ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ৪৭তম বিজয় বার্ষিকী: ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়
https://parstoday.ir/bn/news/iran-i156854-ইরানের_ইসলামী_বিপ্লবের_৪৭তম_বিজয়_বার্ষিকী_ইতিহাসের_এক_অনন্য_অধ্যায়
সাইফুল খান: ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। তেহরানের রাজপথে লক্ষ লক্ষ মানুষের স্লোগানে প্রকম্পিত হচ্ছিল পুরো শহর। দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের পর অবশেষে বিজয়ের সূর্য উদিত হলো ইরানের আকাশে। পাহলভি রাজতন্ত্রের পতন হলো, প্রতিষ্ঠিত হলো ইসলামী প্রজাতন্ত্র। আজ ২০২৬ সালে এসে সেই ঐতিহাসিক দিনের ৪৭ বছর পূর্ণ হতে চলেছে।
(last modified 2026-02-09T14:47:21+00:00 )
ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০২৬ ১৫:৩৬ Asia/Dhaka
  • ইরানের ইসলামী বিপ্লবের  বিজয় বার্ষিকীর শোভাযাত্রা (ফাইল ফটো)
    ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিজয় বার্ষিকীর শোভাযাত্রা (ফাইল ফটো)

সাইফুল খান: ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। তেহরানের রাজপথে লক্ষ লক্ষ মানুষের স্লোগানে প্রকম্পিত হচ্ছিল পুরো শহর। দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের পর অবশেষে বিজয়ের সূর্য উদিত হলো ইরানের আকাশে। পাহলভি রাজতন্ত্রের পতন হলো, প্রতিষ্ঠিত হলো ইসলামী প্রজাতন্ত্র। আজ ২০২৬ সালে এসে সেই ঐতিহাসিক দিনের ৪৭ বছর পূর্ণ হতে চলেছে।

বিপ্লবের পটভূমি

১৯৭০-এর দশকে ইরান ছিল এক অস্থির দেশ। মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির শাসনামলে পশ্চিমা প্রভাব, সামাজিক বৈষম্য আর রাজনৈতিক দমন-পীড়ন চরমে পৌঁছেছিল। সাধারণ মানুষের মনে জমা হচ্ছিল ক্ষোভ। তেলসম্পদের বিপুল অর্থ সাধারণ জনগণের কাছে পৌঁছাচ্ছিল না, বরং তা ব্যয় হচ্ছিল বিলাসিতা আর পশ্চিমা সিলেবাসের সামরিক খাতে।

এই পরিস্থিতিতে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি (রহ.) হয়ে উঠলেন জনগণের আশার প্রতীক। নির্বাসন থেকে তাঁর বাণী ছড়িয়ে পড়ছিল ক্যাসেট প্লেয়ারের মাধ্যমে। তিনি ডাক দিলেন ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা আর ইসলামী মূল্যবোধের।

বিপ্লব বার্ষিকীর শোভাযাত্রায় নারীদের অংশগ্রহণ

বিপ্লবের উত্তাল দিনগুলো

১৯৭৮ সাল জুড়ে চলল বিক্ষোভ-সমাবেশ। সরকারি দমন-পীড়ন আরও তীব্র হলো, কিন্তু জনগণের সংকল্প আরও দৃঢ় হতে থাকল। বাজার বন্ধ, ধর্মঘট, মিছিল চলতে থাকল নিরন্তর। শিক্ষক, শ্রমিক, ছাত্র, ব্যবসায়ী, ধর্মীয় নেতা সবাই এক হয়ে গেলেন একটি লক্ষ্যে- শাহের পতন।

১৯৭৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্যারিস থেকে দীর্ঘ ১৪ বছরের নির্বাসন শেষে তেহরানে ফিরলেন আয়াতুল্লাহ খোমেনি। বিমানবন্দর থেকে শহরের কেন্দ্র পর্যন্ত রাস্তায় লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল নামল। দশ দিন পর, ১১ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত বিজয় এলো যখন সামরিক বাহিনী নিরপেক্ষতা ঘোষণা করল এবং রাজতন্ত্রের পতন সম্পূর্ণ হলো।

বিপ্লবের তাৎপর্য

ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিশ্ব রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব ঘটনা। এটি দেখিয়ে দিল যে, জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তি কতটা প্রবল হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে এই বিপ্লব এক নতুন মাত্রা যোগ করল, যেখানে একটি দেশ নিজস্ব পথে চলার সাহস দেখাল।

বিপ্লবের মূল স্লোগান ছিল স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র। সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়ন, জাতীয় সম্পদের ন্যায্য বণ্টন, বিদেশি নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি এসব ছিল বিপ্লবের মূল প্রতিশ্রুতি।

বিপ্লব বার্ষিকীর শোভাযাত্রায় ইসরায়েলের প্রতীকী কফিনের পাশে নারী ও শিশুরা

৪৭ বছরের পথচলা

প্রায় পাঁচ দশক পেরিয়ে গেছে সেই ঐতিহাসিক দিনের। এই সময়ে ইরান দেখেছে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অবরোধ, আন্তর্জাতিক চাপ। তবুও তারা টিকে আছে নিজস্ব পথে। দেশটি তার বৈজ্ঞানিক গবেষণা, মহাকাশ কর্মসূচি, চিকিৎসা শিক্ষা এবং প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে।

আজকের তরুণ প্রজন্ম

যারা বিপ্লব দেখেনি, সেই তরুণ প্রজন্মের কাছে বিপ্লব দিবস এক ঐতিহাসিক স্মৃতি। তাদের চোখে দেখার আকাঙ্ক্ষা ভিন্ন, স্বপ্ন আলাদা। তারা চায় আরও উন্মুক্ত সমাজ, বেশি সুযোগ, নতুন সম্ভাবনা। বিপ্লবের আদর্শ আর আধুনিক বাস্তবতার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

শেষ কথা

ইরানের ইসলামী বিপ্লব পৃথিবীর ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি দেখিয়েছে- কীভাবে জনগণ তাদের ভাগ্য নিজেরাই নির্ধারণ করতে পারে। ৪৭ বছর পর এসেও এই বিপ্লব নিয়ে বিতর্ক আছে, ভিন্নমত আছে। কেউ এটিকে দেখেন মুক্তির পথ হিসেবে, কেউ দেখেন হারানো সুযোগ হিসেবে।

তবে নিঃসন্দেহে বলা যায়, ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি শুধু ইরানের নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্য এমনকি বিশ্ব রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী দিন। এই দিনটি মনে করিয়ে দেয় যে, পরিবর্তন সম্ভব, জনগণের শক্তি অপরিসীম এবং ইতিহাস থেমে থাকে না। এগিয়ে চলে নতুন আকাঙ্ক্ষা আর স্বপ্ন নিয়ে। ইরানের মহান ইসলামী বিপ্লব জিন্দাবাদ।

লেখক: ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।  

পার্সটুডে/এমএআর/৯