ইমাম হাসান ও হুসাইন (আ) প্রাণ দিয়ে উম্মতের গোনাহ মাফ কোরে গেছেন- যেভাবে খ্রিস্টানরা বলে, যিশু ক্রুশে জীবন দিয়ে তাদের পাপ মোচন করে গেছেন! এভাবে কারবালা সম্পর্কে আবোল তাবোল কথা বলে ইমাম হুসাইনের আন্দোলনের প্রকৃত ঘটনাকে ধামা চাপা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।’
ড. মাহমুদ আরও বলেছেন, ‘ইমাম হুসাইন তাঁর নিজের ভাষ্যেই তাঁর আন্দোলনের মূল কথা ব্যক্ত করেছেন। ইমাম বলেছেন, আমি যুদ্ধ করতে আসিনি। আমি রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে আসিনি। আমি সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে এসেছি। আমার নানার সুন্নতকে বদলে ফেলা হচ্ছে। আমি একে পুনঃস্থাপন করতে এসেছি। আজকে যারা ইয়াজিদকে নির্দোষ বলতে চান তারা ঐতিহাসিক সত্যকে ঘুরিয়ে ফেলতে চান। ইয়াজিদ ক্ষমতায় এসেই ইমাম হুসাইনের উপর চাপ প্রয়োগ করে জোরপূর্বক বাইয়াত আদায়ের চেষ্টা করে। বাইয়াত না করলে তাঁকে হত্যা করতে হবে বলে আদেশ দেয়। সেই সাথে সে আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর এবং আবদুল্লাহ ইবনে জোবাইরকে চাপ দেয়। ইমাম হুসাইন (আ)-এর শাহাদাতের পর সে বিজয়-উল্লাস করে। আজকে যারা বলে ইয়াজিদ কিছুই জানতো না, যত দোষ সব ইবনে জিয়াদের আর শিমারের। তাহলে সে ইবনে জিয়াদ ও শিমারকে মৃত্যুদণ্ড দেয়নি কেনো? তাই আমাদেরকে হাজারো কথা-বার্তার ভিড় থেকে কারবালার আসল ইতিহাস জানতে হবে।’
সেমিনারে জুরানপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যাপক শেখ মুহাম্মদ আবদুল হামিদ বলেন, ‘আহলে বাইতের মহব্বত ঈমানের অঙ্গ। এই মহব্বতই শিয়া-সুন্নি ঐক্যের মূল রশি। আমরা এক আল্লাহ্র বান্দা এক রাসুলের উম্মাত, এক কুরআনের অনুসারী, এক কালেমার শরীক মুসলমান। আমাদেরকে ঐক্যের সূত্র আঁকড়ে ধরে থাকতে হবে। ইমাম হুসাইন কালজয়ী মহাপুরুষ। রাসুল বলেছেন হুসাইন আমা হতে আমি হুসাইন হতে। তেমনিভাবে হুসাইনের পিতা হজরত আলী সম্পর্কেও বলেছিলেন, ‘আমি জ্ঞানের নগরী আলি তাঁর প্রবেশ-দ্বার’ তিনি বলেন, ইয়াজিদের দলের ভেতরও হুসাইনভক্ত লোক ছিল, কিন্তু তারা ইমানের দুর্বলতা হেতু গর্দান যাওয়ার ভয়ে হুসাইনের পক্ষে আসতে পারেনি। একজন এসেছিলেন তাঁর নাম হোর। ইয়াজিদকে নির্দোষ ভাবার প্রশ্নই আসে না। কোনও প্রকৃত সুন্নি ইয়াজিদকে সমর্থন করতে পারে না।’
অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম বাবর বলেন, ‘ছোটবেলায় দেখেছি কারবালার ঘটনা নিয়ে অনেক আলোচনা হোতো, এখন হয় না। আমাদের দাদা-নানারা পুঁথি পরতেন। কারবালা সংক্রান্ত একটি পুঁথি ছিল জঙ্গনামা। এসব পুঁথি-পাঠে ও শ্রবণে অশ্রু ঝরত মানুষের।’ তিনি বলেন আমাদেরকে আহালে বাইতের মহব্বতের সাথে সাথে তাঁদের আদর্শ ও আমলকে আঁকড়ে ধরে থাকতে হবে।’
অনুষ্ঠান শুরু হয় ক্বারী আলমগীর হোসেন মোল্লার কণ্ঠে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্য দিয়ে। স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন কবি আতিক হেলাল। নাত পরিবেশন করেন তরুণ কণ্ঠশিল্পী মোঃ আশরাফুজ্জামান। মর্সিয়া পেশ করেন কবি নুরুল মনির ও মুক্তিযোদ্ধা কবি রফিক মিয়া।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কবি ইবনে আব্দুর রহমান, কবি কারি ওবায়দুল্লাহ, প্রকাশক সাইদ আহম্মদ আনিস, কবি শেখ জাহেদ প্রমুখ।#
পার্সটুডে/মু.আ. হুসাইন/আশরাফুর রহমান/৬