ইয়েমেনে আগ্রাসন ও অপরাধযজ্ঞে জাতিসংঘকেও শরিক করার সৌদি ফন্দি!
ইয়েমেনের মজলুম ও দরিদ্র জাতির বিরুদ্ধে অব্যাহত রয়েছে সৌদি-মার্কিন-ইহুদিবাদী অপশক্তিগুলোর নৃশংস ও মানবতা-বিরোধী অপরাধযজ্ঞ। আর এই অপরাধযজ্ঞ অব্যাহত রাখতে মিথ্যা ও অপবাদের বেসাতিও আরও ব্যাপক এবং তীব্র মাত্রায় অব্যাহত রাখছে এই অপশক্তিগুলো।
সর্ব-সাম্প্রতিক অপপ্রচারের অংশ হিসেবে সৌদি সরকার দাবি করছে যে ইয়েমেনের জনপ্রিয় প্রতিরোধ আন্দোলন আনসারুল্লাহ দেশটির হুদাইদা সমুদ্র-বন্দরকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আমদানির কাজে ব্যবহার করছে, আর তাই জাতিসংঘের উচিত এই বন্দরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করা।
এর আগে রিয়াদে ইয়েমেনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর সৌদি ও মার্কিন সরকার কোনো প্রমাণ দেখানো ছাড়াই একযোগে দাবি করেছে যে ইয়েমেনকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিচ্ছে ইরান। গত কয়েক বছরে সৌদি হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে ইয়েমেনিরা মাঝে মধ্যে সৌদি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে আসছে। আর তাই মাঝে মধ্যেই সৌদি সরকার দাবি করছে যে ইরানই ইয়েমেনকে ক্ষেপণাস্ত্র দিচ্ছে। অথচ ইয়েমেনের প্রায় চারদিকেই স্থল, সমুদ্র ও আকাশ-পথে রয়েছে সৌদি আরবের কঠোর অবরোধ।
ইয়েমেনের বিপ্লবী সরকার, সশস্ত্র বাহিনী ও আনসারুল্লাহ বার বার বলে আসছে যে এইসব ক্ষেপণাস্ত্র তাদের অস্ত্র গুদামে আগে থেকেই পড়ে ছিল। তারা কেবল এইসব ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা বৃদ্ধি করেছে নিজস্ব প্রযুক্তি যোগ করে।
সৌদি আগ্রাসনের জবাবে ইয়েমেনের গণ-প্রতিরোধ ও পাল্টা হামলা দিনকে দিন জোরদার হতে থাকায় দিশাহারা সৌদি সরকার তার ব্যর্থতা ঢাকতেই নানা ধরনের অপবাদ প্রচার করছে ইরান ও ইয়েমেনের বিরুদ্ধে। এমনকি ইয়েমেনের ওপর অমানবিক সৌদি অবরোধে জাতিসংঘকেও শরিক করতে চাইছে রিয়াদের স্বৈরতান্ত্রিক রাজ-সরকার যাতে দেশটিতে ধ্বংসাত্মক সৌদি আগ্রাসন আর গণহত্যার মত মানবতা-বিরোধী সব অপরাধকেই বৈধতা দেয়া যায়।
রিয়াদ দাবি করছে যে হুদাইদা বন্দর দিয়ে চোরাচালানের অস্ত্র ও গোলাবারুদ আসছে ইয়েমেনের প্রতিরোধ যোদ্ধাদের কাছে। আর এই দাবি তুলে রিয়াদ হুদাইদা বন্দরকে 'সামরিক অঞ্চল' বলে ঘোষণা করেছে এবং বন্দরটিকে বন্ধ ও এমনকি ধ্বংস করে দেয়ারও চেষ্টা চালাচ্ছে। আসলে রিয়াদের লক্ষ্য হুদাইদা বন্দর অঞ্চলে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যাতে ইয়েমেনের জনগণের ওপর চাপ জোরদার করা যায়।
অথচ হুদাইদা সমুদ্র-বন্দর দিয়ে ইয়েমেনের মজলুম জনগণের কাছে ত্রাণ, খাদ্য আর ওষুধ-সামগ্রীর ৮০ শতাংশই পাঠানো হয়। এ অবস্থায় নানা অজুহাত দেখিয়ে ইয়েমেনের ক্ষুধার্ত, রোগাক্রান্ত ও অপুষ্টির শিকার জনগণকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে এবং বিপ্লবী ইয়েমেনি জাতিকে নতজানু করতে চায় সৌদি-নেতৃত্বাধীন অপশক্তি।
এ অবস্থায় জাতিসংঘ যদি সৌদি আরবের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইয়েমেনের হুদাইদা বন্দরের ওপর অবরোধ আরোপ করে তবে তা হবে ইয়েমেনের ওপর অমানবিক সৌদি অপরাধযজ্ঞ ও অবরোধে জাতিসংঘেরও শরিক হওয়া এবং এইসব অপরাধ অব্যাহত রাখতে সৌদি সরকারকে সবুজ-সংকেত দেয়া।
জাতিসংঘ সম্প্রতি হুদাইদা বন্দরের ওপর নজরদারি ও তল্লাশি জোরদারের সৌদি আবেদনকে নাকচ করে দিয়েছে। যদিও ইয়েমেন বিষয়ে নিযুক্ত জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইসমাইল ওয়ালুদ শেইখ আহমাদ হুদাইদা বন্দরের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের সৌদি প্রস্তাবগুলো মেনে নিতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু বিশ্ব-জনমতের তীব্র প্রতিবাদের মুখে তিনি এ বিষয়ে পিছু হটেছেন এবং এসব প্রস্তাবের ব্যাপারে নীরব হয়ে গেছেন।
ইরাক ও সিরিয়ায় তাকফিরি-ওয়াহাবিদের প্রতিষ্ঠিত করার নানা ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়ার পর এখন সৌদি সরকার ইয়েমেনে কিছু সাফল্য পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। সৌদি রাজপরিবারের কোন্দল ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দেয়াও এর অন্যতম উদ্দেশ্য। ফলে ইয়েমেনের জনগণের ওপর সৌদি গণহত্যা অভিযান শিগগিরই জোরদার হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ নানা ক্ষেত্রে আনাড়ি, মাত্রাতিরিক্ত কঠোর, অদক্ষ ও অল্প-বয়সী যুবরাজ সালমান এখন সৌদি আরবের সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী। ইহুদিবাদী ইসরাইল ও মার্কিন প্রভুদের খুশি করতে মূলত এই অল্প-বয়স্ক সালমানের নেতৃত্বেই ২০১৫ সালের ২৬ মার্চ ইয়েমেনের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয় সৌদি সরকার।
ইয়েমেনের ওপর নির্বিচার সৌদি বিমান হামলায় নিহত হয়েছে হাজার হাজার শিশু ও নারীসহ প্রায় ১৫ হাজার বেসামরিক ইয়েমেনি। দেশটির মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, হাসপাতাল ও কল-কারখানাসহ বেশিরভাগ বেসামরিক অবকাঠামোই ধ্বংস হয়ে গেছে। ক্ষুধা ও অপুষ্টির শিকার ইয়েমেনিদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে কলেরা রোগ এবং তাতে প্রাণ হারাচ্ছে হাজার হাজার ইয়েমেনি।#
পার্সটুডে/এমএএইচ/২৬