সৌদি আরবকে ৪৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান দেবে আমেরিকা, ইসরায়েলি লবির বাধার আশঙ্কা
https://parstoday.ir/bn/news/event-i163188-সৌদি_আরবকে_৪৮টি_এফ_৩৫_যুদ্ধবিমান_দেবে_আমেরিকা_ইসরায়েলি_লবির_বাধার_আশঙ্কা
পার্সটুডে: ইয়েমেনের বিরুদ্ধে রিয়াদের সামরিক আগ্রাসন জোরদারের মধ্যেই সৌদি আরবের কাছে ২৪.৩ বিলিয়ন ডলারের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাব্য চুক্তিতে অনুমোদন দিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
(last modified 2026-09-19T07:01:54+00:00 )
সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬ ১৭:৫৯ Asia/Dhaka
  • কয়েকটি মার্কিন এফ-৩৫-এ জেট মডেলের জঙ্গি বিমান
    কয়েকটি মার্কিন এফ-৩৫-এ জেট মডেলের জঙ্গি বিমান

পার্সটুডে: ইয়েমেনের বিরুদ্ধে রিয়াদের সামরিক আগ্রাসন জোরদারের মধ্যেই সৌদি আরবের কাছে ২৪.৩ বিলিয়ন ডলারের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাব্য চুক্তিতে অনুমোদন দিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।

এই অনুমোদনের আওতায় ৪৮টি লকহিড মার্টিন এফ-৩৫ লাইটনিং-২ যুদ্ধবিমান এবং ৪৯টি প্র্যাট অ্যান্ড হুইটনি ইঞ্জিন রয়েছে। তবে চুক্তিটি কার্যকর করতে এখনো মার্কিন কংগ্রেসের পর্যালোচনা প্রয়োজন।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বৃহস্পতিবার কংগ্রেসকে জানিয়েছে, প্রস্তাবিত বিক্রয়ের মধ্যে যুদ্ধবিমান, ইঞ্জিন, যোগাযোগ সরঞ্জাম, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা, খুচরা যন্ত্রাংশ, প্রশিক্ষণ, সিমুলেটর, সফটওয়্যার এবং লজিস্টিক সহায়তা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

প্রস্তাবিত বিক্রয় পর্যালোচনার জন্য কংগ্রেসের হাতে ৩০ দিন সময় রয়েছে। এর আগে আইনপ্রণেতারা রিয়াদের সঙ্গে বড় ধরনের অস্ত্রচুক্তিগুলো খতিয়ে দেখেছেন, বিশেষ করে ২০১৮ সালে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগি নিহত হওয়ার পর।

এই অনুমোদন যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সামরিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের বৃহত্তর ধারাবাহিকতার অংশ। এর মধ্যে ২০২৫ সালে প্রায় ১৪২ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজও রয়েছে, যেটিকে হোয়াইট হাউস “মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক সহযোগিতা চুক্তি” হিসেবে বর্ণনা করেছিল।

সৌদি আরব প্রস্তাবিত বিক্রয়কে স্বাগত জানিয়েছে। ওয়াশিংটনে সৌদি দূতাবাস এটিকে রিয়াদ ও ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারত্বের আরেকটি পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

দূতাবাস এক্স-এ প্রকাশিত এক পোস্টে লিখেছে, “প্রস্তাবিত এফ-৩৫ বিক্রয় সৌদি-মার্কিন কৌশলগত অংশীদারত্বের শক্তি ও স্থায়ী প্রকৃতি এবং আমাদের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ধারাবাহিক অগ্রগতিকে প্রতিফলিত করে।”

দূতাবাস আরও দাবি করেছে, “কয়েক দশক ধরে সৌদি-মার্কিন নিরাপত্তা সহযোগিতা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় অবদান রেখেছে, আমাদের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শক্তিশালী করেছে এবং আমাদের অভিন্ন নিরাপত্তা স্বার্থকে এগিয়ে নিয়েছে।”

এফ-৩৫ একটি পঞ্চম প্রজন্মের বহুমুখী যুদ্ধবিমান। এটি স্টেলথ প্রযুক্তি, উন্নত সেন্সর, তথ্য সমন্বয় এবং নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছে।

সৌদি আরব বহু বছর ধরে এফ-৩৫ পাওয়ার চেষ্টা করে আসছে। দেশটির বিমানবাহিনী আধুনিকায়নের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই যুদ্ধবিমান চাওয়া হচ্ছে। বর্তমানে সৌদি বিমানবাহিনীতে মার্কিন নির্মিত এফ-১৫ এবং ইউরোপীয় টর্নেডো ও ইউরোফাইটার টাইফুন যুদ্ধবিমান রয়েছে।

ইসরায়েল প্রায় এক দশক ধরে এই যুদ্ধবিমান ব্যবহার করছে এবং বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ায় এফ-৩৫ পরিচালনাকারী একমাত্র পক্ষ। ফলে প্রস্তাবিত সৌদি ক্রয় সম্পন্ন হলে রিয়াদ হবে এই যুদ্ধবিমানের প্রথম আরব ব্যবহারকারী।

তবে অনেক পর্যবেক্ষক এই প্রস্তাবকে শুরুতেই ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এটি সৌদি আরবকে নিজেদের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে এবং আরও নিয়ন্ত্রণ ও শোষণের সুযোগ তৈরিতে ওয়াশিংটনের কৌশলগত তৎপরতার অংশ।

এটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ইয়েমেনি বাহিনীর ওপর বোমা হামলা চালানো এবং তাদের অগ্রযাত্রা থামানোর জন্য বারবার অনুরোধ করেছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কোনো কোনো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি এক দিনেই তিনবার এমন অনুরোধ করেছিলেন। ট্রাম্পের সরাসরি প্রত্যাখ্যানের পর রিয়াদ অপমানিত ও ক্ষুব্ধ হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চুক্তিটি কংগ্রেসে তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি লবি ও ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠী চুক্তিটি এগিয়ে যাওয়া ঠেকাতে কাজ করতে পারে—যদি না তারা সৌদি আরবের কাছ থেকে কোনো কৌশলগত ছাড় আদায় করতে পারে, যেমন আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়া। এমনকি সেক্ষেত্রেও সৌদি আরবকে ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীর এফ-৩৫-এর সমপর্যায়ের সক্ষমতা দেয়া হবে না এবং সংবেদনশীল কিছু উপাদান সীমিত রাখা হতে পারে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র এফ-৩৫-এর সফটওয়্যার ও মিশন সিস্টেমের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। অন্য বিদেশি ব্যবহারকারীদের তুলনায় ইসরায়েলকে এই বিমান পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে বিশেষ সক্ষমতা এবং অধিকতর প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়েছে।

ইসরায়েলি দখলদার শাসকগোষ্ঠী ইরান ও লেবাননের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সময় এবং গাজায় গণহত্যার সময় ব্যাপকভাবে এই যুদ্ধবিমান ব্যবহার করেছে। এসব হামলায় কয়েক হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত ও আহত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৯ মার্চ ইরানের একটি এফ-৩৫ সফলভাবে ভূপাতিত করার ঘটনা—যা যুক্তরাষ্ট্র মাত্র গত সপ্তাহে স্বীকার করেছে—ব্যাপক প্রচার পাওয়া এই যুদ্ধবিমানের সুনামকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর ফলে কোনো কোনো পক্ষ যুদ্ধবিমানটি কেনার পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। প্রতিটি এফ-৩৫-এর দাম ১০ কোটি ডলারেরও বেশি।

ইরানের ওই সফল হামলার ভিডিও প্রকাশের দিনই নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দর তীব্রভাবে কমে যায়, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সৌদি আরব লোহিত সাগর উপকূলে ইয়েমেনি সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে একের পর এক সামরিক ব্যর্থতার মুখে পড়ার পর ইয়েমেনে বিমান হামলা আরও জোরদার করেছে। এমন সময়েই এফ-৩৫ বিক্রির প্রস্তাবটি সামনে এসেছে।

মঙ্গলবার ইয়েমেনি সশস্ত্র বাহিনী জানায়, তারা স্থানীয়ভাবে তৈরি একটি ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে মা’রিব প্রদেশের আকাশে একটি সৌদি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে।

ধ্বংসাবশেষের সন্ধানে সৌদি এফ-১৫ ও টাইফুন যুদ্ধবিমানের আরও দুটি বহরও ইয়েমেনি বাহিনীর হামলার মুখে পড়ে এবং পিছু হটতে বাধ্য হয় বলে ইয়েমেনি বাহিনী জানিয়েছে।

এই ঘোষণার পর ইয়েমেনি বাহিনী একটি ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে একটি ক্ষেপণাস্ত্রকে একটি বিমানকে আঘাত করতে এবং মরুভূমি এলাকায় যোদ্ধাদের ধ্বংসাবশেষ পরিদর্শন করতে দেখা যায়।

ইয়েমেনি সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি শুক্রবার বলেছেন, খামিস মুশাইত বিমানঘাঁটি থেকে পরিচালিত সৌদি এফ-১৫ যুদ্ধবিমানগুলো ২৪ ঘণ্টায় তাইজ ও হাজ্জাহ এলাকার বিভিন্ন স্থানে ৩৭টি বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় বেসামরিক মানুষ নিহত ও আহত হয়েছে বলে তিনি জানান।

২০১৫ সালের মার্চ থেকে সৌদি আরব ও তার মিত্ররা ইয়েমেনের ওপর অবরোধ আরোপ করে এবং ব্যাপক সামরিক আগ্রাসন শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্র ও কয়েকটি পশ্চিমা দেশের সামরিক, রাজনৈতিক ও লজিস্টিক সহায়তায় এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে।

এই অবরোধে কয়েক হাজার ইয়েমেনি নিহত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে, সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযান সানায় একটি অনুগত সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। #

 

পার্সটুডে/এমএএইচ /১৮

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।