যুদ্ধ কীভাবে গাজার শিশুদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে?
https://parstoday.ir/bn/news/west_asia-i155482-যুদ্ধ_কীভাবে_গাজার_শিশুদের_ভবিষ্যৎ_ধ্বংস_করছে
পার্সটুডে: গাজার শিশুদের অবস্থা স্পষ্টভাবে এক মানবিক বিপর্যয় ও প্রাতিষ্ঠানিক গণহত্যার চিত্র তুলে ধরে; যেখানে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষত একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে।
(last modified 2025-12-25T14:41:59+00:00 )
ডিসেম্বর ২৫, ২০২৫ ২০:৩৯ Asia/Dhaka
  • গাজা
    গাজা

পার্সটুডে: গাজার শিশুদের অবস্থা স্পষ্টভাবে এক মানবিক বিপর্যয় ও প্রাতিষ্ঠানিক গণহত্যার চিত্র তুলে ধরে; যেখানে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষত একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে।

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে গাজা উপত্যকা ইহুদিবাদী ইসরায়েলের সহিংসতা ও অবরোধের সরাসরি চাপে রয়েছে। এই অঞ্চলের শিশুরা পরিকল্পিতভাবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহিংসতার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধজনিত শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক ক্ষতি এতটাই বিস্তৃত ও নজিরবিহীন যে, তা একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলেছে। ২০২৩ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত গাজায় ৬৪ হাজারের বেশি শিশু হতাহত হয়েছে; যাদের অনেকেই ঘরবাড়ি ও স্কুলে বোমা হামলার শিকার।

মেহর নিউজের বরাত দিয়ে পার্সটুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পরিসংখ্যান কেবল সংকটের শারীরিক দিকটিই তুলে ধরে। মৃত্যুভয়ের পাশাপাশি শিশুরা বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য ও চিকিৎসার মতো মৌলিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক সংকটে পড়েছে। গাজার ১৬ লাখেরও বেশি মানুষ, যার মধ্যে ১০ লাখের বেশি শিশু, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত; এমন অবস্থা যা সংক্রামক রোগ ও প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর হার বাড়িয়েছে।

শিক্ষা ব্যবস্থার ধ্বংস ও শিক্ষাবঞ্চনা

যুদ্ধের সরাসরি ফল হিসেবে গাজার শিক্ষা ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। অধিকাংশ স্কুল পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে অথবা বাস্তুচ্যুত মানুষের অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৯৫ শতাংশের বেশি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে এবং ৬ লাখ ২৫ হাজারের বেশি শিশু আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে চলে গেছে। শিক্ষাবঞ্চনার শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার দীর্ঘমেয়াদী ও সুদূরপ্রসারী পরিণতি রয়েছে। শিক্ষা ছাড়া শিশুরা বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক ও মানসিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়ে এবং পরবর্তী প্রজন্মে দারিদ্র্য ও সহিংসতার চক্র শক্তিশালী হয়।

খাদ্য সংকট ও অপুষ্টি

বিশেষ করে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় পূর্ণ অবরোধ খাদ্য, শিশুদের দুধ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ উপকরণে প্রবেশাধিকার মারাত্মকভাবে সীমিত করেছে। ইউনিসেফের মতে, ৯৩ শতাংশের বেশি শিশু তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার মুখে এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী দশ হাজারেরও বেশি শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। এই বয়সে অপুষ্টির গুরুতর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রয়েছে; মস্তিষ্কের বিকাশে ব্যাঘাত, শিক্ষা ক্ষমতা ২০% পর্যন্ত হ্রাস, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হওয়া এবং ভবিষ্যতে দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি বাড়ানো এর কিছু প্রভাব। ক্ষুধাকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও জেনেভা কনভেনশনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন; যার প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকবে।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিপর্যয়

যুদ্ধের আগেই গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চরম চাপে ছিল; ইসরায়েলের সরাসরি হামলায় এখন ৭০ শতাংশের বেশি চিকিৎসাকেন্দ্র সেবা দেওয়ার বাইরে চলে গেছে। ফলে শিশুদের মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, হেপাটাইটিস ও চর্মরোগের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগের ঝুঁকি বেড়েছে। নবজাতকের মৃত্যুহার বৃদ্ধি, জন্মগত ত্রুটি নিয়ে শিশুর জন্ম এবং টিকাদান থেকে বঞ্চিত হওয়াও এই ধসের অংশ। এই অবস্থা শুধু বর্তমান প্রজন্মকে নয়, ভবিষ্যৎ সমাজের ওপরও রোগ ও অক্ষমতার ভার চাপিয়ে দিচ্ছে।

ব্যাপক গৃহহীনতা

গাজায় ঘরবাড়ি ধ্বংসের ফলে এক মিলিয়নের বেশি শিশু গৃহহীন হয়েছে। পাঁচ লক্ষাধিক শিশু অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করছে, যেখানে নিরাপত্তা, উষ্ণতা ও ন্যূনতম সুবিধা নেই।

শারীরিক আঘাত ও স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা

ইসরায়েলি হামলায় ৫০ হাজারের বেশি শিশু নিহত বা আহত হয়েছে এবং প্রায় ৪০ হাজার শিশু গুরুতর আঘাত ও স্থায়ী প্রতিবন্ধকতায় ভুগছে। এসব ক্ষতি কেবল শারীরিক যন্ত্রণায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং ফিলিস্তিনি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সামাজিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে। বহু পরিবার প্রতিবন্ধী শিশুদের যত্ন নিতে অক্ষম, আর চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সম্পদের অভাবে পুনর্বাসন সেবা কার্যত অসম্ভব।

শিশুদের মানসিক সংকট

গাজার সব শিশুই মানসিক সহায়তা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন অনুভব করছে। ইউনিসেফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অঞ্চলের ১০০ শতাংশ শিশু যুদ্ধজনিত মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ, বিষণ্নতা, দুঃস্বপ্ন ও আচরণগত সমস্যাগুলো প্রাপ্তবয়স্ক বয়স পর্যন্ত বহাল থাকতে পারে।

আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করা, খাদ্য অবরোধ আরোপ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করা স্পষ্টতই মানবিক আইন ও জেনেভা কনভেনশনের লঙ্ঘন, যা যুদ্ধাপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর প্রতিক্রিয়া ছাড়া এই পরিস্থিতির ধারাবাহিকতা কেবল বর্তমান শিশু প্রজন্মের জীবনই নয়, বরং ফিলিস্তিনি সমাজের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে বহু দশকের জন্য দুর্বল করে দেবে।

গাজার সংকট কোনো সাময়িক মানবিক সমস্যা নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করার উদাহরণ। শিশুদের অধিকার রক্ষা, শিক্ষা ও চিকিৎসায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং সহিংসতা ও অবরোধের নীতি বন্ধ করাই জরুরি—যাতে এই প্রজন্ম ইতিহাসের বিস্মৃত শিকারে পরিণত না হয়। গাজার শিশুরা নিপীড়ন ও দৃঢ়তার প্রতীক; তাদের সংকট আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ও শিশুর অধিকারের পক্ষে বৈশ্বিক প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত।#

পার্সটুডে/এমএআর/২৫