কালীঘাটে নজিরবিহীন নাটকীয়তা: মমতা ও অভিষেকের কার্যালয়ে সিআইডির তল্লাশি
-
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িসংলগ্ন তৃণমূলের কার্যালয়ে সিআইডি'র দল
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সই জালিয়াতির একটি মামলার তদন্তে কলকাতার দুটি হাই-প্রোফাইল রাজনৈতিক নেতার কার্যালয়ে একযোগে হানা দিয়েছে রাজ্য গোয়েন্দা পুলিশ (সিআইডি)।
আজ (মঙ্গলবার) বিকেলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বাহিনী ও কেন্দ্রীয় পুলিশ নিয়ে সিআইডির একটি বিশেষ দল সরাসরি পৌঁছে যায় কলকাতার ৩০বি হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে, যা রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবন সংলগ্ন দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় হিসেবে পরিচিত। প্রায় একই সময়ে সিআইডির আরেকটি বড় দল হানা দেয় ক্যামাক স্ট্রিটে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিসে। এই ‘ডবল স্ট্রাইক’ ঘিরে বিকেল থেকেই গোটা এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দলের দ্বিতীয় প্রধান নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দুজনেই এই মুহূর্তে বিজেপি-বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠকে যোগ দিতে দিল্লিতে অবস্থান করছেন। শীর্ষ নেতৃত্বের এই অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে কালীঘাটের পার্টি অফিসের গেটের সামনে সিআইডি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তৃণমূল নেতাদের ব্যাপক বাগ্বিতণ্ডা ও বাদানুবাদ হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও দলীয় সূত্রে জানা যায়, সিআইডির দল পৌঁছানোর পর কার্যালয়ের গেট খুলে বাইরে আসেন তৃণমূলের প্রাক্তন সাংসদ ও দলের কোষাধ্যক্ষ শুভাশিস চক্রবর্তী। নিজেকে দলের একজন সাধারণ কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি তদন্তকারীদের কাছে অনুরোধ করেন, শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে আপাতত এই তল্লাশি অভিযান স্থগিত রাখা হোক। নেতারা দিল্লি থেকে ফিরলে সমন্বয়ের মাধ্যমে বিষয়টি দেখা যেতে পারে বলেও তিনি জানান। শুভাশিস চক্রবর্তী বলেন, "যাঁরা কলকাতায় নেই, তাঁদের কার্যালয়ে আমি কীভাবে ঢোকার অনুমতি দেব? আপনারা আমাদের দু-তিন দিন সময় দিন।"
তবে সিআইডি কর্মকর্তারা তাঁদের অবস্থানে অনড় থাকেন। তাঁদের সাফ দাবি, প্রয়োজনীয় আইনি নথি ও সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়েই তাঁরা এসেছেন এবং আইন অনুযায়ী তদন্ত চালানোর সম্পূর্ণ অধিকার তাঁদের রয়েছে। তদন্তের কাজে বাধা দেওয়া হলে তা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে বলেও তাঁরা তৃণমূল নেতাদের স্মরণ করিয়ে দেন।
আইনি অধিকার বনাম স্থগিতের আর্জির এই টানাপোড়েনে প্রায় ঘণ্টাখানেক গেটের মুখে অচলাবস্থা তৈরি হয়। অবশেষে অনেক টালবাহানার পর বিকেল চারটার কিছু পরে তৃণমূলের ওই কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয় সিআইডি দল। বাইরে মোতায়েন রাখা হয় বিশাল পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী।
সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, এই অভিযানের মূল সূত্র একটি ‘সই জালিয়াতি’ মামলা। অভিযোগ উঠেছে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসুর কাছে তৃণমূল বিধায়কদের সই করা যে প্রস্তাবিত চিঠি পাঠিয়েছিলেন, তাতে কয়েকজন বিধায়কের সই ‘জাল’ করা হয়েছে। যে বৈঠকে বিধায়কদের ওই সই সংগ্রহ করা হয়েছিল, সেটি হয়েছিল কালীঘাটের এই কার্যালয়েই। মূলত সেদিন কী ঘটেছিল, কারা উপস্থিত ছিলেন এবং কারা সই করেছিলেন—সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজসহ অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহ করতে সেখানে যান।
এর আগে গত ৩০ মে এই সই-কাণ্ডের তদন্তের সূত্র ধরে প্রথমবার অভিষেকের কালীঘাটের বাড়িতে যায় সিআইডি এবং ১ জুন তাঁকে হাজিরার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে অভিষেক হাজির না হয়ে ১৪ দিনের সময় চাইলে সিআইডি তা নাকচ করে দেয় এবং সোমবারের (৮ জুন) মধ্যে হাজিরার পুনরায় নোটিস দেয়। কিন্তু গত সোমবারও দিল্লিতে থাকার কারণে অভিষেক সিআইডির হাজিরা এড়িয়ে যান। এরপরই আজ মঙ্গলবার বিকেলে এই আকস্মিক ও বড় ধরনের অভিযান চালাল রাজ্য গোয়েন্দা সংস্থা।
এদিকে আকস্মিক এই অভিযানের পর আইনি ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ ঠিক করতে দিল্লির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের চেষ্টা চালাচ্ছেন রাজ্য তৃণমূলের উচ্চপর্যায়ের নেতারা।#
পার্সটুডে/এমএআর/৯