মে ২৭, ২০২৪ ১৯:৪৩ Asia/Dhaka
  • ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যাপক: ইহুদি ধর্মকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যাবহার করছে ইহুদিবাদীরা

ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যাপক বলেছেন, ইহুদিবাদীরা ধর্মকে কুক্ষিগত করে এটাকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করছে। তারা ইহুদি ধর্মকে অন্যায় আগ্রাসন ও জুলুম নির্যাতন চালানোর জন্য অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেছে। কারণ ইহুদিবাদী ইসরাইলের প্রথম দিকের নেতা এবং প্রতিষ্ঠাতারা বেশিরভাগই ছিল নাস্তিক এবং কোনো ধর্মে বিশ্বাস করতো না। অন্য কথায়, ইহুদিবাদ এমন একটি ফ্যাসিবাদী আদর্শ যা প্রকৃত ইহুদি ধর্মকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে।

ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যাপক ও সাংবাদিক ইসলাম ওজকান সম্প্রতি ইরানের সংবাদ সংস্থা ইকনার সাথে আলাপকালে ধর্মের ইতিহাসে কুদস শরীফ ও ফিলিস্তিনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন,  কুদসের ইতিহাস জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং পবিত্র ধর্মগ্রন্থগুলোতে এ সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে।

ইসরাইলিরা দুই হাজার বছর আগের ইতিহাসের ঘটনাকে বিকৃতভাবে তুলে ধরে  নিজেদেরকে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের মালিক মনে করে। যদিও কিছু আধুনিক ইহুদিবাদীরা এমন ইতিহাসকে মেনে নিচ্ছে না এবং ইসরাইলের অস্তিত্বকে অপরাধ ও দখলদারিত্বের ফল বলে মনে করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এই একই লোকেরা ইসরাইলের দখলদারিত্বের বিষয়টি স্বীকার করলেও তারা বলে যে যদিও ইসরাইলি শাসকগোষ্ঠী ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে তবে অবৈধভাবে জন্ম নেয়া কোন সন্তানের মতো ইসরাইল নামক রাষ্ট্রেরও বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। আর এইভাবে তারা এই অঞ্চলে ইসরাইলের অস্তিত্বের ন্যায্যতা বা বৈধতা প্রমাণ করার চেষ্টা করে।

ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক আরো বলেছেন,

ফিলিস্তিন ইস্যুটি মুসলমান ও ইহুদি ধর্মের মধ্যকার কোনো বিষয় না। সে কারণে বিভিন্ন ধর্মের ইতিহাসের ভিত্তিতে এটাকে মূল্যায়ন করারও কোনো যৌক্তিকতা নেই। আজ, ফিলিস্তিন একটি রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে এবং তাদের জায়গা জমি দখল করা হয়েছে। যদিও দখলদার শক্তি এটাকে ধর্মীয় ইস্যু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করছে এবং ফিলিস্তিনকে ইহুদিদের জন্য সেই কথিত প্রতিশ্রুত ভূমি হিসেবে ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করছে।

"ফিলিস্তিন ইস্যুকে মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে কীভাবে মূল্যায়ন ও সংজ্ঞায়িত করা উচিত"- এমন এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক ইসলাম ওজকান আরও বলেছেন, আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, ফিলিস্তিনের ভূমি অন্যায়ভাবে দখল করা হয়েছে যা সম্পূর্ণ বেআইনি। ফিলিস্তিনের আদি অধিবাসীরা সেই ভূখন্ডে তাদের বসবাসের অধিকার হারিয়েছে এবং হানাদাররা তাদের ভূমিকে তাদের মাতৃভূমি বলে ঘোষণা করেছে যা কিনা মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

তিনি আরও বলেন, এমনকি যদি আমরা বিষয়টিকে আরও যৌক্তিক ও মানবিকভাবে দেখতে চাই, তাহলে আমাদের বলা উচিত যে আমাদের দাবি জেরুজালেম মুসলমানদের নয়, বরং আমরা বলি যে জেরুজালেম ফিলিস্তিনিদের, তারা মুসলিম, ইহুদি বা খ্রিস্টান যারাই সেখানে থাকুক না কেন। আজ যদি দখলদাররা এই দখলকৃত ভূমি ছেড়ে চলে যায়, তখন উসমানীয় শাসনামলের মতো, স্থানীয় ইহুদিদেরও জেরুজালেমে বসবাসের অধিকার থাকবে এবং প্রতিটি ধর্মের অনুসারীরা স্বাধীনভাবে তাদের ধর্ম পালন করতে পারবে। একইভাবে, খ্রিস্টানরা স্বাধীনভাবে উপাসনা করবে। ফিলিস্তিন সম্পর্কে কথা বলার সময় হামাসও বলে, "কুদস শরীফ আমাদের, এখানকার গীর্জা, সিনাগগ এবং মসজিদ আমাদের অর্থাৎ এগুলো ফিলিস্তিনি জনগণের। কুদস শুধুমাত্র মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত নয়। বরং কুদস সব ফিলিস্তিনিদেরই, তারা মুসলিম, ইহুদি বা খ্রিস্টানই যেই হোক না কেন। আমরা যখনই ফিলিস্তিনকে মুক্ত করব, তখনই সেখানে বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীরা তাদের ধর্মীয় রীতিনীতি স্বাধীনভাবে পালন করতে পারবে এবং তাদের ধর্ম ও বিশ্বাসের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার অধিকার কারো থাকবে না।"

এই তুর্কি বিশ্লেষক আরো বলেছেন: অন্য কথায়, ফিলিস্তিন এমন একটি ইস্যু যারাই স্বাধীন ও  মানবিক চিন্তাভাবনা করে তাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ইহুদি ধর্মের ব্যাপারে ইহুদিবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন: আমি এই প্রশ্নের সবচেয়ে ভালো উত্তর দিতে পারি যে, ইহুদিবাদীরা আসলে ধর্মকে কুক্ষিগত করে তা ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করছে। আগ্রাসন অব্যাহত রাখতে তারা ইহুদি ধর্মকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে। কারণ ইসরাইলের প্রথমদিকের নেতা এবং প্রতিষ্ঠাতারা বেশিরভাগই নাস্তিক এবং তারা কোনো ধর্মে বিশ্বাসী ছিল না।

আজ, ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া সত্ত্বেও ইহুদিবাদীরা ক্রমাগত তাওরাতের আয়াত ব্যবহার করে ইহুদি ধর্মের অপব্যবহার করছে। তারা জাতিগত ও বর্ণবাদী আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।

অন্য কথায়, ইহুদিবাদ একটি ফ্যাসিবাদী আদর্শ যা ইহুদি ধর্মকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। ইহুদিদের প্রতি পবিত্র কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে ইরানের সংবাদ সংস্থা ইকনার প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক ইসলাম ওজকান বলেছেন: "কুরআন ইহুদিদেরকে তাদের জাতিগত কারণে নিন্দা করে না, তবে তাদের শরিয়া থেকে বেরিয়ে যাওয়া এবং পৃথিবীতে দুর্নীতি ও অরাজকতা ছড়িয়ে দেয়ার কারণে তাদের নিন্দা করে।"

এমনকি আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে, কোরআন শরীফের সুরা বাকারার ১২২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, "হে বনী-ইসরাঈল! আমার অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর যা আমি তোমাদের দিয়েছি। আমি তোমাদেরকে বিশ্বাবাসীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।"

এই আয়াতে সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌ বনী ইসরাঈলকে তিনি যে নিয়ামত দান করেছেন তা স্মরণ করতে বলেছেন এবং বিভিন্ন আয়াতে তিনি এসব নেয়ামতের কিছু বর্ণনা দিয়ে বিশ্বব্যাপী বনী ইসরাঈল ও ইহুদীদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এই শ্রেষ্ঠত্ব সেই সময়ের সাথে সম্পর্কিত যখন ইহুদিরা ধর্মকে বিকৃত করেনি এবং নৈতিক নিয়মকানুন উপেক্ষা করেনি। কারণ কুরআন তাদের সম্পর্কে সূরা আল-বাকারার ৬৫ নম্বর আয়াতে বলেছে; "আর তোমাদের মধ্যে যারা শনিবারের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করেছিল, তাদেরকে অবশ্যই তোমরা জান। অতঃপর আমি তাদেরকে বললাম, ‘তোমরা নিকৃষ্ট বানর হয়ে যাও।"

তাই কোরান ইহুদিদেরকে তাদের জাতিগত কারণে তাদের নিন্দা করে না বরং তাদের কর্ম ও শরীয়ত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কারণে নিন্দা করে।#

পার্সটুডে/রেজওয়ান হোসেন/২৭

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।    

ট্যাগ