'মেরাজ-১১৩': ড্রোন পাইলটদের প্রশিক্ষণের জন্য একটি উপযুক্ত যান
-
মেরাজ-১১৩ ড্রোন
পার্সটুডে: চালকবিহীন বিমান বা ড্রোন হলো এমন এক প্রযুক্তি, যা বর্তমানে সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রেই অত্যন্ত সক্রিয় এবং কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।
পার্সটুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ড্রোনের বহুমুখী ব্যবহার একে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করার অন্যতম প্রধান মানদণ্ড। এর মধ্যে স্থল বা আকাশপথে লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণের ক্ষমতাসম্পন্ন সামরিক ড্রোন, নজরদারি ও গোয়েন্দা ড্রোন, লজিস্টিক ও সাপোর্ট ড্রোন এবং বেসামরিক ও বাণিজ্যিক ড্রোন—এই চারটি প্রধান শাখা রয়েছে। একই সঙ্গে, ড্রোনের এই বিশাল পরিবারে এখন 'প্রশিক্ষণ ড্রোন' বা ট্রেনিং ড্রোনগুলোও ধীরে ধীরে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছে।
ড্রোন প্রযুক্তিতে অগ্রগতি
গত তিন দশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের ড্রোন প্রযুক্তির অগ্রগতি সবসময়ই চোখে পড়ার মতো ছিল। বিশেষ করে গত এক দশকে আঞ্চলিক সংঘাতগুলোর প্রেক্ষাপটে ইরানি ড্রোনের উচ্চ কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ এবং আক্রমণাত্মক অভিযান পরিচালনায় এগুলো নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে।
"আমরা পারি" (We Can) এই কৌশলগত নীতিকে সামনে রেখে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি)-এর স্থলবাহিনীর 'জিহাদ স্বয়ংসম্পূর্ণতা সংস্থা' বিভিন্ন ধরণের নজরদারি, যুদ্ধকালীন, আত্মঘাতী এবং প্রশিক্ষণ ড্রোন ডিজাইন ও তৈরিতে বিশাল পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা আইআরজিসির অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই বাহিনীর অন্যতম একটি বড় অর্জন হলো প্রশিক্ষণ ড্রোন "মেরাজ-১১৩" (Meraj-113)।
একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা
২০২১ সালের ৭ জুলাই আইআরজিসির স্থলবাহিনীর কাছে নতুন সামরিক সরঞ্জাম হস্তান্তরের একটি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। সেই অনুষ্ঠানে 'ফাতাহ' ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, 'কায়েম-১১৪' ক্ষেপণাস্ত্র এবং ভূমিভিত্তিক 'আলমাস' ক্ষেপণাস্ত্রসহ বেশ কিছু নতুন অস্ত্র আইআরজিসির যুদ্ধ ইউনিটে যুক্ত করা হয়।
তবে এই অনুষ্ঠানে উন্মোচিত হওয়া একটি সরঞ্জামের দিকে সংবাদমাধ্যমের নজর কিছুটা কম ছিল, আর সেটি হলো 'মেরাজ-১১৩' ড্রোন। অনুষ্ঠানে 'মেরাজ-৫০৪' ড্রোনের পাশাপাশি 'মেরাজ-১১৩' নামের এই নতুন ও সাশ্রয়ী মূল্যের প্রশিক্ষণ ড্রোনটি দেখা যায়। আইআরজিসির স্থলবাহিনী তাদের ড্রোন ইউনিটের পাইলট এবং ক্রুদের প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে এটি তৈরি করেছে।
আইআরজিসির স্থলবাহিনীর গবেষণা ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা জেহাদ সংস্থার ড্রোন গবেষণা দলের বিশেষজ্ঞদের দ্বারা ডিজাইন ও উৎপাদিত এই ড্রোনটি মূলত প্রথম কোনো ড্রোন, যা বিশেষভাবে ড্রোন পাইলটদের প্রশিক্ষণের জন্য তৈরি করা হয়েছে।
বৈশিষ্ট্যসমূহ:
মূল মেরাজ ড্রোনের তুলনায় 'মেরাজ-১১৩' ড্রোনের কাঠামো, বডি এবং লেজের নকশায় সর্বোচ্চ সরলতা বজায় রাখা হয়েছে। নির্মাণ ব্যয় ও সময় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে এটি মাত্র ৪ মাসের মধ্যে ডিজাইন করা হয়েছে।
- উড্ডয়নকাল: এই ড্রোনটি টানা ৩ ঘণ্টা উড়তে পারে।
- অপারেশনাল রেঞ্জ: এর কার্যক্ষমতার পরিধি বা রেঞ্জ ১৫০ কিলোমিটার।
- উচ্চতা: এটি ১৮,০০০ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত উড়তে সক্ষম।
- ক্রুজ গতি: এর গতিবেগ ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার।
- ওজন ও বহনক্ষমতা: ড্রোনটি সর্বোচ্চ ৫০ কেজি ওজন নিয়ে উড্ডয়ন (Take-off) করতে পারে এবং এটি ৩০ কেজি ওজনের পেলোড বা রসদ বহন করতে সক্ষম।
মেরাজ-১১৩ ড্রোনের নকশা তৈরিতে ড্রোন ইউনিটগুলোর প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি 'মোহাজের-৬', 'আবাবিল-৩' এবং 'মোহাজের-২' ড্রোনের ডিজাইন থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়েছে।
এই ড্রোনটি তৈরির আগে পাইলটদের এমন সব ড্রোন দিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে হতো যেগুলোর পরিচালন ব্যয় ছিল অনেক বেশি। আইআরজিসির স্থলবাহিনীতে মেরাজ-১১৩ যুক্ত হওয়ার পর বাহিনীর ড্রোন প্রশিক্ষণের ঘাটতি যেমন পূরণ হয়েছে, তেমনি প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার খরচও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।
অন্যদিকে, এই ড্রোনের নকশায় সমস্ত ইলেকট্রো-অ্যাভিওনিক্স পার্টস এবং এমনকি বডির কিছু অংশও 'মডুলার' (Modular) পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে প্রশিক্ষণ চলাকালীন কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে অত্যন্ত দ্রুত এবং সাশ্রয়ী মূল্যে তা মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব।#
পার্সটুডে/এমএআর/১