‘মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর জন্য কালো দিন’
ইরানের হামলায় ২৪ ঘণ্টায় ৩টি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত, চিনুক হেলিকপ্টার ধ্বংস
ইরানের সশস্ত্র বাহিনী গত ২৪ ঘণ্টায় মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ও সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা শুক্রবার সকাল থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত এফ-৩৫ জঙ্গিবিমানসহ তিন যুদ্ধবিমান, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও হেলিকপ্টার ভূপাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই ঘটনাগুলোকে ‘মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর জন্য কালো দিন’ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।
শুক্রবারে ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাফল্য:
আইআরজিসির শনিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, শুক্রবার তাদের মহাকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী খোমেইন ও জানজানের আকাশে দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে ধ্বংস করে। এছাড়া ইসফাহানের আকাশে দুটি এমকিউ-৯ অ্যাটাক ড্রোন এবং বুশেহরের আকাশে একটি হারমিস ড্রোন ভূপাতিত করা হয়।
একটি পৃথক ও বিশেষ উল্লেখযোগ্য ঘটনায়, ইরানের কেন্দ্রীয় অংশে একটি উন্নত শত্রু যুদ্ধবিমান ধ্বংস করা হয়েছে। নিখোঁজ পাইলটের সন্ধান অব্যাহত আছে এবং তিনি নিরাপদে ইজেক্ট করতে পারেননি বলে জানা গেছে।
একই দিনে ইরানের সেনাবাহিনী জানায়, হরমুজ প্রণালীর কাছে দক্ষিণাঞ্চলীয় জলরাশির ওপর একটি মার্কিন এ-১০ ওয়ারথগ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয়েছে। বিমানটি পারস্য উপসাগরের পানিতে বিধ্বস্ত হয়।
গত ২৪ ঘণ্টায় অর্জিত অন্যান্য বড় সাফল্য:
শুক্রবারের পর থেকে গত ২৪ ঘণ্টায় ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনী আরও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যের দাবি করেছে।
‘এফ-৩৫ স্টেলথ জঙ্গিবিমান ধ্বংস: ইরানের দাবি, তারা একটি মার্কিন এফ-৩৫ লাইটনিং ২ স্টেলথ ফাইটার জেট ভূপাতিত করেছে।
· এফ-১৫ ই যুদ্ধবিমান ভূপাতিত: একটি মার্কিন এফ-১৫ ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করা হয়েছে। এর পাইলট নিখোঁজ রয়েছেন।
· দুটি এইচএইচ-৬০ডব্লিউ জলি হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত ও আংশিক ধ্বংস: ভূপাতিত এফ-১৫ ই পাইলটের সন্ধানে অভিযানকালে ইরানের গুলিতে দুটি মার্কিন এইচএইচ-৬০ডব্লিউ জলি যুদ্ধ উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার আঘাতপ্রাপ্ত ও আংশিক ধ্বংস হয়েছে। এতে কয়েকজন ক্রু আহত হয়েছেন।
· শিরাজে দুটি ড্রোন ভূপাতিত: শিরাজ শহরের আকাশে একটি চীনা নির্মিত উইং লুং টু (Wing Loong II) এবং একটি মার্কিন এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উইং লুং টু ড্রোনটি সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের বহরে থাকতে পারে।
· যুদ্ধকালীন অভিযানে আরেক এমকিউ-৯ ড্রোন নিখোঁজ: পাইলট উদ্ধার অভিযানের সময় আরও একটি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন নিখোঁজ হয়েছে।
· জরুরি কোড ৭৭০০ প্রেরণ: ইরাকে একটি এফ-১৬ ফাইটিং বিমান এবং দুটি বোয়িং কেসি-১৩৫ স্ট্রাটোট্যাঙ্কার রিফুয়েলিং বিমান জরুরি কোড ৭৭০০ প্রেরণ করেছে, যা সাধারণত গুরুতর প্রযুক্তিগত সমস্যা বা যুদ্ধবিধ্বস্ত নির্দেশ করে।
· কুয়েতে চিনুক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত: ইরানি ড্রোন হামলায় কুয়েতের একটি বিমান ঘাঁটিতে অবস্থিত মার্কিন সিএইচ-৪৭ চিনুক হেলিকপ্টারের সম্মুখভাগ সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে।
আইআরজিসির সতর্কবার্তা
ইরানের আইআরজিসি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, ‘আমেরিকান-ইসরাইলি জোট কর্তৃক আরোপিত এই যুদ্ধ চলতে থাকায় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে। আগ্রাসী শত্রুর যুদ্ধবিমানগুলোর জন্য ইরানের আকাশ ক্রমশ আরও অনিরাপদ হয়ে উঠবে।’
‘আকাশে বিপদ’ ও ট্রাম্প প্রসঙ্গ:
ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দম্ভক্তি করার পর থেকে গত ২৪ ঘণ্টায় ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়ে মার্কিন বাহিনী। দুটি আমেরিকান যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর ফক্স নিউজ তাদের শিরোনামে লিখেছে, ‘আকাশে বিপদ’; দুটি আমেরিকান যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে এবং নিখোঁজ পাইলটের অনুসন্ধান চলছে।
সাতবারের ব্রিটিশ এমপি জর্জ গ্যালাওয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে লিখেছেন, "মার্কিন বিমান বাহিনীর জন্য ইরানের আকাশে উড়ে যাওয়া আর কখনোই স্বস্তিদায়ক বা আত্মবিশ্বাসের সকাল হবে না।"
অন্যদিকে, ক্লিনটন দম্পতির সাবেক উপদেষ্টা সিডনি ব্লুমেন্থাল বলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ হেরেছেন এবং এখন তিনি ইরানের জিম্মি। ব্লুমেন্থালের মতে, ট্রাম্পের হাত-পা বাঁধা থাকলেও মুখ বাঁধা নেই; তিনি অদ্ভুতভাবে অজ্ঞ এবং বেপরোয়া।
উল্লেখ্য, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল জোটের অপ্ররোচিত আগ্রাসনের পর থেকে ইরান ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪’-এর অধীনে প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়ে আসছে। ইরানের দাবি, এ পর্যন্ত তারা মোট ১৫০টির বেশি শত্রু ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
এ পর্যন্ত ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ৯৩ দফা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যা অধিকৃত অঞ্চলে ইসরায়েলি সামরিক স্থাপনা এবং পশ্চিম এশিয়া জুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও সম্পদকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছে।
১৯ মার্চ, ইরান দাবি করে যে তারা প্রথমবারের মতো মার্কিন বিমানবাহিনীর অন্যতম আধুনিক যুদ্ধবিমান F-35 Lightning II-কে মধ্য ইরানে ‘মাজিদ’ ইনফ্রারেড-নির্দেশিত সিস্টেম ব্যবহার করে সফলভাবে লক্ষ্যবস্তু করতে সক্ষম হয়েছে।
প্রায় দুই দশক ধরে F-35 প্রকল্পটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আধিপত্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল—একটি বহুল ব্যয়বহুল, পঞ্চম প্রজন্মের প্ল্যাটফর্ম, যা বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও ভেদ করার জন্য তৈরি।
গত এক মাসে F-সিরিজের অন্যান্য যুদ্ধবিমানও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে দাবি করা হয়—যার মধ্যে রয়েছে F-15, F-16 এবং F-18। এসব বিমান ইরানের উন্নত সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করা হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, যা সাম্প্রতিক সংঘাতের পর আরও উন্নত হয়েছে।
ইরান আরও দাবি করেছে, তারা এক ডজনেরও বেশি MQ-9 Reaper ড্রোন ধ্বংস করেছে, যার প্রতিটির মূল্য প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার এবং যা মার্কিন নজরদারি ও আক্রমণ অভিযানের অন্যতম প্রধান অংশ।
শুক্রবার পর্যন্ত, আইআরজিসি জানিয়েছে যে যৌথ আকাশ প্রতিরক্ষা সদর দপ্তরের সমন্বিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ভূপাতিত ড্রোনের সংখ্যা ১৫০ অতিক্রম করেছে।#
পার্সটুডে/এমএআর/৪