ইয়েমেনে সৌদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা দিতে জাতিসংঘের প্রস্তাব
জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়েমেনের আল-হাদিদা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ তৃতীয় কোনো পক্ষের হাতে ছেড়ে দেয়ার যে প্রস্তাব দিয়েছেন তার সমালোচনা করেছে হুথি আনসারুল্লাহ আন্দোলন। এই আন্দোলন ইসমাইল ওউল্দ শেখ আহমাদের প্রস্তাবকে দায়িত্বজ্ঞানহীন ও ইয়েমেনের কোটি কোটি নাগরিকের প্রতি অসম্মান বলে মন্তব্য করেছে।
আনসারুল্লাহ আন্দোলন বলেছে, ইয়েমেনের চলমান বিপর্যকর পরিস্থিতির মূল হোতা সম্পর্কে শেখ আহমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ভুল। এই আন্দোলনের মতে, সৌদি ভাড়াটে সেনাদের মাধ্যমে হাদিদা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিতে না পেরে এই প্রস্তাব দিয়েছে জাতিসংঘ।
জাতিসংঘের বিশেষ দূত প্রস্তাব দিয়েছিলেন, আনসারুল্লাহ আন্দোলনকে আল-হাদিদা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ তৃতীয় কোনো পক্ষের হাতে ছেড়ে দিতে অথবা জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে দিয়ে দিতে হবে।
এমন সময় এ প্রস্তাব দেয়া হলো যখন ইয়েমেনের জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য ও ওষুধের শতকরা ৮০ ভাগ চালান এই গুরুত্বপূর্ণ বন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। জাতিসংঘের এই প্রস্তাব ইয়েমেনের ওপর সৌদি আরবের গত প্রায় আড়াই বছরের আগ্রাসনকে বৈধতা দেয়ার শামিল। গত কয়েক মাস ধরে আল-হাদিদা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে রিয়াদ। এ কাজে ব্যর্থ হয়ে এখন সৌদি আরব দাবি করছে, এই বন্দর দিয়ে অস্ত্র ও গোলাবারুদ আমদানি করে আনসারুল্লাহ আন্দোলন। এ কারণে বেসামরিক এই বন্দরকে সামরিক আখ্যা দিয়ে এটিকে ধ্বংস করার তৎপরতায় মেতে উঠেছে রিয়াদ।
ইয়েমেনের গণবাহিনীর হাত থেকে হাদিদা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে এবং ন্যাশনাল সালভেশন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই ওই বন্দরকে সামরিক বন্দর হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে রিয়াদ। সৌদি আরব এই বন্দরকে বন্ধ করে দিয়ে ইয়েমেনের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ শক্তিশালী করতে চায়। রিয়াদের আসল উদ্দেশ্য ইয়েমেনের ন্যাশনাল সালভেশন সরকারকে দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ প্রমাণ করে দেশটিতে নিজের তাবেদার সরকারকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা।
আমেরিকার সমর্থন নিয়ে সৌদি আরব ২০১৫ সালের মার্চ মাস থেকে ইয়েমেনের জনগণের ওপর ভয়াবহ আগ্রাসন শুরু করে। বিমান হামলার পাশাপাশি দেশটির ওপর জল, স্থল ও আকাশপথে অবরোধ আরোপ করে রিয়াদ। পদত্যাগকারী প্রেসিডেন্ট আব্দ রাব্বু মানসুর হাদিকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে চালানো এ আগ্রাসনে এখন পর্যন্ত অন্তত ১১,০০০ মানুষ নিহত ও হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছে।
ইয়েমেনের ওপর সৌদি আগ্রাসনকে রিয়াদের সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবের আলোকে বিশ্লেষণ করতে হবে। সৌদি আরব নিজের দক্ষিণের এই দরিদ্র প্রতিবেশী দেশটিকে গ্রাস করার পরিকল্পনা করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। ওই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এরইমধ্যে ইয়েমেনের আল-আসির, নাজরান ও জিযান প্রদেশ দখলে নিয়েছে রিয়াদ।
পাশাপাশি ইয়েমেনকে টুকরো টুকরো করে দেশটিতে একটি ফেডারেল সরকার প্রতিষ্ঠা করার মার্কিন পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও সহযোগিতা করছে সৌদি আরব। আমেরিকা এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইয়েমেন নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিপণ্ন করে তুলে চায়। সৌদি ও মার্কিন পরিকল্পনার মধ্যেই পদত্যাগী প্রেসিডেন্ট মানসুর হাদি চান জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক বাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে ইয়েমেনের বেশিরভাগ এলাকাকে বর্তমান সরকারের হাত থেকে বের করে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে।
জাতিসংঘ গত আড়াই বছর ধরে ইয়েমেনের ওপর সৌদি আগ্রাসন নীরবে প্রত্যক্ষ করেছে। এতদিনের নীরবতা ভেঙে এই বিশ্ব সংস্থা এবার যে প্রস্তাব দিয়েছে তার উদ্দেশ্য ইয়েমেন সংঘর্ষে সৌদি আরবকে মদদ দেয়া। কিন্তু এর মাধ্যমে সৌদি আগ্রাসনের ফলে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ যে মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে তা উপেক্ষা করেছে জাতিসংঘ। বিশ্ব সংস্থাটির এই ভূমিকার কারণে ইয়েমেনে সত্যিকার অর্থে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে যার জন্য পরবর্তীতে অনুশোচনা করলে তা অনেক দেরি হয়ে যেতে পারে। #
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/৪