কোভিড ১৯ : বাংলাদেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জেলা নারায়ণগঞ্জ, প্রশাসনের ব্যাখ্যা
কোভিড-১৯ সংক্রমণে অধিকসংখ্যক মৃত্যু, অধিক সংখ্যায় আক্রান্ত হওয়া এবং দেশের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ার হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পার্শবর্তী জেলা নারায়ণগঞ্জ এখন দেশের করোনাভাইরাস সংক্রমনের সবচেয়ে বেশী ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ক্লাস্টারে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে দ্রুতগতিতে।
নারায়ণগঞ্জে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। গত কয়েক দিনে অন্তত ছয়টি জেলায় সংক্রমিত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন, যাঁরা সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ থেকে গিয়েছেন।
গতকাল করোনাভাইরাসের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপনের সময় আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা বলেছেন, ‘নারায়ণগঞ্জ আমাদের জন্য একটি এপিসেন্টার (সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার কেন্দ্র)।’ এর আগে ৭ এপ্রিল এই জেলাকে ‘হটস্পট’ (অতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা) ঘোষণা করা হয়েছিল।
শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য প্রসিদ্ধ নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন জেলার মানুষের বসবাস। নারায়ণগঞ্জ থেকে সংক্রমণ ছড়ানো ঠেকাতে গত বুধবার পুরো জেলা লকডাউন (অবরুদ্ধ) ঘোষণা করা হয়। এই লকডাউনের মধ্যেই শত শত শ্রমিক শ্রেণির মানুষ নারায়ণগঞ্জ থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় নিজ নিজ গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের অনেকেই বিভিন্ন জেলায় করোনায় আক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ফেরত অনেককেই কেয়ারেনটাইনে রাখা হয়েছে।
গতকাল পর্যন্ত রাজধানী ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেলায়। দেশের মোট আক্রান্ত রোগীর ১৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ এখানকার বাসিন্দা। ৭ এপ্রিল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল ১১। ৭ এপ্রিল তা দাঁড়ায় ৩৮ জনে। ৮ এপ্রিল এসে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৬। ৯ এপ্রিল ছিল ৫৯ জন। গতকাল তা গিয়ে দাড়ায় ৭৫ জনে।
সর্বশেষ আজকের হিসেব অনুযায়ী- নতুন আটজনসহ নারায়ণগঞ্জে আক্রান্তের মোট সংখ্যা দাড়িয়েছে ৮৩ জন। গতকাল পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে দেশে মারা যাওয়া ২৭ জনের মধ্যে ৯ জন নারায়ণগঞ্জের। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের ৩৮ শতাংশ নারায়ণগঞ্জের।
দেশে গত ৮ মার্চ প্রথম সংক্রমণ শনাক্তের ঘোষণা দেয় সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। ওই দিন দুই বিদেশফেরতসহ তিনজন শনাক্তের কথা জানানো হয়েছিল। তাঁদের দুজন ছিলেন নারায়ণগঞ্জের। এরপর থেকে সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে, যা এখনো অব্যাহত আছে।
নারায়ণগঞ্জ থেকে বিভিন্ন জেলায় ছড়াচ্ছে করোনা
নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে সড়ক ও নৌপথে বিভিন্ন জেলার সঙ্গে যোগাযোগ আছে। গত বুধবার পুরো নারায়ণগঞ্জ জেলা লকডাউন করা হয়। কিন্তু এরপরও পণ্যবাহী ট্রাক, ট্রলার, বাস, অ্যাম্বুলেন্স ও মাইক্রোবাসে চড়ে শত শত মানুষ বিভিন্ন জেলায় নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে ফিরে যায়।
গত বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জ থেকে নৌপথে পিরোজপুরের নেছারাবাদে যান ১৮ জন। গ্রামবাসী তাঁদের ঢুকতে বাধা দেয়। পরে পুলিশ তাদের একটি বিদ্যালয়ে কোয়ারেন্টিনে রাখার প্রস্তুতি নিলে গ্রামবাসী হামলা চালায়।
গত চার–পাঁচ দিনে নারায়ণগঞ্জ থেকে লকডাউন ফাঁকি দিয়ে নৌপথে কয়েক শ’ ব্যক্তি চাঁদপুর চলে যায়। তাদের মধ্যে ৫৯৪ জনকে চিহ্নিত করে কোয়ারেন্টিনে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চাঁদপুর জেলা লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া গত দুই দিনে নারায়ণগঞ্জ থেকে গোপালগঞ্জ, বরিশাল ও মৌলভীবাজারেও অনেকে এভভাবে চল যাবার খবর গেছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, টাঙ্গাইলে শনাক্ত হওয়া প্রথম ব্যক্তি নারায়ণগঞ্জের একটি ক্লিনিকে চাকরি করতেন। নরসিংদীতে শনাক্ত দুজন নারায়ণগঞ্জে চাকরি করতেন। গত বুধবার চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে এক ব্যক্তির সংক্রমণ ধরা পড়ে। ওই ব্যক্তি নারায়ণগঞ্জে একটি ব্যাংকের নিরাপত্তাকর্মী ছিলেন। অসুস্থ হয়ে ৬ এপ্রিল তিনি সীতাকুণ্ডে চলে যান। এর পরদিন নীলফামারীর সৈয়দপুরে এক ব্যক্তির মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়ে। তিনি নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ার একটি রেস্তোরাঁর কর্মী ছিলেন। তিনি ৬ এপ্রিল সৈয়দপুরে গিয়েছিলেন।
গতকাল চাঁদপুরের মতলবে এক যুবকের মধ্যে সংক্রমণ পাওয়া গেছে, যিনি নারায়ণগঞ্জে একটি পোশাক কারখানার কর্মী।
গত বৃহস্পতিবার পটুয়াখালীর দুমকিতে করোনায় আক্রান্ত এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। তিনিও নারায়ণগঞ্জের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। তিনি গত রোববার পটুয়াখালীতে যান।
গত বুধবার রাতে দুটি নৌকায় করে নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জ থেকে গাইবান্ধায় যান ৯২ জন শ্রমিক। খবর পেয়ে স্থানীয় প্রশাসন তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে রাখে।
প্রশাসনের ব্যাখ্যা
লকডাউনের মধ্যে লোকজনের কীভাবে এতগুলো জেলায় ছড়িয়ে পড়ল, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ ইমতিয়াজ গণমাধ্যমকে বলেছেন, লকডাউন নিয়ে তাঁরা সন্তুষ্ট নন। যেকোনো মূল্যে লকডাউন শতভাগ নিশ্চিত করা দরকার।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) জায়েদুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, লকডাউনের আগে ও পরে কিছু লোক ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে। এখন আরও কড়াকড়ি করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, নারায়ণগঞ্জ বড় ব্যবসাকেন্দ্র, এখানে জরুরি বলে চিহ্নিত জ্বালানি তেলের দুটি ডিপো রয়েছে। এ কারণে লকডাউন শতভাগ কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া পোশাক কারখানার ১০ লাখের বেশি শ্রমিক বাড়ি যেতে পারেননি। তাঁরা নানা অজুহাতে বাইরে বেরিয়ে আসছেন। এ কারণে পাড়া–মহল্লায় পুরোপুরি লকডাউন হচ্ছে না।
সর্বশেষ অবস্থা
আজ (শনিবার) দুপুর আড়াইটায় মহাখালীর ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এমআইএস) বিভাগের মিলনায়তনে করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত অনলাইন স্বাস্থ্য বুলেটিনে এ তথ্য জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি জানান, দেশে রাজধানীর মিরপুর, বাসাবো ও নারায়ণগঞ্জ জেলায় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বেশি।
ব্রিফিংয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, কিছু কিছু এলাকায় লোকজনের উপস্থিতি বেশি। এছাড়া সকাল বেলা বাজারঘাটে অনেক মানুষ উপস্থিত হচ্ছেন। এতে সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে করোনা সংক্রমণে ঢাকার পরেই নারায়ণগঞ্জের অবস্থান। আর নারায়ণগঞ্জ থেকে লোকজন দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে যাওয়াকে তিনি উদ্বেগজনক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।#
পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/১১