প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের বিপদে-আপদে সহায়তা করে আসছে ইরান
১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লব বিজয়ের পর থেকেই ইরান বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও জনপদের নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। ইরানের এ ভূমিকার সাথে বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে পরিচিতি করার লক্ষ্যে ‘আইআরআইবি ফ্যান ক্লাব, কিশোরগঞ্জ’ বিশেষ প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল। ওই প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পাশাপাশি মানসম্মত লেখাগুলো ধারাবাহিকভাবে পার্সটুডে ডটকমে প্রকাশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আজ প্রকাশিত হলো প্রতিযোগিতায় যৌথভাবে তৃতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ঢাকার প্রতিযোগী মাহমুদুল হাসানের লেখা।
ইসলাম সর্বদা ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দেয়। নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামে অন্যতম ইবাদাত। ইরান ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণার পর হতেই এ দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের বিপদে-আপদে সহায়তা করে আসছে।
আফগানি মজলুম জনতার পাশে: ৯/১১ এর টুইন টাওয়ারে হামলা মিথ্যা অজুহাতে তালেবানদের উৎখাত করার জন্য ২০০১ সালের অক্টোবরে আফগানিস্তানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। প্রায় ২০ বছরে ৭৭৮ বিলিয়ন ডলার মার্কিন ডলার ব্যয় করে হাজারো নারী-পুরুষকে হত্যার পাশাপাশি প্রায় ৩৫ হাজার শিশুকে হত্যা করে সার্বিকভাবেই দেশটাকে পঙ্গু করে দিয়েছিল। তাদের অবসানে তালেবানরা পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণ করে। জাতিসংঘের খাদ্য কমসূচির জরিপ অনুসারে, শতকরা ৫০ ভাগ মানুষ একবেলা খাদ্য খাচ্ছে। যখন সব রাষ্ট্রই চুপ করে পর্যবেক্ষণ করছে। ঠিক তখনি ইরান মানবিক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসে। আফগানিস্তানে প্রথম চালানে ওষুধ, চিকিৎসা সামগ্রীর পাশাপাশি খাদ্যও পাঠায়। দ্বিতীয় চালানে চাল, তেল এবং অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য পাঠায়।
লেবাননের পাশে: ৪ঠা আগস্ট, ২০২০ সালে লেবাননের বৈরুতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে প্রায় ১৫০ জন নিহত এবং ৫,০০০ আহত হয়। ঘরবাড়িহারা মানুষ তিন লাখের মতো। ভয়াবহ এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা চেয়েছিল লেবানন। এই পরিস্থিতে মজলুম জনতার পাশে দাঁড়ায় ইরান। তারা তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ১৫ টন খাদ্য সামগ্রীর ব্যবস্থা করে। যার মধ্যে ছিল শুকনো খেজুর, ভাত, এবং টোনা মাছ ও মটরশুঁটির ক্যান। সুবিধার জন্য প্রতি প্যাকেটে চামচ এবং গ্লাসও দেয়া হয়। ইরান বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে বৈরুতে এক সপ্তাহের কম সময়েই আহতের চিকিৎসা সেবা দেয়ার জন্য ফিল্ড হাসপাতাল খুলে। জরুরী বিভাগ, অপারেশন থিয়েটার, আইসিউ এবং সাধারণ ওয়াড থেকে মানুষের সেবা দেয়া হয়।
কাতারের জনগণের পাশে: ৫ই জুন, ২০১৭ সালে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং মিশর কাতারের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেয়। সেইসব দেশগুলো কাতারের জন্য স্থল, সমুদ্র ও আকাশসীমাও বন্ধ করে দেয়। কাতারের কাছে তাদের দাবি ছিল- আল জাজিরা নেটওয়ার্ক বন্ধ, মুসলিম ব্রাদারহুড, হামাস, অন্যান্য ইসলামপন্থী সংগঠন এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান- এ ধরণের সব গোষ্ঠীর সঙ্গে সব ধরণের সম্পর্কচ্ছেদ করা। আর এ সময়ে মুসলিম বিশ্বে চলছিল সিয়াম সাধনার মাস রামাদান। চরম আপদকালীন মুহূর্তে ইরান কাতারের পাশে দাঁড়ায়েছিল। সৌদি আরব ও তার মিত্র দেশগুলো যখন কাতারের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করে তখন নিজের আকাশসীমা উন্মুক্ত করে দিয়েছিল ইরান। কাতারের জনসাধারণের জন্য ওষুধ এবং খাদ্য সংগ্রহের একমাত্র পথটি ছিল ইরান। ইরান প্রতিদিন অবরুদ্ধ কাতারে ১,১০০ টন খাদ্য পাঠাচ্ছিল। এসব খাদ্যের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল তাজা শাকসবজি এবং ফলমূল। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বেশকয়েকটি বন্দর থেকে এসব খাদ্য কাতারে সরবরাহ করা হচ্ছিল। ইরানের পাশাপাশি তুরস্ক এবং পাকিস্তানও কাতারের সহযোগিতা এগিয়ে আসে। এই অবরোধ প্রায় সাড়ে তিন বছর চললেও কাতারকে টলাতে পারেনি। ইরানের ওষধ এবং খাদ্য সহায়তা এবং তুরস্কের সামরিক সহায়তায় সৌদি জোট বেকায়দায় পড়ে ট্রাম্পের জামাইয়ের মাধ্যমে অবরোধ তুলে নিতে বাধ্য হয়।
দক্ষিণ লেবাননীদের পাশে: ১৯৪৮ সালে ইসরাইল অবৈধ প্রতিষ্ঠার পর হতেই মধ্যপ্রাচ্য অনেকটাই ইসরাইলের অধীনস্থ হয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে সূচনাতেই তারা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে আগ্রাসন চালানো শুরু করে। ইসরাইল ১৯৮২ সালে ব্যাপক হামলা, তাণ্ডবলীলা চালিয়ে লেবাননের দক্ষিণ অঞ্চল দখল করে নিয়েছিল। তাদের টার্গেট ছিল পুরো লেবানন দখল করা। কিন্তু ইরানের সহযোগীতায় হিজবুল্লাহর ব্যাপক প্রতিরোধের কারণে ২০০০ সালের ২৫ মে ইসরাইল পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এরপরও ইসরাইল ২০০৬ সালে লেবাননের বিরুদ্ধে ৩৩ দিনের যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল। এ যুদ্ধে হিজবুল্লাহকে সর্বাত্মকভাবে ইরান সহযোগিতা করে। ফলশ্রুতিতে দক্ষিণ লেবাননের আমজনতা ইসরাইলি আগ্রাসন হতে মুক্ত হতে পারে। এই যুদ্ধকে উইকিপিডিয়া ‘ইরান-ইসরাইল প্রক্সি সংঘাতের প্রথম পর্ব’ হিসেবে উল্লেখ্য করেছে।
ফিলিস্তিনি মজলুম জনতার পাশে: ১৯৪৮ সালে অবৈধভাবে ফিলিস্তিনের ভু-খণ্ডে ইসরাইলের প্রতিষ্ঠা। ইহুদিবাদী ইসরাইলের আগ্রাসনের প্রধান স্বীকার ফিলিস্তিন। ভূমিদখল, হত্যা নির্যাতন, বসতবাড়ি হতে উৎখাত, নিপীড়নসহ সামান্য ছোটখাট অজুহাতে অভিযান চালায়। ইরান সবসময় এই নিপীড়নে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে সেই সাথে সব রকমের সহায়তা। ২০১৪ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় প্রায় ১০০ টন মানবিক সহায়তা পাঠিয়েছিল। যার মধ্যে ৩৫ টন ওষুধ ও মেডিক্যাল সামগ্রী। এছাড়া তাবু, কম্বল ও টিনজাত খাদ্য ছিল। ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি আগ্রাসন প্রতিরোধে হামাস যোদ্ধাদের অস্ত্র, প্রযুক্তি ও অর্থ সহায়তা দেয়ায় ইরানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন হামাসের রাজনৈতিক প্রধান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইসমাইল হানিয়া। তিনি বলেছেন, ‘ফিলিস্তিনিদের বিজয়ে ইরান সবচেয়ে বড় অংশীদার’।
ভারতের মাজলুম জনতার প্রতি সহানুভূতি: ভারতের কট্টর, উগ্র হিন্দুবাদী সংগঠন এবং তাদের কর্মীদের হাতে বরাবরই সংখ্যালঘু মুসলমানরা নির্যাতিত হয়ে আসছে। ভারতের মুসলমানদের ওপর উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের পরিকল্পিত গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ। এই প্রতিবাদে ইরানে বিক্ষোভ করে ইরানের সাধারণ জনতা। তাদের শ্লোগান ছিল-“বিশ্বের যেখানেই মানুষের উপরে জুলুম নির্যাতন হবে সেখানে প্রতিবাদ করা আমাদের দায়িত্ব।” ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেছেন, "ভারতে মুসলমানদের হত্যা করার কারণে গোটা মুসলিম বিশ্বের হৃদয় আহত হয়েছে। উগ্র হিন্দুদের ভারত সরকারকে রুখে দাঁড়াতে হবে এবং মুসলমান হত্যা বন্ধের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বে তাদের একঘরে হয়ে পড়া ঠেকাতে হবে।"
মাহমুদুল হাসান
বাসা-০৩, রোড-০৫, ব্লক-ধ,
মিরপুর-১২, পল্লবী, ঢাকা।
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/৭
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।