'ইসরায়েলের জন্য প্রতিরক্ষা-ক্ষেপণাস্ত্রের বেশিরভাগ দায়ভারই বহন করেছে যুক্তরাষ্ট্র'
ইসরায়েলে ইরানি হামলা ঠেকাতে মার্কিন 'থাড' ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের প্রায় অর্ধেক শেষ: রিপোর্ট
-
ইসরায়েলের জন্য প্রতিরক্ষা-ক্ষেপণাস্ত্রের বেশিরভাগ বোঝাই বহন করেছে যুক্তরাষ্ট্র
পার্সটুডে: ওয়াশিংটন পোস্ট বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার বেশিরভাগ দায়ভার যুক্তরাষ্ট্র বহন করেছে।
পেন্টাগনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে এবং কার্যত পুরো যুদ্ধ-জুড়ে ইসরায়েলের প্রধান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভূমিকা পালন করেছে।
বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত এই তথ্য ৪০ দিনের ইরানবিরোধী আগ্রাসনে জায়নিস্ট দখলদার শাসকচক্রের প্রতি আমেরিকার অন্ধ সমর্থনের আসল মূল্য প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনটি দেখিয়েছে যে, ইরানের শক্তিশালী ও সিদ্ধান্তমূলক পাল্টা হামলার মুখে দুর্বল ইসরায়েলকে টিকিয়ে রাখতে ওয়াশিংটন কত বড় বোঝা বহন করেছে, যা তথাকথিত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সামরিক অংশীদারিত্বের গভীর দুর্বলতাও উন্মোচন করেছে।
মার্কিন যুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন কেবল ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তু রক্ষার জন্য ২০০টিরও বেশি 'থাড' THAAD (Terminal High Altitude Area Defense) প্রতিরক্ষা-ক্ষেপণাস্ত্র বা ইন্টারসেপ্টর মোতায়েন করেছে, যা পেন্টাগনের বৈশ্বিক মজুদের প্রায় অর্ধেক।
পূর্ব ভূমধ্যসাগরে অবস্থানরত মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলোও ১০০টির বেশি স্ট্যান্ডার্ড মিসাইল-৩ (Standard Missile-3) এবং স্ট্যান্ডার্ড মিসাইল-৬ (Standard Missile-6) প্রতিরক্ষা-ক্ষেপণাস্ত্র বা ইন্টারসেপ্টর নিক্ষেপ করেছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েল ১০০টিরও কম 'অ্যারো' (Arrow) প্রতিরক্ষা-ক্ষেপণাস্ত্র বা ইন্টারসেপ্টর এবং প্রায় ৯০টি 'ড্যাভিড স্লিং' (David’s Sling) সিস্টেম ব্যবহার করেছে, যার অনেকগুলো ইরানের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্রের বদলে ইয়েমেন ও লেবানন থেকে আসা তুলনামূলক কম উন্নত প্রজেক্টাইল ঠেকাতে ব্যবহৃত হয়েছিল।
মার্কিন প্রশাসনের এক সিনিয়র কর্মকর্তা সংবাদপত্রটিকে জানান, “মোট হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের চেয়ে প্রায় ১২০টি বেশি ইন্টারসেপ্টর নিক্ষেপ করেছে এবং দ্বিগুণ সংখ্যক ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলা করেছে।”
একই কর্মকর্তা সতর্ক করেন যে আগামী দিনগুলোতে আবার সংঘাত শুরু হলে ওয়াশিংটনকে আরও বেশি সংখ্যক মূল্যবান ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করতে হবে, বিশেষত যখন ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তাদের নিজস্ব কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যাটারি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে।
তিনি বলেন, “যদি যুদ্ধ আবার শুরু হয়, এই ভারসাম্যহীনতা আরও বেড়ে যাবে।”
এই পরিসংখ্যান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের প্রকৃত বাস্তবতা সম্পর্কে বিরল অন্তর্দৃষ্টি দিয়েছে। সামরিক বিশ্লেষক কে.এ. গ্রিয়েকো বলেন,
“সংখ্যাগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র মূলত পুরো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা মিশনের বোঝা বহন করেছে, আর ইসরায়েল নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার সংরক্ষণ করেছে।”
গ্রিয়েকো আরও বলেন, তেল আবিবের জন্য কৌশলগতভাবে এটি যুক্তিযুক্ত হলেও, এখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আনুমানিক মাত্র ২০০টি থাড (THAAD) ইন্টারসেপ্টর অবশিষ্ট আছে এবং উৎপাদন লাইন চাহিদা পূরণে অক্ষম। এর প্রভাব ভবিষ্যতে ইরান-বহির্ভূত অন্যান্য সংঘাতেও পড়তে পারে।
এই নির্ভরশীলতা আবারও প্রমাণ করে যে ইহুদিবাদী ইসরায়েল বিশাল মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়া নিজেকে রক্ষা করা বা যুদ্ধ জেতার কাঠামোগত সক্ষমতা রাখে না—যা ইরানি কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন।
এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, “ইসরায়েল একা যুদ্ধ করে জিততে সক্ষম নয়, কিন্তু মানুষ তা জানে না, কারণ তারা কখনো পর্দার আড়ালের বাস্তবতা দেখে না।”
পেন্টাগন অবশ্য দায়ভার বণ্টন নিয়ে উদ্বেগকে হালকা করে দেখানোর চেষ্টা করেছে এবং দাবি করেছে যে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা “বিশাল প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের কেবল একটি অংশ।”
এদিকে আইআরজিসি গোয়েন্দা বিভাগ জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে “সহজ ও দ্রুত” অভিযান চালানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরান তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা প্রাথমিক ধারণার তুলনায় অনেক দ্রুত পুনর্গঠন করছে।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি দূতাবাস এক বিবৃতিতে দাবি করেছে যে ইসরায়েলের মতো সক্ষম “আর কোনো অংশীদার” যুক্তরাষ্ট্রের নেই। তবে ইসরায়েলের মার্কিন অর্থ ও অস্ত্রের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতা এই দাবিকে ক্রমশ দুর্বল করে তুলছে।
উত্তেজনা বজায় থাকায় এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রকে আবার যুদ্ধ শুরু করার জন্য চাপ দিয়ে যাওয়ায়, এই পুরো ঘটনা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কৌশলগত সাফল্যকে সামনে নিয়ে এসেছে।
ইরানের পরিমিত কিন্তু শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া শুধু দখলদার শক্তির ওপর উচ্চ মূল্য চাপিয়ে দেয়নি, একইসঙ্গে তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মজুদও কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে ইসরায়েলকে তার আগ্রাসনের পরিণতি থেকে অনির্দিষ্টকাল রক্ষা করার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের এই বিপুল হ্রাস ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি “সন্ত্রাসী যুদ্ধের” প্রকৃত মূল্য প্রকাশ করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে জয়েন্ট চিফস চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনসহ সিনিয়র সামরিক নেতারা ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ অস্ত্রভাণ্ডারকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
ক্যাপিটল হিলে ডেমোক্র্যাটরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অ্যারিজোনার সিনেটর মার্ক কেলি বলেছেন, “এক পর্যায়ে এটা গণিতের সমস্যায় পরিণত হয়। আমরা কীভাবে আবার বিমান প্রতিরক্ষা গোলাবারুদ সরবরাহ করব?”
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS)-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে উন্নত শ্রেণীর অস্ত্র উৎপাদন চারগুণ বাড়ানোর সাম্প্রতিক চুক্তিগুলো বাস্তবায়নে বহু বছর সময় লাগবে।
পেন্টাগনের কম্পট্রোলার জুলস হার্স্ট ট্রাম্পের ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের সামরিক বাজেট পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে আশাবাদী পরিস্থিতিতেও ইরানের বিরুদ্ধে চালানো ধ্বংসাত্মক অভিযানের পর খালি হয়ে যাওয়া অস্ত্রভাণ্ডার পুনরুদ্ধারে বহু বছর সময় লাগবে।#
পার্স টুডে/এমএএইচ/২২
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।