ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ ক্রমেই অপরাজেয় ও দুর্বার হয়ে উঠছে : ইসরাইলি মিডিয়া
জেনিনে ইসরাইলের শোচনীয় ব্যর্থতার নানা রহস্য
অধিকৃত ফিলিস্তিনের জেনিন আবারও বিশ্বের সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রধান খবর ও শিরোনামে পরিণত হয়েছে। আধা বর্গকিলোমিটারের এই মহল্লাটি মূলত অধিকৃত পশ্চিম তীরের একটি শরণার্থী শিবির। কিন্তু ইসরাইল এখানে আবারও ফিলিস্তিনিদের হাতে বড় ধরনের চপেটাঘাত খেয়েছে।
প্রায় একুশ বছর আগে ২০০২ সনে এখানে সর্বশক্তি নিয়ে হামলা চালিয়েছিল ইসরাইল। ইসরাইলের সেই অভিযানে প্রায় ৫০ জন ফিলিস্তিনি শহীদ হলেও ২৫ জন ইসরাইলি হানাদার সেনাও নিহত হয়েছিল।
ইসরাইল এবারও এখানে হাজার হাজার সেনা, পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী নিয়ে স্থল ও আকাশ পথে (গত ৩ জুলাই, সোমবার ভোররাতে) অভিযান শুরু করে। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের বীরত্বপূর্ণ প্রবল প্রতিরোধের মুখে দুই দিনেরও কম সময়ে এই অভিযান থামাতে এবং সেখান থেকে সব ইসরাইলি সেনাকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে তেলআবিব। বেশ কয়েকজন ইসরাইলি সেনা এই অভিযানে হতাহত এবং ইসরাইলের বেশ কয়েকটি সাঁজোয়া যান ও ড্রোনও ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের হাতে ধ্বংস হয়েছে।
এ ছাড়াও তেলআবিবে এক ফিলিস্তিনি যুবকের শাহাদাত-পিয়াসী হামলায় অন্তত তিন ইসরাইলি নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। জেনিন যেন ইসরাইলের জন্য লেনিনগ্রাড এবং কোনো কোনো আরব বিশ্লেষক এই শহরকে 'জেনিনগ্রাড' বলে উল্লেখ করেছেন!
ইসরাইলের এই অভিযান পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের নানা ফাঁদ ও তাদের প্রতিরোধের কৌশল সম্পর্কে যথাযথ গোয়েন্দা তথ্য না থাকার কারণে। ইসরাইল এখানে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের অবকাঠামোগুলো ধ্বংস করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং প্রতিরোধ যোদ্ধার খুব দক্ষতার সঙ্গে নানা গোপন সুড়ঙ্গ পথ ব্যবহার করেছেন।
সম্প্রতি জেনিন থেকে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধারা প্রথমবারের মত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল অবৈধ ইসরাইলি বসতি লক্ষ্য করে। ফিলিস্তিনিরা এখানে ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াও নানা ধরনের অস্ত্রের কারখানা চালু করেছে বলে ইসরাইল আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। জেনিনের জনসংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। এ অঞ্চলসহ অধিকৃত ফিলিস্তিনের প্রায় সব অঞ্চলে ফিলিস্তিনি তরুণ ও যুব সমাজের প্রায় সবাই আজকাল সশস্ত্র প্রতিরোধের সমর্থক এবং এদের ওপর আপোসকামী মাহমুদ আব্বাস ও তার দল ফাতাহ'র কোনো প্রভাব নেই বললেই চলে।
জেনিনের বীরত্বের ঐতিহ্য কেবল সাম্প্রতিক কয়েক দশকের নয়। ১৯৪৮ সালের যুদ্ধেও সন্ত্রাসী ইসরাইলি সেনারা ফিলিস্তিনের যে এলাকাটি দখল করতে ব্যর্থ হয়েছিল তা ছিল জেনিন। ইসলামী ইরানের মদদপুষ্ট ফিলিস্তিনের সংগ্রামী দলগুলো সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ইরানের উৎসাহে ও পরামর্শে জেনিনকে সশস্ত্র করে এই এলাকাটিকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে নতুন গাজা বা দক্ষিণ লেবাননের মত প্রতিরোধের দুর্গ বা কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। কারণ এখান থেকে তেলআবিবসহ ইসরাইলের অনেক অবৈধ ইহুদি বসতি কাছে হওয়ায় ভবিষ্যৎ যুদ্ধে হামলা চালানো সহজ হবে ফিলিস্তিনিদের জন্য।
ঘরোয়া রাজনৈতিক সংকটে জর্জরিত দুর্নীতিবাজ নেতানিয়াহুর উগ্র ইসরাইলি মন্ত্রীসভা ভেবেছিল জেনিনে হামলা চালিয়ে ইসরাইলি জনগণের দৃষ্টিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে সক্ষম হবে। কিন্তু জেনিনে ইসরাইলি বাহিনীর শোচনীয় ব্যর্থতার কারণে হতভম্ব নেতানিয়াহু আবারও অন্য কোথাও সামরিক অভিযানের পদক্ষেপ নিতে পারে।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ও পত্র-পত্রিকাগুলো জেনিনে ইসরাইলি ব্যর্থতা নিয়ে নেতানিয়াহুর কঠোর সমালোচনামূলক নানা মন্তব্য প্রচার করেছে। ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ ক্রমেই অপরাজেয় ও দুর্বার হয়ে উঠছে বলে এইসব ইসরাইলি মিডিয়া উল্লেখ করছে।
জেনিনে ইসরাইলের পরাজয় ও শোচনীয় ব্যর্থতা ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের বহু গুণ মনোবল বাড়িয়ে দিয়েছে এবং ভবিষ্যত প্রতিরোধ অভিযানগুলোতে এর ব্যাপক প্রভাব থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রতিরোধ সংগঠনগুলো এরিমধ্যে ফিলিস্তিনি জনগণকে জেনিন যুদ্ধে সাফল্যের জন্য শুভেচ্ছা জানিয়েছে এবং ফিলিস্তিনি জনগণ নানা অঞ্চলে বিজয় মিছিল বা শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে আনন্দ উল্লাস প্রকাশ করেছে। #
পার্সটুডে/এমএএইচ/০৬
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।