জানুয়ারি ১০, ২০২২ ২০:৩৯ Asia/Dhaka

গত পর্বের আলোচনায় আমরা পরিবারে কেবল একটি মাত্র সন্তান থাকার সুবিধা ও অসুবিধা নিয়ে কথা বলেছি। আজকের পর্বে আমরা কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ বা মাতৃমৃত্যুর আশঙ্কা না থাকা সত্ত্বেও গর্ভস্থ জীবন্ত সন্তান হত্যা করা তথা গর্ভপাত ঘটানোর বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে কথা বলব।

আধুনিক যুগে সন্তান নেয়ার প্রবণতায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তনই এর কারণ। অনেকেই মনে করেন একাধিক বা বেশি সন্তান ব্যক্তিগত সুখ-শান্তির পথে বাধা এবং সন্তান বড় করাটা বেশ ব্যয়বহুল। বেশি সন্তানের অধিকারী হওয়ার মধ্যে তারা স্নেহ-ভালবাসা ও ভালো লাগার কোনো অনুভূতি পান না। নারী সমাজের মধ্যেও অনেকেই মনে করেন কেবল মা হওয়া ও সন্তান প্রতিপালন নারীর মর্যাদার জন্য সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ফলে এ ধরনের অনেকেই গর্ভপাতের আশ্রয় নিচ্ছেন। 

গর্ভপাত কখনও ওষুধের মাধ্যমে ঘটানো হয় ও কখনও অস্ত্রোপচার বা অপারেশনের মাধ্যমে ঘটানো হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গর্ভপাত ঘটানো হয় গর্ভস্থ মানব-শিশু খুবই অপরিণত বা গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে। বেশিরভাগ পশ্চিমা দেশে গর্ভপাতকে মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিদর্শন বলে দাবি করা হচ্ছে। বিংশ শতকের শুরুর দিকে পশ্চিমা দেশগুলোতে গর্ভপাত বিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল এবং গর্ভপাতের বিষয়টি নারীর জন্য বিপজ্জনক হওয়ায় গর্ভপাতকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৫০ থেকে ১৯৬০-এর দশকে কথিত নারীবাদী বা ফেমিনিস্ট আন্দোলনগুলো এ সংক্রান্ত আইনে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করে। অবশেষে তাদের চাপের মুখে ১৯৭৩ সালে  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গর্ভপাতকে আইনসিদ্ধ বা বৈধ বলে হাইকোর্ট থেকে রায় দেয়া হয়।

ইসলাম ধর্ম স্বাস্থ্যগত মারাত্মক ঝুঁকি বা বিপদ ছাড়া গর্ভপাত ঘটানোকে অপরাধ বলে মনে করে। জীবন এক খোদায়ি নেয়ামত। মানুষের একটি জীবন লাভের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অধিকার কারো নেই। পবিত্র কুরআনের সুরা মায়েদার ৩২ নম্বর আয়াতের আলোকে নিরপরাধ কোনো মানুষ হত্যা করা গোটা মানব জাতিকে হত্যা করার সমান। আর কোনো মানুষের জীবন রক্ষা করাকে সমগ্র মানব জাতির জীবন রক্ষার সমতুল্য বলে একই সুরায় উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসলামের দৃষ্টিতে যখনই গর্ভস্থ শিশুর মধ্যে প্রাণ বা রুহ চলে আসে তখন থেকেই একজন মানুষের মতই বেঁচে থাকার অধিকার তার রয়েছে। তাই যেসব চিকিৎসক বা সন্তানের অভিভাবক কোনো বৈধ কারণ ছাড়াই গর্ভপাত ঘটাচ্ছেন তারা অপরাধী।

গর্ভস্থ শিশু জীবিত অবস্থায় জন্ম নেয়ার অধিকার রাখে। সে তার নিজের ইচ্ছায় মায়ের গর্ভে আসেনি। তাই এই ক্ষুদ্র মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়ার অধিকার তার বাবা-মায়েরও নেই ঠিক যেভাবে জন্ম-লাভ করা শিশুদের ক্ষতি করার অধিকারও কারো নেই। শিশু প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত তার সব অধিকার রক্ষা করা ও অব্যাহত রাখা যেমন বাবা মায়ের দায়িত্ব তেমনি গর্ভস্থ শিশুরও সব ধরনের যত্নের ব্যবস্থা নেয়া বাবা-মায়ের মৌলিক নৈতিক দায়িত্ব। ইসলামের দৃষ্টিতে গর্ভপাত ঘটানো তখনই বৈধ যখন মায়ের গর্ভে তার অব্যাহত উপস্থিতি মায়ের মৃত্যু ঘটাতে পারে বা মায়ের শরীর ও মনের জন্য তীব্র ক্ষতির কারণ হতে পারে। এ ছাড়াও ডাক্তার যদি প্রামাণ্য রিপোর্ট দেন যে গর্ভস্থ শিশু বিকলাঙ্গ বা অসুস্থ তখন তার অভিমতের ভিত্তিতে গর্ভপাত করা যাবে।

ইসলামের দৃষ্টিতে গর্ভস্থ শিশুর বয়স যখন চার মাস হয় তখন থেকেই সে রুহ্‌-প্রাপ্ত পরিপূর্ণ মানব শিশু হিসেবে বিবেচিত হয়। এর পর হতে তো দূরের কথা এর আগ থেকেই সে জীবিত থাকার অধিকার রাখে এবং পরিকল্পিতভাবে গর্ভস্থ ভ্রূণের কোনো ধরনের ক্ষতি করা অবৈধ। ইসলামের দৃষ্টিতে গর্ভপাত হারাম ও কবিরা গোনাহ। এক ব্যক্তি ইমাম রেজার (আ) কাছে জানান যে একজন নারী গর্ভবতী হওয়ার ভয়ে ওষুধ খেয়েছেন ও গর্ভে যে ভ্রূণ ছিল তা নষ্ট করেছেন- এ বিষয়ে ইসলামের বিধান কী? ইমাম বললেন, বৈধ নয়। ওই ব্যক্তি বললেন: এটি ভ্রূণ মাত্র। ইমাম বললেন, সৃষ্টির সূচনাতে মানুষ ভ্রূণ অবস্থাতেই থাকে। ইমামের এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায় মানুষের জীবনের সূচনা মাতৃগর্ভে ডিম্বাণুর সঙ্গে শুক্রাণুর মিলনে গঠিত ভ্রূণ হিসেবে গড়ে ওঠার পর থেকেই।

লক্ষণীয় বিষয় হল এমনকি গর্ভ সঞ্চারিত হয়েছে কিনা সে বিষয়ে ওই ব্যক্তি নিশ্চিত না হওয়া সত্ত্বেও ওই নারীর গর্ভপাতকারী ওষুধ ব্যবহারকে অবৈধ বললেন ইমাম।  আর কেউ যদি নিশ্চিত হয় যে গর্ভ সঞ্চারিত হচ্ছে তাহলে তো গর্ভপাত যে হারাম তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাইকোর্ট গর্ভপাতকে বৈধ বলে রায় দেয়ার পর দেশটিতে ৫ কোটিরও বেশি গর্ভপাতের ঘটনা ঘটেছে। গবেষকরা বলেছেন প্রতি বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যত গর্ভপাত ঘটানো হয় তার সংখ্যা দেশটির সবগুলো যুদ্ধে নিহত সেনাসংখ্যার সমান। নিউইয়র্ক শহরে যত গর্ভধারণ করা হয় তার ৪১ শতাংশই গর্ভপাতের শিকার হয়। আর গর্ভপাতগুলোর ৮৬ শতাংশই করা হয় আরামপ্রিয়তার কারণে ও সামান্য ঝামেলাও সহ্য করার মানসিকতা না থাকার কারণে। অথচ গর্ভপাত নারীর শরীর ও মনের মারাত্মক ক্ষতি করে। এর নেতিবাচক রেশ বহু বছর পর্যন্ত থেকে যায়।

ইচ্ছাকৃত গর্ভপাতকারী নারীরা নানা কষ্ট পেয়ে থাকেন বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার শিকার হন। ফিনল্যান্ডে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে যারা স্বেচ্ছায় গর্ভপাত করেন তাদের মৃত্যুর আশঙ্কা অনিচ্ছাকৃত গর্ভপাতের শিকার নারীদের চেয়ে শতকরা ১০২ ভাগ বেশি। স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞদের মতে গর্ভপাতের শিকার নারীদের মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার কারণ মানসিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত।

পশ্চিমা নারীদেরকে গর্ভপাতের এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে অবাধ যৌনতা ও ব্যভিচার থেকে দূরে থাকতে হবে এবং বিয়ে করার ও নৈতিক চরিত্র সমুন্নত রাখার সংস্কৃতিতে ও পরিবার-কেন্দ্রিক সমাজ গড়ার জীবনে ফিরে যেতে হবে।#

পার্সটুডে/এমএএইচ/আবুসাঈদ/১০

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ