মে ২৩, ২০১৬ ১০:৫০ Asia/Dhaka

মদ ও পারসিকরা ইরান অঞ্চলে আসার পর প্রচলিত মূল ধারার বিপরীতে স্থানীয়দের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় এবং তাদের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ধারা গড়ে তোলে। তাখতে জামশিদ বা পার্সিপোলিসে যেসব প্রস্তরলিপি ও মাটির পাত্র এবং শিলালিপি পাওয়া গেছে সেসব থেকে বোঝা যায় হাখামানেশীয় সাম্রাজ্য ছিল এক উন্নত সভ্যতার অধিকারী। এই সাম্রাজ্য সিরিয়ার উপকূল থেকে ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল।

পর্স বা পারসিকরা কিছুকাল পরই মদদের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এরপর তারা মধ্য এশিয়া, মেসোপটেমিয়া অঞ্চল, এশিয়া মাইনর, মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতের সিন্ধু উপত্যকাসহ এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলে ইরানকে কেন্দ্র করে এবং ইরানের কয়েক হাজার বছরের বিচ্ছিন্ন সভ্যতাগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে। সে সময় বিশ্বের সভ্য জগতের মধ্যে স্পার্টা ও এথেন্সের নগর-সরকারগুলো ও চীন ছাড়া আর সব অঞ্চলই ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের অংশ। পারসিকরা একবার গ্রিস ও মিশরও দখল করেছিল। কেবল সামরিক শক্তির জোরে এই বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে উঠেনি। বিভিন্ন স্থানীয় গোত্র ইরানি বাহিনীকে মুক্তি বা ত্রাণকর্তা বলে মনে করতো এবং তাদের সহযোগিতায় এইসব বিস্তৃত অঞ্চল দখল করা ইরানিদের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। হাখামানেশীয় শাহানশাহরা দক্ষিণ ইরানের শুষ অঞ্চল থেকে এশিয়া মাইনরের লিডি (যা বর্তমান তুরস্কে অবস্থিত) পর্যন্ত এক বিশাল রাজপথ গড়ে তুলেছিল। ফলে নানা জাতির মধ্যে আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত নানা ধরনের যোগাযোগের ব্যবস্থা চালু হয় প্রথমবারের মতো।

 

হাখামানেশীয় সম্রাটরা প্লুরালিজম বা বহু মতবাদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী ছিলেন। ব্যবিলনীয় বা অ্যাসিরিয় সম্রাটদের মত তারা অন্য জাতিগুলোকে নির্মূল করা, তাদের সম্পদ লুট করা ও তাদের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার জন্য অভিযান চালাতেন না। তারা বিজিত অঞ্চলের জনগণের কাছ থেকে কেবল কর নেয়ার বিনিময়ে তাদের সম্পদ, জমি ও সংস্কৃতি রক্ষার দায়িত্বও নিতেন। বিজিত অঞ্চলের জনগণ ধর্ম, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও বিচার ব্যবস্থার ক্ষেত্রে তুলনামূলক স্বাধীনতা বা স্বশাসনের অধিকারী ছিলেন। ফলে তারা হাখামানেশীয় সাম্রাজ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা অনুভব করতো।

 

কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০ সনে আলেক্সান্ডারের হাতে হাখামানেশীয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। কিন্তু এর ফলে বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ইরানি গোত্রগুলোর মধ্যে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। আলেক্সান্ডার প্রথম দিকে ইরানি সভ্যতার বিরুদ্ধে দমনমূলক ব্যবস্থা নিলেও পরে বুঝতে পারেন যে, বিজিত অঞ্চলগুলোকে ভালোভাবে পরিচালনার জন্য ইরানি প্রশাসক ও সেনা কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতাকে ব্যবহার করা উচিত। কারণ, সাম্রাজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে ইরানিদের ছিল শত শত বছরের অভিজ্ঞতা। আর এ জন্যই আলেক্সান্ডার বহু ইরানি প্রশাসক ও সেনা কর্মকর্তাকে তাদের পুরনো পদেই বহাল রাখেন। কেবল গ্রীকদের হাতে গড়ে তোলা নতুন শহরগুলো পরিচালনার দায়িত্ব গ্রিকদের হাতে দেয়া হয় যাতে তারা গ্রিক স্টাইলে সেগুলো পরিচালনা করতে পারেন।

 

আলেক্সান্ডারের মৃত্যুর পর কিছুকাল সেলুকিয়ান বা আলেক্সান্ডারের সেনাপতি সেলুকাস ও তার বংশধররা ইরানি সাম্রাজ্যকে শাসন করে। এরপর আসে আশকানিয়ানরা। এ সময়ে বিশ্বে একক বিশ্ব সাম্রাজ্য টাইপের শাসন-ব্যবস্থার অবসান ঘটে এবং বিশ্ব ইরান ও রোমান সাম্রাজ্যের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়।(বাজনা)

 

পার্থিয়ান বা আশকানিয়ানরা ছিল উত্তর-পূর্ব ইরানের অধিবাসী। হাখামানেশীয় সাম্রাজ্যে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। হাখামানেশীয়দের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো ছিল ইরানের পশ্চিম, দক্ষিণ ও কেন্দ্রীয় অঞ্চলে। অন্যদিকে পার্থিয়ানদের অঞ্চলের সংস্কৃতি ছিল প্রান্তিক।

 

পার্থিয়ানদের শাসনামলের প্রথম যুগটিতে গ্রিক সংস্কৃতির তীব্র প্রভাব দেখা গেছে। এমনকি পার্থিয়ানরা গ্রিক ভাষাও পুরোপুরি আয়ত্ত করেছিল এবং এ ভাষাকেই তারা রাষ্ট্রীয় ভাষায় পরিণত করে। এরপর যতই তারা দক্ষিণের দিকে আসতে থাকে ততই তারা গ্রীকদের বন্ধনগুলো থেকেও মুক্ত হয়ে মূল ইরানি সংস্কৃতির দিকে ফিরতে থাকে। অবশেষে তারা মেসোপটেমিয়া অঞ্চলটি গ্রিকদের হাত থেকে পুনরায় উদ্ধার করে। তারা সেলুকিয়ানদের শহরের ঠিক সামনে দজলা নদীর অন্য পাড়ে আধুনিক বাগদাদ সংলগ্ন শহর মাদায়েনকে তাদের রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলে। এ সময়ের মধ্যে পার্থিয়ানদের গ্রিক-প্রেম পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়। তারা পাহলভি ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ করে এবং ইরানিদের প্রচলিত ও জরথুস্ত ধর্মকেই নিজ ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করে।

 

অন্য কথায় পার্থিয়ান যুগের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি হলো এটা যে ইরানের পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব অঞ্চলটি হাখামানেশীয় ও সেলুকিয়ান যুগে প্রান্তীয় বা অপ্রধান ভূমিকা থেকে সরে এসে এই যুগে ইরানের মূল সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হয় এবং এভাবে তা পরিণত হয় খাঁটি ইরানি সংস্কৃতিতে।

 

পার্থিয়ান যুগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো এ যুগে সিল্ক রোড বা রেশম মহা-সড়ক চালু হয় যার মধ্যমণি ছিল ইরান। প্রাচীন যুগ থেকেই ইরানের ছোট ও বড় সড়কগুলো নানা কাজে ব্যবহৃত হতো এবং সেগুলো আন্তঃমহাদেশীয় মহা-সড়কগুলোর সঙ্গেও যুক্ত ছিল। সিল্ক রোড বা রেশম মহা-সড়ক ছিল এসবের মধ্যে অন্যতম। এটি পূর্ব দিকে চীন পর্যন্ত এবং পশ্চিমে মধ্য-ইউরোপ পর্যন্ত, বিশেষ করে ভেনিসের মতো ইউরোপের বড় বড় বাণিজ্য-শহরগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিল। পর্যটকরা, ব্যবসায়ীরা ও ধর্ম-প্রচারকরা এই মহাসড়ক দিয়ে চলাচল করতেন। আর তাদের মাধ্যমে এই মহাসড়কের আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চলের জনগণ নানা সংস্কৃতি ও চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত হতো। কয়েক হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এই মহাসড়কের আশপাশে সেযুগের সভ্যতাগুলোর মধ্যে সাংস্কৃতিক নানা যোগাযোগের ও সমন্বয়ের নিদর্শন পাওয়া গেছে। তাই এ মহাসড়ক যেন রেখে গেছে সভ্যতা ও সংস্কৃতিগুলোর এক বিচিত্র জাদুঘর।

 

চীন থেকে বসনিয়া পর্যন্ত স্থল ও সমুদ্র পথের পাশে এবং উত্তর এশিয়ার নানা জাতি অন্তর্ভূক্ত হয়েছিল সিল্ক রোডের মধ্যে। চীনা, ভারতীয়, ইরানি, গ্রিক ও রোমান সভ্যতা ছাড়াও বৌদ্ধ, ব্রাক্ষ্মণ বা হিন্দু, জরথ্রুস্ত, ইহুদি, খ্রিস্ট ও ইসলাম ধর্মের মত নানা ধর্ম এ মহাসড়কের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান ও সভ্যতার ঐতিহ্য মহান ইসলামী সভ্যতাকেও এ মহাসড়কের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। এভাবে প্রাচীন যুগ থেকে ইসলামী যুগ পর্যন্ত ইরানি শহরগুলো জ্ঞান, সভ্যতা, ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মগুলোর মধ্যে যোগাযোগ এবং প্রীতি-বন্ধনের ভূমিকা রেখেছে। বিশ্বের নানা অঞ্চলের সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও রেশম-মহাসড়কের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।

 

এই মহাসড়কের আশপাশে অবস্থিত ফারগানা, বদখশান, মেসোপটেমিয়া বা ইরাক অঞ্চল, খাওয়ারিজম, সমরকন্দ, বোখারা, তিরমিজ, বালখ, খুজান্দ, মার্ভ ও হেরাতসহ আরো বহু শহর প্রাচীন ইরান ও ইসলামী ইরানের মহান সভ্যতাগুলোর নানা নিদর্শন এখনও বহন করছে।#