ইরানের পারমাণু ইস্যুতে ভূমিকা রাখতে ইউরোপ কেন হিমশিম খাচ্ছে?
https://parstoday.ir/bn/news/world-i156840-ইরানের_পারমাণু_ইস্যুতে_ভূমিকা_রাখতে_ইউরোপ_কেন_হিমশিম_খাচ্ছে
পার্সটুডে- জার্মান চ্যান্সেলরের বক্তব্যে আবারও ইরান সম্পর্কে তার বিদ্বেষী মনোভাব স্পষ্ট হয়েছে। পশ্চিম এশিয়ায় তিন দিনের সফরের সময় জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেরৎস ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুনরায় আলোচনায় ফিরতে আহ্বান জানান।
(last modified 2026-02-09T14:47:22+00:00 )
ফেব্রুয়ারি ০৮, ২০২৬ ২০:৪৩ Asia/Dhaka
  • ফ্রিডরিখ মেরৎস
    ফ্রিডরিখ মেরৎস

পার্সটুডে- জার্মান চ্যান্সেলরের বক্তব্যে আবারও ইরান সম্পর্কে তার বিদ্বেষী মনোভাব স্পষ্ট হয়েছে। পশ্চিম এশিয়ায় তিন দিনের সফরের সময় জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেরৎস ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুনরায় আলোচনায় ফিরতে আহ্বান জানান।

অবশ্য তিনি ভালোভাবেই জানেন যে, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা বা আইএইএ'র একাধিক নথিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, এই কর্মসূচির প্রকৃতি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি এনপিটি'র সক্রিয় সদস্য। কাজেই ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে জার্মান চ্যান্সেলরের এই বক্তব্য বাস্তব কোনো কারিগরি বা আইনি ভিত্তির চেয়ে বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিবাদী ইসরায়েলের বয়ানের প্রতি ইউরোপের অকুণ্ঠ সমর্থনের প্রতিফলন।

এই দৃষ্টিভঙ্গি ভালোভাবে বুঝতে হলে ইরানের সঙ্গে ইউরোপ—বিশেষ করে জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের সম্পর্কের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির রাজতান্ত্রিক শাসনামলে এসব দেশ একটি স্বৈরাচারী ও নির্ভরশীল শাসনব্যবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখেছিল এবং তারা তাকে রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে সমর্থন দিত। ইসলামী বিপ্লবের বিজয় ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান প্রতিষ্ঠার পর প্রত্যাশা ছিল যে, ইউরোপ নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে পারস্পরিক সম্মানভিত্তিক ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলবে। কিন্তু বাস্তবে ইরানের প্রাথমিক সদিচ্ছার পরিবর্তে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অবিশ্বাসের নীতি প্রাধান্য পায়।

এই দ্বিমুখী নীতির একটি স্পষ্ট উদাহরণ হলো, ইউরোপের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী মুনাফিকিন (মুজাহিদিন-ই খালক সংগঠন)-এর প্রতি তাদের সমর্থন। এই গোষ্ঠীটি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক পর্যন্ত ১৭ হাজারেরও বেশি ইরানির প্রাণহানি ও সন্ত্রাসী হামলার জন্য দায়ী। তবুও বছরের পর বছর ধরে তারা ইউরোপীয় দেশগুলোতে—বিশেষ করে ফ্রান্স ও জার্মানিতে—স্বাধীনভাবে তৎপরতা পরিচালনা, রাজনৈতিক সমর্থন এমনকি আর্থিক সহায়তাও পেয়ে আসছে। এই আচরণ ইউরোপের সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থান ও মানবাধিকারের দাবিকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

পারমাণবিক ক্ষেত্রেও শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি অর্জনের নিজস্ব বৈধ অধিকারের জন্য ইরানের প্রচেষ্টার শুরু থেকেই ইউরোপীয় দেশগুলো ভিত্তিহীনভাবে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টার অভিযোগে অভিযুক্ত করে। সন্দেহ দূর করা ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ২০০৩ সালে ইউরোপীয় ত্রয়ীর সঙ্গে আলোচনায় বসে এবং চুক্তি সই করে।

এই চুক্তির আওতায় ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের স্বেচ্ছায় অস্থায়ী সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। কিন্তু দুই বছর পর ইউরোপের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণে এনপিটি'র অধীনে নিজের অধিকারের ভিত্তিতে ইরান আবার তার পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরায় শুরু করে।

এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ইতিহাস আরও পুরোনো। ইসলামী বিপ্লবের আগে জার্মানি সিমেন্স কোম্পানির মাধ্যমে বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দায়িত্ব নিয়েছিল এবং ফ্রান্স এর জ্বালানি সরবরাহের দায়িত্বে ছিল। প্রকল্পটির একটি বড় অংশ সম্পন্নও হয়েছিল, কিন্তু বিপ্লবের পর ইউরোপ একতরফাভাবে তাদের দায়বদ্ধতা উপেক্ষা করে। এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ইরানের দৃষ্টিতে ইউরোপের প্রতি গভীর অবিশ্বাস সৃষ্টি করেছে।

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের কর্মকর্তারা বারবার জোর দিয়ে বলেছেন, এসব নীতি অব্যাহত থাকলে পশ্চিম এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ থেকে ইউরোপকে বাদ পড়তে হবে। এখন যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা আবারও গুরুত্ব পাচ্ছে, তখন মনে হচ্ছে ইউরোপ ভিত্তিহীন ও হস্তক্ষেপমূলক উদ্বেগ তুলে ধরে আবার মঞ্চে ফিরতে চাইছে এবং এমন এক ধরণের ভূমিকা নিতে চাইছে, যা তারা নিজেদের অতীত আচরণের মাধ্যমেই দুর্বল করে ফেলেছে।

পারস্য উপসাগরের দক্ষিণাঞ্চলের আরব দেশগুলোতে ফ্রিডরিখ মেরৎসের সফরও এই প্রেক্ষাপটেই বিশ্লেষণযোগ্য।#

পার্সটুডে/এসএ/৮

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।