মার্চ ১৯, ২০২২ ১৭:৫২ Asia/Dhaka

গত আসরে আমরা অন্যদের সঙ্গে নিজের স্বামী বা স্ত্রীর তুলনা করার নানা ক্ষতিকর দিক এবং এই অভ্যাস থেকে মুক্তির উপায় নিয়ে খানিকটা আলোচনা করেছি। আমরা নানা বিষয়ে আলোচনার পাশাপাশি একটি পয়েন্ট জোর দিয়ে তুলে ধরেছি আর তাহলো অন্যের সঙ্গে স্বামী বা স্ত্রীর বাহ্যিক রূপ নিয়ে তুলনা করার চেয়ে বড় ভুল দাম্পত্য জীবনে আর হতে পারে না।

এই অভ্যাসটা দাম্পত্য জীবনে অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে নিয়ে আসতে পারে, সংসারে ভাঙন সৃষ্টির কারণ হতে পারে। আজ আমরা এই প্রসঙ্গের পাশাপাশি নিজের সন্তানদের সঙ্গে অন্যদের তুলনার ক্ষতিকর দিক নিয়ে কথা বলব।    

পরস্পরের সঙ্গে তুলনার যে প্রবণতা তারই অংশ হিসেবে দেখা যায়, স্বামী বা স্ত্রী প্রতিশোধপরায়ন হয়ে উঠছেন। একজন তুলনা করেছে এমনটা বুঝতে পেরে অপরজনও তুলনা করতে শুরু করেন। এই ধ্বংসাত্মক প্রতিযোগিতা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। সবারই উচিত তুলনা করার আগে নিজেকে অন্যের স্থানে বসানো। অন্যের সঙ্গে আপনার স্বামী বা স্ত্রীর তুলনা করার আগে একবার ভাবুন, আপনার ক্ষেত্রেও যদি একই কাজ করা হয় তাহলে বিষয়টা কেমন হবে। নিশ্চয় এমন অবস্থা আপনার কাছে সুখকর হবে না। আসলে তুলনার প্রবণতা থেকে যদি আপনি সরে আসেন তাহলে অপর পক্ষও তা থেকে সরে আসবে। অন্যথায় সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা বাড়বে এবং ঝগড়া-বিবাদ আরও জটিল আকার ধারণ করবে। আপনারা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সুখে-শান্তিতে দাম্পত্য জীবন পরিচালনা করবেন এমন চিন্তা-বিশ্বাস ধারণ করতে হবে। আপনি যদি অন্যকে মানদণ্ড হিসেবে দাঁড় করিয়ে আপনার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে যাচাই করতে চান এবং প্রতিনিয়ত তুলনা করতে থাকেন তাহলে তার মধ্যে আপনার সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব দৃঢ় হবে এবং আপনার সঙ্গে জীবনযাপনকে তার কাছে আর আনন্দময় মনে হবে না।  

একইসঙ্গে প্রতিশোধের মনোভাব বাড়বে যা মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। অন্যের স্থানে নিজেকে দাঁড় করানোর সূত্রটি এ ক্ষেত্রে সত্যিই কার্যকর। এ প্রসঙ্গে আমিরুল মুমিনিন হজরত আলী (আ.) বলেছেন, ' আপনি নিজের জন্য যা পছন্দ করেন অন্যের জন্যও তাই পছন্দ করুন। নিজের জন্য যেটাকে অপছন্দনীয় মনে করছেন সেটাকে অন্যের জন্য বাছাই করবেন না। অন্যের সঙ্গে এমন আচরণ করুন যে ধরণের আচরণ আপনি অন্যদের কাছে প্রত্যাশা করে থাকেন। 'আপনি যদি কেবল এই একটি বিষয়কে আপনার দাম্পত্য জীবনে গুরুত্ব দেন তাহলে আপনার ঘর শিগগিরই প্রশান্তিময় বেহেশতে পরিণত হবে যা আপনার কাছে অতি আকাঙ্খিত।

শুধু জীবনসঙ্গীর সঙ্গে নয়, নিজের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গেও অন্যদের তুলনা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। আমরা আমাদের সন্তানকে অহরহই বলে থাকি, পাশের বাসার বাবুটাকে দেখেছ? সে তোমার চেয়ে কত ভালো, মা-বাবাকে একটুও জ্বালাতন করে না। পড়াশোনাতেও ভালো, পরীক্ষাতেও ভালো রেজাল্ট করে। কিন্তু তুমিতো তার ধারেকাছেও নেই। অনেকে ভাবেন অন্যের সঙ্গে তুলনা করলে তাদের দেখাদেখি নিজের সন্তানও তাকে শুধরে নেবে। যদি কোনো বাবা-মা এমন করে থাকেন তাহলে বুঝে নিন নিজের অজান্তেই অনেক বড় ভুল করে ফেলছেন। নিজের সন্তানের ভালো করতে গিয়ে তাকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন আপনি নিজেই। বাস্তবতা হলো, কারো সঙ্গে তুলনা করা কোনো সমস্যা কমায় না বরং বাড়ায়। ক্রমাগত তুলনা করার ফলে সন্তানের মনে বিরূপ প্রভাব পড়ে। সন্তানকে সারাক্ষণ বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে তুলনা করে ছোট করা হলে তার আত্মবিশ্বাস গড়ে উঠবে না। সব সময়েই সে নিজেকে দোষী, নিষ্কর্মা এবং ব্যর্থ ভাববে। এমনকি এই সমস্যা বড় হয়েও থেকে যায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। ফলে আত্মবিশ্বাসের অভাবে ক্রমাগত সন্তান পিছিয়ে পড়তে থাকে আশেপাশের সবার চাইতে।

ভাইবোন কিংবা অন্য সম বয়সীদের সঙ্গে ক্রমাগত তুলনা করলে সন্তানের মনে হিংসা তৈরি হয়। যার সঙ্গে আপনি তুলনা করছেন সেই মানুষটির প্রতি চরম ঘৃণা তৈরি হয় ছোট শিশুটির কোমল মনে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে এই রেষারেষি সারাজীবন থেকে যায় সেই সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রে। আপনি হয়তো সন্তানকে একটু বকাবকি করে এরপর নিশ্চিন্তে অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, কিন্তু আপনার সন্তানের কোমল এরইমধ্যে মারাত্মক চাপ তৈরি হয়েছে। এই চাপের বিষয়টি হয়তো আপনি বুঝতে পারছেন না। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তানকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করলে ভীষণ চাপ সৃষ্টি হয় কোমল মনে। যা অনেক সময় ব্যর্থতা এমনকি শারীরিক বিভিন্ন সমস্যার জন্ম দিতে পারে। মনে রাখতে হবে সবাই সব বিষয়ে পারদর্শী হয় না। আপনার সন্তান হয়তো সাহিত্যে খুব ভালো। কিন্তু আপনি ক্রমাগত তাকে তুলনা করছেন এমন একজনের সঙ্গে যে অংকে ভালো।

মনে রাখা জরুরি যে, সবার সব বিষয়ে সমান মেধা থাকে না। সব কিছুতেই একশ'তে একশ' পাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। মানসিক চাপ তৈরি না করে তাকে সামনের দিকে এগোনোর সুযোগ দিতে হবে। আপনার সন্তান যে বিষয়ে পারদর্শী সেটার প্রশংসা করুন। আর যে বিষয়ে দুর্বল সে বিষয়টা আরেকটু যত্ন নিয়ে তাকে পড়ান কিংবা বোঝান। নয়তো আপনার সন্তানের মেধা চাপা পড়ে যাবে তুলনার জঞ্জালে। অন্যের সঙ্গে তুলনা করার কারণে সন্তানের সঙ্গে আপনার সম্পর্কটাও নষ্ট হতে পারে। অন্যের সঙ্গে তুলনায় অতিষ্ঠ হয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সন্তান তার বাবা-মাকে ঘৃণা করা শুরু করে। ফলে তাদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। এই দূরত্ব অনেক সময় চিরস্থায়ী হয়ে যায়। ফলে সন্তানেরা তাদের নিজের মানসিক টানাপোড়েনগুলো তার অভিভাবকের সঙ্গে শেয়ার করতে না পেরে ভুল পথে পা বাড়ায়। এর ফলে বিপদ মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। ছোট্ট তুলনা থেকে ঘটতে পারে মহাবিপদ।#

পার্সটুডে/সোহেল আহম্মেদ/আবুসাঈদ/১৯

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।