দিল্লিতে ২০ বিদ্রোহী সাংসদের মেগা বৈঠক:
‘অভিষেকের হাত ছাড়লে তবেই মমতা নেত্রী’, শর্ত নতুন তৃণমূলের
-
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেধ বন্দ্যোপাধ্যায়
ভারতের লোকসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙন ও অভ্যন্তরীণ বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। একদিকে রাজ্য বিধানসভায় তৈরি হয়েছে ‘নতুন তৃণমূল’, অন্যদিকে দেশের রাজধানী দিল্লিতে বিজেপির শীর্ষ নেতার বাসভবনে বৈঠক করছেন দলটির বিদ্রোহী সাংসদরা। সব মিলিয়ে জোড়াপুল শিবিরে এখন বড়সড় ফাটলের স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে।
বিধানসভায় ‘নতুন তৃণমূল’ ও মমতাকে শর্ত
রাজ্য বিধানসভায় দল থেকে বহিষ্কৃত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহার নেতৃত্বে ইতিমধ্যেই 'নতুন' তৃণমূল গঠিত হয়েছে। নির্বাচনে জয়ী ৮০ জন তৃণমূল বিধায়কের মধ্যে ৬৪ জনই এই আলাদা 'ফ্রন্ট'-এ যোগ দিয়েছেন। বিধানসভার এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরোধী দলনেতা হয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মুখ্য সচেতক হয়েছেন প্রাক্তন মন্ত্রী তথা রঘুনাথগঞ্জের বিধায়ক আখরুজ্জামান।
এই গোষ্ঠী স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরামর্শ বা ‘মেন্টরশিপে’ কাজ করতে রাজি, কিন্তু দলের ‘যুবরাজ’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কোনোভাবেই মেনে নেবে না। মুখ্য সচেতক আখরুজ্জামান নেত্রীকে সরাসরি শর্ত দিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, মমতা যদি অভিষেকের সঙ্গ না ছাড়েন, তবে তাঁরা জোড়াফুল প্রতীক দাবি করে ‘নতুন তৃণমূল’ গড়বেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, মমতার ওপর চাপ তৈরি করতেই এই কৌশল নেওয়া হয়েছে।
দিল্লিতে সাংসদদের মেগা বৈঠক ও এনডিএ জল্পনা
বিধানসভার পাশাপাশি তৃণমূলের সংসদীয় দলেও বড় ভাঙন দেখা দিয়েছে। রবিবার সন্ধ্যায় দিল্লিতে বিজেপির শীর্ষ নেতা ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে তৃণমূলের ‘বিদ্রোহী’ সাংসদদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই বৈঠকে যোগ দিতে ইতিমধ্যেই কলকাতা থেকে দিল্লি পৌঁছেছেন কাকলি ঘোষদস্তিদার, মালা রায় ও সায়নী ঘোষের মতো হেভিওয়েট সাংসদরা। এমনকি মমতার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বর্ষীয়ান সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ও শতাব্দী রায়কেও একসঙ্গে ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে পৌঁছাতে দেখা গেছে।
বিদ্রোহী শিবিরের অন্যতম মুখ কাকলি ঘোষদস্তিদারের দাবি, লোকসভায় তৃণমূলের মোট ২৮ জন সাংসদের মধ্যে এনডিএ-কে সমর্থনকারী বিদ্রোহী সাংসদের সংখ্যা ২০ থেকে বেড়ে ২২-এ পৌঁছাতে পারে। এই দাবি সত্যি হলে, মূল শিবিরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মহুয়া মৈত্র ও সৌগত রায়সহ মাত্র ৬ থেকে ৮ জন সাংসদ অবশিষ্ট থাকবেন। সোমবার এই বিদ্রোহী সাংসদরা লোকসভার স্পিকারের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের সংসদীয় অবস্থান স্পষ্ট করতে পারেন।
আইনি ও সাংবিধানিক জটিলতা
তৃণমূলের এই নজিরবিহীন বিদ্রোহের মাঝে একটি বড় সাংবিধানিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে— একই প্রতীক নিয়ে সংসদে বা বিধানসভায় দুটি আলাদা দল বা ব্লক হিসেবে থাকা সম্ভব কি না?
এই বিষয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও লোকসভার প্রাক্তন সেক্রেটারি জেনারেল পি.ডি.টি. আচার্য জানিয়েছেন, সংসদীয় নিয়মে একই দলের ভেতরে আলাদা ব্লক তৈরির কোনো স্পষ্ট বিধান নেই। বিদ্রোহীরা যদি নিজেদের 'আসল তৃণমূল' দাবি করতে চান, তবে তাঁদের নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে হবে। অন্যথায়, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে তাঁরা সরাসরি বিজেপিতেও যোগ দিতে পারেন।
গত ৪ মে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকে শুরু হওয়া এই 'মহাবিদ্রোহ' আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গ তথা জাতীয় রাজনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।#
পার্সটুডে/এমএআর/১৪