ব্যাংকিং খাত থেকে বাংলাদেশ সরকারের ঋণ নেয়ার হার বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশে অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের চেয়ে সরকারি খাতেই ঋণপ্রবাহ বেশি মাত্রায় বেড়ে যাচ্ছে। এতে বেসরকারি খাতের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখতে পাচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে বলা হয়েছে, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে সরকারের ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। কিন্তু জুলাই-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩ মাসেই এ খাত থেকে ২৮ হাজার ৭১০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। অর্থাৎ, ফলে পুরো অর্থবছরের জন্য ব্যাংকিং খাত থেকে যে পরিমাণ ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে তার ৬১ শতাংশই অর্থবছরের প্রথম ৩ মাসে নিয়ে ফেলেছে সরকার।
গত জুলাই থেকে সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপের ফলে বিক্রি ব্যাপক হারে কমে যাওয়া এবং লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সন্তোষজনক রাজস্ব আদায় না হওয়াসহ নানা কারণে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার হার বেড়েই চলেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, আর্থিক খাতে অভ্যন্তরীণ ঋণপ্রবাহে উল্টো গতি বিরাজ করছে। অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেশি হারে বাড়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। বরং গত বছরের তুলনায় কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে দেশে অভ্যন্তরীণ ঋণপ্রবাহ বেড়েছে ২.০৩ শতাংশ। গত অর্থবছরে একই সময়ে বেড়েছিল ০.৯৫ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে ঋণপ্রবাহ বাড়লেও এর বড় অংশই যাচ্ছে সরকারি খাতে।
ব্যাংকিংখাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সরকার ব্যাংকিংখাত থেকে ঋণ নিয়েছে ৩০ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছরে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের এর পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সরকার ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করেছে ১৮ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা।
এ প্রসঙ্গে অর্থনীতির ছাত্র বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক রেডিও তেহরানকে বলেছেন, জনগণের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আমানত নিয়ে ব্যাঙ্কের পুঁজি তৈরি হয়। সেটা যদি সরকারের ক্রমবর্ধমান খরচা মেটাতে ব্যয় হয় তবে বিনিয়োগের জন্য বেসরকারি খাতে ঋণ কমে যাবে এবং কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে। আর্থিক খাতে সার্বিক সংস্কার ছাড়া ব্যাঙ্কিং খাতে সুশাসন আসবে না এবং নানা কুপ্রভাব দেখা দেবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ব্যাংকিং খাতে যে উদ্বৃত্ত তারল্য দেখানো হচ্ছে, তার সঙ্গে বাস্তবতার কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। তিনি বলেন, কিছু কিছু ব্যাংকের বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কাছে বাড়তি তহবিল রয়েছে। কিন্তু ওই সব ব্যাংক ইচ্ছা করলেই অতিরিক্ত ঋণ দিতে পারে না।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, সামগ্রিকভাবেই খারাপ অবস্থানে রয়েছে ব্যাংকিং খাত। তিনি আশঙ্কা করছেন, ব্যাংকিং খাতের সমস্যার কারণে পুরো অর্থনীতিতে সমস্যা দেখা দেবে। ফলে, যে প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে, তা কাগজে-কলমে অর্জন হবে, বাস্তবে অর্জন হবে না।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)- এর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুলাই-আগস্ট মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩৮ হাজার ৯৩৮ কোটি ৩৭ লাখ টাকার বিপরীতে আদায় হয়েছে ২৯ হাজার ৬২০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ এই দুই মাসে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।
সঞ্চয়পত্র বিক্রি কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে অত্যাধিক কড়াকড়ি আরোপ এবং কর বৃদ্ধির কারণে সঞ্চয়পত্র থেকে গ্রাহকরা অনেকটা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এ জন্য সঞ্চয়পত্র বিক্রিও কমে গেছে।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা গেছে, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে ১১ হাজার ৩০৫ কোটি ৪০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৭ হাজার ৬৪৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এ হিসাবে এই ২ মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রির নিট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই সময়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রির নিট পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৫৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা।#
পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/২৭
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।