পাশ্চাত্যের ভণ্ডামির প্রতি সারাবিশ্ব অন্ধ নয়: মাহাথির
গাজায় ইসরাইলের অব্যাহত নির্বিচার হামলা ও বিশ্ব-সমাজের অকার্যকর ভূমিকা
অবরুদ্ধ গাজায় বেসামরিক অবস্থানে ইসরাইলের অব্যাহত নির্বিচার আগ্রাসন ও এর ফলে সৃষ্ট মানবীয় বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে মিশরের রাজধানী কায়রোয় আয়োজিত আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলন কোনো যৌথ বিবৃতি ছাড়াই শেষ হয়েছে।
এ সম্মেলনে উপস্থিত আরব নেতৃবৃন্দে নির্বিচার ইসরাইলি বোমা বর্ষণের নিন্দা জানালেও ইউরোপিয় নেতৃবৃন্দ ইসরাইলের নিন্দা না জানিয়েই বলেছেন, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকা উচিত। এই সম্মেলনের আয়োজক মিশর ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য দশকের পর দশক ধরে চালানো প্রচেষ্টার পথে ইসরাইলি বাধার নিষ্পত্তি করতে এ বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। উল্লেখ্য এ বৈঠকে ইহুদিবাদী ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত হয়নি। আরব নেতৃবৃন্দ ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলের কয়েক দশকের সহিংসতার অবসান ঘটানোর আহ্বান জানালেও বাস্তবে এ ধরনের বিবৃতি বা নিন্দাবাদ ইসরাইলি আগ্রাসনের তীব্রতা কমাতে তেমন কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখে না।
এদিকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম গাজায় উদ্ভূত পরিস্থিতিকে ‘উন্মাদ' বলে নিন্দা করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে- পাশ্চাত্যের ‘ভণ্ডামি’র প্রতি সারাবিশ্ব অন্ধ নয় কারণ তারা বারবার ইসরাইলি আগ্রাসনের নিন্দা করতে ব্যর্থ হয়েছে। শুক্রবার রিয়াদে জিসিসি-আসিয়ান সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরব নিউজের সাথে এক কথোপকথনে আনোয়ার ইব্রাহিম এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘বিরোধ ও ভণ্ডামি’ উন্মোচিত করেছে। তিনি বলেন, ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার আগ্রাসন উল্লেখ করে পাশ্চাত্য এর নিন্দা করে কিন্তু ফিলিস্তিনিদের বৈধ জমি দখল করে নেয়ার বিষয়ে ইসরাইলি আগ্রাসনকে তারা প্রত্যাখ্যান করে এবং ‘শুধু তাই নয় এই আগ্রাসনকে সমর্থন ও রক্ষা করা হয়।’তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আমাদেরকে অবশ্যই জেগে উঠতে হবে, এ ধরনের ‘ভণ্ডামি’ চলতে পারে না। এর আগে হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে চলমান সংঘাতে মালয়েশিয়া হামাসের পাশে আছে এবং পাশ্চাত্যের কাছে মাথা নত করবে না বলে জানান আনোয়ার ইব্রাহিম।
আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, তিনি ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের নিন্দায় পশ্চিমা চাপের সাথে একমত নন। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টকে বলেন, মালয়েশিয়ার নীতি হিসেবে হামাসের সাথে সম্পর্ক রয়েছে এবং তা অব্যাহত থাকবে।
এটা স্পষ্ট ফিলিস্তিনের মজলুম জনগণের পক্ষে এবং ইসরাইলি নৃশংসতার নিন্দায় বিশ্ববাসী সোচ্চার হওয়া সত্ত্বেও জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অকার্যকর ও অপর্যাপ্ত পদক্ষেপের কারণে ইসরাইল তার সন্ত্রাসী ও অমানবিক হামলা অব্যাহত রাখার সাহস পাচ্ছে। তাই আরব লীগ ও ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার উচিত ইসরাইল এবং তার প্রধান সহযোগী মার্কিন সরকারসহ ইসরাইলের প্রকাশ্য দোসর হিসেবে সক্রিয় দেশগুলোর ওপর তেল-নিষেধাজ্ঞাসহ নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যাতে ইসরাইল গাজাসহ ফিলিস্তিনের নানা অঞ্চলে নির্বিচার হামলা বন্ধ করতে বাধ্য হয় ও গাজায় ত্রাণ তৎপরতা চালানো সহজ হয়। এর পাশাপাশি ইসরাইলি পণ্য বর্জন আন্দোলন জোরদারের এবং প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোর প্রতি সর্বাত্মক সহায়তা দেয়ার পদক্ষেপও নেয়া জরুরি। কারণ ইসরাইল শুধু শক্তির ভাষাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানও ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের বিষয়ে পশ্চিমা কপট নীতি এবং ইসরাইলের প্রতি পাশ্চাত্যের অন্ধ সমর্থনের নীতির তীব্র নিন্দা জানিয়ে আসছে। ইসলামী ইরান ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ নিতে আরব ও মুসলিম দেশগুলোর প্রতিও আহ্বান জানিয়ে আসছে এবং এ বিষয়ে মুসলিম দেশগুলোর দুর্বল ভূমিকার সমালোচনা করে আসছে। ইরান তেলকে ইসরাইল ও তার বন্ধুদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের আহ্বান জানাচ্ছে। দুঃখজনক বিষয় হল তুরস্ক, সৌদি আরব, জর্দান ও মিশরও গাজাবাসী এবং ফিলিস্তিনিদের সহযোগিতায় তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না, অথচ এইসব দেশের সরকারগুলো জনগণের ইচ্ছার বিপরীতে ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে, যদিও সৌদি সরকার প্রকাশ্যে ইসরাইলে সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার বা সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ঘোষণা এখনও দেয়নি।
ইসলামী ইরান ফিলিস্তিনিদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সামরিক ও রাজনৈতিক সহায়তা দিয়ে থাকে। গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে সেখানে এরিমধ্যে ত্রাণবাহী বিমান পাঠিয়েছে ইরান।
উল্লেখ্য খাদ্য, পানি, ওষুধ ও জ্বালানীসহ ইসরাইলের সব ধরনের নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি গাজার বিভিন্ন অংশে ১৬ দিন ধরে চলছে পৈশাচিক ইসরাইলি গণহত্যা অভিযান। বেসামরিক ঘরবাড়ি, মসজিদ, হাসপাতাল ও এমনকি জাতিসংঘের পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও ইসরাইলের নির্বিচার বোমা বর্ষণ থেকে রেহাই পাচ্ছে না। ফলে এ পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার শিশু ও এক হাজার নারীসহ সাড়ে চার হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি শহীদ হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৪ হাজারেরও বেশি। হামাসের সঙ্গে সংঘাত শুরুর আগেও গত প্রায় ১৭ বছর ধরে গাজার ওপর দিয়ে রাখা হয়েছে আন্তর্জাতিক সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা। বেশির ভাগ সময় কেবল চোরাই পথেই গাজায় নানা জরুরি সামগ্রী এসে থাকে। অনেকেই তাই গাজাকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় খোলা কারাগার বলে উল্লেখ করে থাকেন। #
পার্সটুডে/২২
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।