জামায়াত নেতা মাওলানা নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
https://parstoday.ir/bn/news/bangladesh-i8968-জামায়াত_নেতা_মাওলানা_নিজামীর_মৃত্যুদণ্ড_কার্যকর
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টা ১০ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
(last modified 2026-03-14T11:23:49+00:00 )
মে ১০, ২০১৬ ১৯:৫১ Asia/Dhaka
  • জামায়াত নেতা মাওলানা নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টা ১০ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

ফাঁসি কার্যকরের সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত আইজি প্রিজন ইকবাল হাসান, জেলা প্রশাসক মো. সালাহ উদ্দিন, সিভিল সার্জন আবদুল মালেক মৃধা, পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মফিজ উদ্দিন আহমেদ, সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির, জেলার নেছার আলম ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। এছাড়া মঞ্চের পাশে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) একজন প্রতিনিধি ও র‌্যাবের একজন প্রতিনিধি। ছিলেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার ও দুজন ডেপুটি জেলার।  

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার সূত্র জানায়, মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে জামায়াত নেতা নিজামীকে গোসল করানো হয়। পরে কেন্দ্রীয় কারা মসজিদের ইমাম হাফেজ মনির হোসেন মতিউর রহমান নিজামীকে তওবা পড়ান। এর আগে নিজামীর পরিবারের ২৬ জন সদস্য তার সঙ্গে কেন্দ্রীয় কারাগারে শেষবারের মতো সাক্ষাৎ করেন। এসময় নিজামী তাদেরকে ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়েছেন। স্বজনদের জন্য তিনি দোয়া করেন এবং তাঁর জন্যও দোয়া করতে বলেন। 

সাঁথিয়ার পবে নিজামীর মরদেহ

ফাঁসি কার্যকরের এক ঘণ্টা ২০ মিনিট পর রাত দেড়টায় কারা ফটক থেকে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সসহ দু’টি অ্যাম্বুলেন্স ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ছয়টি গাড়ি নিজামীর গ্রামের বাড়ি পাবনার সাঁথিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়। সাঁথিয়া উপজেলার ধোপাদহ ইউনিয়নের মন্মথপুর গ্রামে পারিবারিক কবর স্থানে তাকে দাফন করা হবে। ফাঁসির রায় কার্যকরের পর সেখানে কবর খোঁড়ার কাজ শুরু করেন নিজামীর পরিবারের লোকজন।  

একটা কলঙ্কদাগ দূর হলো : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় মাথা থেকে একটি কলঙ্ক দাগ মুছে গেল বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল।

মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটের দিকে নিজ বাসায় সাংবাদিকদের সামনে এমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন মন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটা জাতির প্রত্যাশা ছিল দীর্ঘ দিনের। তারপর আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার প্রত্যাশা ছিল আরো দীর্ঘ দিনের। আমি মনে করি, আজকে আমাদের আমাদের মাথা থেকে একটা কালো দাগ মুছে গেল। এই দিনটির অপেক্ষায় আমরা ছিলাম। যে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা দেখে যেতে পারছি, যারা যুদ্ধাপরাধী যারা মানবতা বিরোধী কর্মকাণ্ড করেছিলেন তাদের বিরুদ্ধে রায়গুলো কার্যকর হচ্ছে।

গত ৫ মে আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে করা পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) আবেদন খারিজ করে নিজামীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের বেঞ্চ এ রায় দেন।

গত সোমবার দুপুরে সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে মাওলানা নিজামীর রিভিউ আবেদন খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। বিকেলে আপিল বিভাগের রেজিস্ট্রার অরুণাভ চক্রবর্তী ও ডেপুটি রেজিস্ট্রার মেহেদি হাসান রায়ের কপি নিয়ম অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালে নিয়ে যান। সেখান থেকে রাত ৭টার দিকে ট্রাইব্যুনালের ডেপুটি রেজিস্ট্রার কেশব রায়ের নেতৃত্বে পাঁচ কর্মকর্তা রায়ের লিখিত কপি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌঁছে দেন। লাল ফাইলে মোড়ানো রায়টি গ্রহণ করেন কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির। রাতেই মাওলানা নিজামীকে রায় পড়ে শোনানো হয়। আগের দিন রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে মাওলানা নিজামীকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয়।  

মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ 

১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর মাওলানা নিজামীকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

মুক্তিযুদ্ধকালে বুদ্ধিজীবী হত্যা, গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের নির্দেশদাতা, পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্র এবং ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়ে (সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি) মাওলানা নিজামীকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়েছে, নিজামী তৎকালীন ইসলামী ছাত্রসঙ্ঘ এবং আলবদর বাহিনীর প্রধান ছিলেন। আলবদর বাহিনী একটি অপরাধী সংগঠন এবং এ বাহিনী কর্তৃক বুদ্ধিজীবী হত্যায় নিজামীর নৈতিক সমর্থন ছিল। ইসলামী ছাত্রসঙ্ঘ এবং বদর বাহিনীর প্রধান হিসেবে এসব সংগঠনের সদস্যদের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ ছিল। কাজেই ঊর্ধ্বতন নেতা হিসেবে মানবতাবিরোধী এসব অপরাধের দায় তিনি এড়াতে পারেন না।

মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনীত ১৬টি অভিযোগের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল আটটি অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে। এর মধ্যে চারটি অভিযোগের প্রতিটিতে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য চারটি অভিযোগের প্রত্যেকটিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। 

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগ সংক্রান্ত মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে গ্রেফতার করা হয়। পরে একই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হয়। 

সংক্ষিপ্ত জীবনী

মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ১৯৪৩ সালের ৩১ মার্চ পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার মনমতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৯ সালে আলিম, ১৯৬১ সালে ফাজিল এবং ১৯৬৩ সালে কামিল পাস করেন তিনি। এরপর ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন।

 ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত তিনি তিনবার পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসঙ্ঘের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিখিল পাকিস্তান ইসলামী জমিয়তে তালাবার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

মাওলানা নিজামী ১৯৭১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত জামায়াতের ঢাকা মহানগর শাখার আমির ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালনের পর ১৯৮৮ সালে সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পান। ২০০০ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীর আমির নির্বাচিত হন। 

মাওলানা নিজামী পাবনা-১ (সাঁথিয়া-বেড়া) আসন থেকে ১৯৯১ ও ২০০১ সালে সংসদ সংসদ্য নির্বাচিত হন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের কৃষি এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। # 

আশরাফুর রহমান/১০