শত্রুরা আরব সাগর পেরিয়ে সামনে আসার সাহস হারিয়েছে: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা
-
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা
পার্সটুডে- ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পবিত্র প্রতিরক্ষা সপ্তাহ এবং লেবাননের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহর সাবেক মহাসচিব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতাবা খামেনেয়ী বার্তা দিয়েছেন।
তিনি ঐ বার্তায় বলেছেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে [শত্রুরা] বীর ইরানি যোদ্ধা তথা হরমুজ প্রণালির রক্ষকদের কাছ থেকে যে বেদনাদায়ক আঘাত পেয়েছে, সেটার কারণে তারা আরব সাগরের সীমানা পেরিয়ে সামনে এগোতে পারছে না। খুব শিগগিরই আরব সাগরও তাদের উপস্থিতি থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। এই মুহূর্তে গোটা ইসলামী ইরানজুড়ে বিভিন্নভাবে প্রস্তুতির ঘোষণা রয়েছে, বিশেষ করে সশস্ত্র প্রস্তুতি। এর লক্ষ্য এমন একটি যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করা, যেখানে ইরানিদের জন্য সম্মান আর তাদের শত্রুদের জন্য লজ্জা অপেক্ষা করবে।
তিনি বলেন, প্রিয় ইরানি জনগণের একজন সেবক হিসেবে আমি ঘোষণা করছি—যে অতীতের দিনগুলোতে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন আমাদের শত্রু দেখছে, সেই দিনগুলো অতীত হয়ে গেছে। সেগুলো আর কখনো ফিরে আসবে না।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার বার্তাটি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো-
পরম করুণাময়, অতি দয়ালু আল্লাহর নামে।
অবশ্যই আমি মূসাকে আমার নিদর্শনসমূহ দিয়ে পাঠিয়েছিলাম আর বলেছিলাম, তোমার জাতিকে অন্ধকার থেকে আলোতে বের করে আন, আর তাদেরকে আল্লাহর হুকুমে ঘটিত অতীতের ঘটনাবলী দিয়ে উপদেশ দাও।
(পবিত্র কুরআন, সূরা ইবরাহিম, আয়াত ৫)
ফার্সি মেহর মাসের শুরুর দিনগুলো ইরানি জনগণের আট বছরের প্রতিরোধ ও আত্মরক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়—যে যুদ্ধ ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই দিনগুলোতে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের আলো এমন এক মনোরম ঐক্যের অনুভূতি ছড়িয়ে দিয়েছিল, যার প্রভাবে পুরোনো ও নতুন ঔপনিবেশিকতার বরফ গলে শেষ হয়ে যাচ্ছিল।
ইসলামী বিপ্লবের আগে দিনগুলো ছিল অন্ধকার ও দুর্দশায় ভরা। পরাশক্তিধর দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতেরা ইরানের শাহ (রাজা)-কে কী করতে হবে আর কী করা যাবে না—সেসব নির্দেশ দিতেন, আর শাহও সেগুলো বাস্তবায়ন করতেন। অবশেষে ইমাম খোমেনী (রহ.)-এর নেতৃত্বে ইরানি জনগণের মহান বিপ্লব সেই ব্যবস্থা ভেঙে দেয়।
ইসলামী বিপ্লব সেই আধিপত্যবাদীদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যারা ইরানের সম্পদের ওপর লোলুপ দৃষ্টি রেখেছিল এবং বছরের পর বছর দেশটির সম্পদ নিজেদের দখলে নেওয়ার জন্য জনগণের ওপর নানা ধরনের অন্যায়-অত্যাচার চালিয়েছিল।
গণবিরোধী বাথ পার্টির হাত দিয়ে যে যুদ্ধের আগুন জ্বালানো হয়েছিল, তা থেকে ইসলামী ব্যবস্থা আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠে দাঁড়ায়—আরও জোরালো কণ্ঠে, আরও উচ্চতর প্রত্যয়ে। পরবর্তীতে শত্রুদের সৃষ্ট নানা সংকটেও এই বৈশিষ্ট্যই ইসলামী ব্যবস্থার ধারাবাহিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।
এখন এমন দিন এসেছে, যখন স্বয়ং আধিপত্যবাদী আগ্রাসীরাই তাদের অনুসারীরাতো বটেই, ইসলামের যোদ্ধাদের হামলার মুখে আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে এবং যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য আকুতি জানাচ্ছে।
শত্রুরা যে দিনগুলোতে ইরানকে ফিরিয়ে নিতে চায়, সেসব দিন ছিল পশ্চাৎপদতা, অপমান ও পরনির্ভরশীলতায় ভরা। আর আমরা যে সময়ে বাস করছি, তা অগ্রগতি, মর্যাদা, স্বাধীনতা এমনকি মুসলিম বিশ্বসহ সমগ্র বিশ্বে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্মানে পরিপূর্ণ।
বর্তমানে কেউ কেউ আমাদেরকে বিশ্বের চতুর্থ পরাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করে। অবশ্য তারা পার্থিব হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে এ কথা বলে। কিন্তু আল্লাহর হিসাব অনুযায়ী, যে দেশ নিজেকে পবিত্র আহলে বাইতের সঙ্গে সম্পৃক্ত মনে করে এবং যার অধিকাংশ মানুষ সত্য প্রতিষ্ঠার পথে কোনো ভয়কে পরোয়া করে না, সেই দেশই বিশ্বের প্রথম পরাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
সাত মাস ধরে আমাদের দেশবাসী [ইরানের] গোটা দেশের মাঠ-প্রান্তর ও রাস্তাঘাটকে তাদের দায়িত্বশীল ও উৎসাহপূর্ণ উপস্থিতিতে মুখরিত করে রেখেছেন—যাতে ইসলামের যোদ্ধাদের মনোবল দৃঢ় থাকে এবং শত্রু আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
এমন দিনও ছিল, যখন শত্রুরা ইসলামী ব্যবস্থার সামাজিক ভিত্তিকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আজ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি তাদের ন্যায্য অবস্থান রক্ষার বিষয়ে দৃঢ়ভাবে অটল রয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে রয়েছে হরমুজ প্রণালি রক্ষার অঙ্গীকার।
আরব বিশ্বের বীর কমান্ডার এবং প্রতিরোধ ফ্রন্টের মহান প্রতীক শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর (আল্লাহ তাঁর পবিত্র আত্মাকে মর্যাদা দান করুন) শাহাদাতের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে তাঁকে স্মরণ করা অত্যন্ত যথার্থ।
তিনি ছিলেন তাঁর জনগণ ও আদর্শের প্রতি একজন আন্তরিক শুভাকাঙ্ক্ষী। তাঁর আন্তরিক ও প্রাঞ্জল বক্তব্য এবং সাহসী কর্মকাণ্ড তাঁর নিজ দেশের জনগণের হৃদয়কে শক্তিশালী করেছিল; এমনকি বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের মনেও সাহস জুগিয়েছিল। তিনি লেবাননের মর্যাদাকে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন—এই ছোট্ট দেশটি বহু বছর ধরে বিদেশি শক্তিগুলোর প্রভাববলয়ে পরিণত হয়েছিল। বিজয় ও সাফল্য যেন সবসময় তাঁর সঙ্গী ছিল। নিঃসন্দেহে, নবী-রাসুল ও তাঁদের উত্তরসূরিদের পর গোটা শাম অঞ্চলের দীর্ঘ ইতিহাসে তাঁর মতো মর্যাদাসম্পন্ন কোনো ব্যক্তিত্ব আর আবির্ভূত হননি।
আজ তাঁর গৌরবময় পতাকা রয়েছে শহীদের উত্তরসূরি সাইয়্যেদ শেখ নাঈম কাসেমের (আল্লাহ তাঁকে হেফাজত করুন) হাতে। তিনি সাহসিকতার সঙ্গে হিজবুল্লাহর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও আশুরার চেতনায় উজ্জীবিত যোদ্ধাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যারা তাঁর দেখানো পথেই এগিয়ে চলেছেন।
লেবাননের বর্তমান দিনগুলো—ইতিহাসের চূড়ান্ত বিচারের আগেই—দেশটির জনগণ এবং প্রতিরোধের সব যোদ্ধার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবময় সময়। এসব দিন তাদের জন্য অপমান ও শেষ পর্যন্ত লাঞ্ছনা বয়ে আনছে, যারা ইহুদিবাদী শত্রুর মোকাবিলায় আধিপত্যবাদী শক্তিগুলোর মিথ্যা প্রতিশ্রুতি এবং জনগণের অকল্যাণকামীদের ওপর আশা রাখে।
অন্যদিকে প্রতিরোধের নায়ক শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ, শহীদ সাইয়্যেদ হাশেম সাফিউদ্দিন এবং বর্তমান প্রতিরোধযোদ্ধারা সময়ের স্রোতে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করতে থাকবেন। পথ হারিয়ে বিভ্রান্ত মানুষের জন্য তাঁরা পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবেন। বিপরীতে, যারা প্রতিরোধের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে, ইতিহাসের প্রথম কয়েকটি পাতাতেই তাদের দ্রুত কবর রচিত হবে এবং তারা বিস্মৃত হয়ে যাবে। ভবিষ্যতে যখনই তাদের কথা স্মরণ করা হবে, তখন তা হবে বিদ্বেষ, মূর্খতা এবং হয়তো বিশ্বাসঘাতকতার উদাহরণ হিসেবে।
পরিশেষে আমি আশাবাদী যে, আল্লাহর অব্যাহত অনুগ্রহ এবং আমাদের নেতা ইমাম মাহদির (আল্লাহ তাঁর পবিত্র আবির্ভাব ত্বরান্বিত করুন এবং তাঁর জন্য আমাদের আত্মা উৎসর্গ হোক) বিশেষ দোয়ার বরকতে ইরানি জনগণ এবং প্রতিরোধের সব মিত্র বিজয়, সাফল্য ও গৌরব অর্জন করবে। আর তাদের শত্রুরা আল্লাহর অনুগ্রহ ও কৃপায় কেবল পরাজয় ও অপমানের সম্মুখীন হবে।#
পার্সটুডে/এসএ/২৮