বিশ্লেষণ | ট্রাম্প ও পুতিনের চুক্তি কীভাবে পশ্চিমা বিশ্বে বিভেদ সৃষ্টি করছে?
-
ট্রাম্প ও পুতিনের চুক্তি কীভাবে পশ্চিমা বিশ্বে বিভেদ সৃষ্টি করছে?
পার্সটুডে: যুক্তরাষ্ট্রে রুশ ডিজেল রপ্তানির বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে চুক্তি ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
জ্বালানির সরবরাহ বাড়ানো এবং দাম নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য নিয়ে এই চুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে ওয়াশিংটন, কিয়েভ ও ইউরোপের প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, এর প্রভাব জ্বালানি বাজারের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও বহুদূর বিস্তৃত। রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিশ্বাসযোগ্যতা, ইউক্রেনের প্রতি সমর্থনের ভবিষ্যৎ এবং পশ্চিমা জোটের ঐক্য এখন আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ট্রাম্প প্রশাসনকে চাপের মুখে ফেলেছে। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ডিজেলের দাম প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়ে প্রতি গ্যালন ৬ ডলার ২৮ সেন্টে পৌঁছেছে। এর ফলে পরিবহন ও কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে। পরিণতিতে ট্রাকচালক, কৃষক এবং গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব জনগোষ্ঠী ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান পার্টির ভোটব্যাংকের অংশ। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনতে ট্রাম্পের একটি দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।
তবে মস্কোর সঙ্গে চুক্তি করলেই যে জ্বালানির দাম কমবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। যুক্তরাষ্ট্র নিজেই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ডিজেল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ। রাশিয়া থেকে রপ্তানির জন্য ঘোষিত জ্বালানির চালানের পরিমাণও বৈশ্বিক বাজারের তুলনায় সীমিত। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ এবং উৎপাদন অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির কারণে জ্বালানি সরবরাহে যে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে, কয়েকটি চালানের মাধ্যমে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞরাও এই চুক্তির ফলে জ্বালানির দামে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। ফলে মূল প্রশ্নটি শুধু জ্বালানির দাম কতটা কমবে, তা নয়; বরং এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক ও কৌশলগত মূল্যও গুরুত্বপূর্ণ।
রাশিয়ার সঙ্গে এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও কয়েকজন আইনপ্রণেতার বিরোধিতার মুখে পড়েছে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের ছয়জন সিনেটর কংগ্রেসের সঙ্গে পরামর্শ না করা এবং আইন লঙ্ঘনের সম্ভাবনা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন। ২০২২ সালে মস্কোর যুদ্ধের অর্থায়ন বন্ধ করার লক্ষ্যে কংগ্রেস রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি নিষিদ্ধ করেছিল। রিপাবলিকান সিনেটর টম টিলিসও এই চুক্তির মাধ্যমে আইন লঙ্ঘিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এসব আপত্তি থেকে স্পষ্ট, বিষয়টি কেবল জ্বালানি সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা এবং প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়া আগের বিধিনিষেধ থেকে সরে আসা মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে ওয়াশিংটনের বার্তাকে অস্পষ্ট করে দিতে পারে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অঙ্গীকারের চেয়ে নির্বাচনী হিসাব-নিকাশ কি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে?
ইউরোপের জন্যও এই চুক্তির পরিণতি গুরুতর। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং মস্কোর আয় সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছিল। নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ব্যয় বাড়ানো এবং রাশিয়ার অর্থনৈতিক সক্ষমতা সীমিত করা। এখন ওয়াশিংটন ও ক্রেমলিনের মধ্যে এই চুক্তি নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে: যুক্তরাষ্ট্র কি রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা বিশ্বের অভিন্ন কৌশল থেকে দূরে সরে যাচ্ছে?
বিষয়টির গুরুত্ব শুধু রুশ ডিজেলের বাজারে ফিরে আসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপ যখন নিষেধাজ্ঞার অর্থনৈতিক ব্যয় বহন করছে, তখন তাদের প্রধান নিরাপত্তা মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ভিন্ন পথে এগিয়ে যেতে পারে। এমন বিভেদ আটলান্টিকের দুই পারের দেশগুলোর সমন্বয় ও সহযোগিতাকে দুর্বল করতে পারে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন ও ইউরোপীয় রাজধানীগুলোর মধ্যে স্বার্থের সংঘাতকে কাজে লাগানোর সুযোগ পাবে মস্কো।
ইউক্রেনের প্রতিক্রিয়া আরও স্পষ্ট। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই চুক্তিকে দুর্বল সিদ্ধান্ত হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর সতর্কবার্তা হলো, অর্থনৈতিক ছাড় পুতিনকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করতে পারে। রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে ইউক্রেনের হামলার ফলে দেশটির জ্বালানি উৎপাদন সক্ষমতার একটি অংশ ব্যাহত হয়েছে। রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানি পুনরায় শুরু হলে মস্কোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ কিছুটা কমতে পারে। তবে ঘোষিত সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা রাশিয়ার রয়েছে কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
ট্রাম্প ও পুতিনের এই চুক্তি নিছক ডিজেল সরবরাহের কোনো বাণিজ্যিক সমঝোতা নয়।
এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন জ্বালানি সংকট, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী প্রতিযোগিতা এবং ইউক্রেন যুদ্ধ—এই তিনটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। চুক্তিটি জ্বালানির সরবরাহ সামান্য বাড়াতে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু এককভাবে মূল্যবৃদ্ধির সংকট সমাধান করতে পারবে না। বিপরীতে, যদি এর ফলে নিষেধাজ্ঞা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং কিয়েভের প্রতি সমর্থন কমে যায়, তাহলে এর কৌশলগত প্রভাব স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক সুবিধার চেয়ে অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
ইউরোপের জন্য মূল প্রশ্নটিও এখানেই: ওয়াশিংটন কি রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা বিশ্বের অভিন্ন কৌশলের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থ পশ্চিমা জোটে নতুন করে বিভেদ সৃষ্টি করবে? #
পার্সটুডে/এমআরএইচ/১৩
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।