ইরাকের মসুল শহর ঐতিহাসিকভাবে তুরস্কের: এরদোগানের দাবি
ইরাক ও তুরস্কের মধ্যে যখন চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে তখন প্রতিবেশী এ দুই দেশের মধ্যকার মতবিরোধ তীব্রতর করার চেষ্টা করছে আমেরিকা।
ইরাকের কর্মকর্তারা বলেছেন, উগ্র তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দায়েশের কবল থেকে মসুল শহর মুক্ত করার জন্য যে সামরিক অভিযান চলছে তাতে আঙ্কারার সেনাবাহিনীর সহযোগিতার কোনো প্রয়োজন নেই। এ বক্তব্যের জবাবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান দাবি করেছেন, ইরাকের মসুল শহর ঐতিহাসিকভাবে তুরস্কেরই অংশ। বিশ্লেষকরা বলছেন তুর্কি প্রেসিডেন্টের এ ধরণের উদ্ভট মন্তব্য আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই বরং এটি কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ প্রচারণা ও জনগণকে ধোঁকা দেয়ার কাজে লাগতে পারে।
মসুল থেকে দায়েশ সন্ত্রাসীদের উৎখাতে সামরিক অভিযানের আজ সপ্তম দিন এবং ইরাকি সেনা ও স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী দায়েশ উৎখাতে ব্যাপক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এমন সময় মসুল উদ্ধার অভিযান চলছে যখন ওই অভিযানে তুর্কি সেনারা অংশ নেবে কি নেবে না তা নিয়ে বাগদাদ ও আঙ্কারার মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ চলছে। ইরাকের কোনো কোনো সূত্র বলছে, প্রেসিডেন্ট এরদোগান ইরাকের মসুলকে তুরস্কের অংশ বলে যে দাবি করেছেন তা থেকে বোঝা যায়, তুর্কি প্রেসিডেন্ট সাবেক ওসমানি সাম্রাজ্যের চেতনার ভিত্তিতে কথা বলছেন। অর্থাৎ তিনি নয়া সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছেন যা খুবই হাস্যকর।
ইরাক ও তুরস্কের মধ্যে তীব্র বিতর্ক চলার মধ্যেই মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাশ্টোন কার্টার গত শুক্রবার তুর্কি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মসুল উদ্ধার অভিযানে তুরস্কের অংশ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। যদিও ইরাকের প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল এবাদি পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, মসুল উদ্ধার অভিযানে তুরস্কের সহযোগিতার কোনো প্রয়োজন আমাদের নেই। কারণ তুর্কি সেনা উপস্থিতির ফলে দায়েশ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ইরাকের কর্মকর্তারা মনে করেন, আমেরিকার সমর্থন নিয়ে তুরস্ক মসুল অভিযানে অংশ নিয়ে আসলে এমন এক নিরাপদ করিডোর তৈরি করতে চায় যাতে দায়েশ সন্ত্রাসীরা নিরাপদে যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যেতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরাক ও তুরস্কের মধ্যে বিরোধ বাধানোর জন্য আমেরিকা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমেরিকার ধারণা এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে ঝগড়া বিবাদ বাধিয়ে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা যাবে। আমেরিকা এক সময় সিরিয়ায় গোলযোগ বাধিয়েছে এবং এরপর ইরাকের বিরুদ্ধে দায়েশ সন্ত্রাসীদেরকে সব রকম সাহায্য সহযোগিতা করেছে। বর্তমানে আমেরিকা যে কোনো অজুহাতে ইরাক ও তুরস্কের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, কয়েক মাস আগেও প্রেসিডেন্ট এরদোগান আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্ত হিসেবে সেদেশে অবস্থানকারী তুরস্কের সরকার বিরোধী ও ধর্মীয় নেতা ফতেহউল্লাহ গুলেনকে আঙ্কারার কাছে হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু এখন এরদোগান এ ব্যাপারে আর কোনো কথাই বলছেন না। অর্থাৎ তুরস্ক সরকার মার্কিন ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ অবস্থায় তুর্কি কর্মকর্তাদের উচিৎ জাতীয়তাবাদী চেতনার ঊর্ধ্বে উঠে বিরাজমান পরিস্থিতিকে বাস্তবতার আলোকে দেখা। কেননা আমেরিকা বহুদিন ধরেই তুরস্ককেও খণ্ড বিখণ্ড করার চেষ্টা করে আসছে। এ কারণে তুর্কি কর্মকর্তারা বহুবার মার্কিন কর্মকর্তাদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন। কিন্তু এখন দায়েশ বিতাড়ন ও মসুল অভিযানকে কেন্দ্র করে তুরস্ক ও আমেরিকা একে অপরের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে এবং আমেরিকা তুরস্কের ব্যাপারে তার লক্ষ্য উদ্দেশ্য নিয়েও চুপচাপ আছে।
এ অবস্থায় তুর্কি কর্মকর্তাদের এটা বোঝা উচিৎ যে, ইরাকের ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি এবং এটা সব দেশেরই রেডলাইন। নিঃসন্দেহে, এ অঞ্চলের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের কারণে তুরস্ক সরকারই দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়বে এবং আমেরিকার পরিবর্তী টার্গেট হবে তুরস্ককে ভেঙ্গে টুকরা টুকরা করা।#
পার্সটুডে/মোঃ রেজওয়ান হোসেন/২৩