যুদ্ধ না সংলাপ? ইরানকে ঘিরে আরব দেশগুলোর তীব্র মতবিরোধ
পার্সটুডে: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মধ্যে এখনও গভীর মতপার্থক্য রয়েছে।
পার্সটুডের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধকে ঘিরে স্পষ্ট বিভাজন তৈরি হয়েছে। এটি কেবল কূটনৈতিক মতভেদ নয়; বরং প্রতিটি দেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কৌশলগত অগ্রাধিকারের ভিন্ন ভিন্ন মূল্যায়নের প্রতিফলন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা এই যুদ্ধ পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
একদিকে রয়েছে সৌদি আরব, কাতার ও ওমান, যারা সংলাপ ও উত্তেজনা প্রশমনের মাধ্যমে সংকট সমাধানের পক্ষে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েত ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান ও সামরিক চাপ বৃদ্ধির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
সংলাপপন্থী দেশগুলোর অবস্থান
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব, কাতার ও ওমান বিশ্বাস করে যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তার সবচেয়ে বড় মূল্য তাদের অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে দিতে হবে। এই দেশগুলোর অর্থনীতি মূলত জ্বালানি রপ্তানি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। ফলে তারা আশঙ্কা করছে, যুদ্ধ চলতে থাকলে সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হবে, বীমা ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাবে এবং তাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে যুদ্ধের সূচনা ও ধারাবাহিকতায় ভূমিকা রেখেছে, তবুও তারা এখন সরাসরি সংঘাতের প্রথম সারিতে অবস্থান করছে।
সৌদি আরব, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেছিল, প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তেজনা আবার পূর্ণমাত্রায় ফিরে যাক—এটি চায় না। প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, সৌদি আরব হরমুজ প্রণালি জোরপূর্বক খুলে দেওয়ার মার্কিন পরিকল্পনারও বিরোধিতা করেছে। কারণ দেশটি মনে করে, দীর্ঘমেয়াদে তাদের জাতীয় স্বার্থ সামরিক সংঘাত নয়, বরং স্থিতিশীলতা ও উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই নিহিত।
কাতারও তার ঐতিহ্যগত মধ্যস্থতাকারী পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে এবং এ বিষয়ে সৌদি আরব ও ওমানের সঙ্গে সমন্বয় রেখে চলছে।অন্যদিকে, ওমান দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক সংলাপ ও উত্তেজনা প্রশমনের অন্যতম প্রবক্তা। দেশটি এখনও বিশ্বাস করে, টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একমাত্র পথ হলো আলোচনা ও রাজনৈতিক সমাধান।
কঠোর অবস্থানের পক্ষে দেশগুলো
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েত সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করেছে। বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা এবং ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশগ্রহণের কারণে এসব দেশ ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই দেশগুলোর ধারণা, বাস্তব সামরিক চাপ ছাড়া ইরান তার বর্তমান নীতি পরিবর্তন করবে না। তাই তারা ওয়াশিংটনকে আরও কঠোর ও দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত আন্তর্জাতিক জোট গঠনের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি জোরপূর্বক খুলে দেওয়ার উদ্যোগকে সমর্থন করছে এবং এ ধরনের যেকোনো অভিযানে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতিও প্রকাশ করেছে।
বাহরাইন ও কুয়েতের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, দেশ দুটিতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকায় তারা সরাসরি ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে এসব দেশের সামরিক সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ইরানের পাল্টা হামলা তাদের অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তার ওপর আরও বড় প্রভাব ফেলবে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, এসব দেশ মনে করে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা করা মানে আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইরানের শক্তিশালী অবস্থানকে আরও সুসংহত করা।
মতপার্থক্যের মূল কারণ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিভক্তির মূল কারণ ভিন্ন কৌশলগত হিসাব-নিকাশ। সংলাপপন্থী দেশগুলো মনে করে, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা কেবল কূটনৈতিক সমাধানের মাধ্যমেই সম্ভব এবং সামরিক সংঘাতের অর্থনৈতিক মূল্য অত্যন্ত বেশি। অন্যদিকে, কঠোর অবস্থানের পক্ষের দেশগুলো বিশ্বাস করে, ইরানের প্রতি নমনীয়তা দেখানো হলে ভবিষ্যতে তাদের আরও বড় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই দেশগুলো বর্তমান সংকট সৃষ্টিতে নিজেদের ভূমিকাকে গুরুত্ব না দিয়ে শুধুমাত্র ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করছে।
উপসংহার
প্রতিবেদনের মতে, এই বিভাজনের ফলে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (GCC)-এর মধ্যে একটি অভিন্ন অবস্থান গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়েছে এবং পুরো অঞ্চল একটি নাজুক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে।
যেখানে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েত যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদারের দিকে এগোচ্ছে, সেখানে সৌদি আরব, কাতার ও ওমান সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে কূটনৈতিক সমাধানের পথকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই মতপার্থক্য শুধু উপসাগরীয় দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ককেই প্রভাবিত করছে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নীতির জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো সামরিক বা কূটনৈতিক পদক্ষেপে ওয়াশিংটনের জন্য আরব মিত্রদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদনের শেষাংশে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে অঞ্চলের পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে—উত্তেজনা প্রশমন নাকি সামরিক চাপ—এই দুই কৌশলের মধ্যে কোনটি আরব দেশগুলো এবং তাদের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে প্রশ্ন রয়ে গেছে, বর্তমান সংঘাত থেকে বেরিয়ে এসে কীভাবে একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
বিশ্লেষণের উপসংহারে বলা হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যদি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হুমকি ও কঠোর নীতির ওপরই জোর দিতে থাকে, তাহলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।#
পার্সটুডে/এমবিএ/০৩
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।