জুন ০৫, ২০১৬ ১৩:৪২ Asia/Dhaka

গত কয়েক পর্বে ইরানে সভ্যতার উন্মেষ ও তৎকালীন দুনিয়ায় বিশ্বের প্রথম বৃহত্তম সাম্রাজ্য তথা হাখামানেশীয় সাম্রাজ্যের নানা অবদান সম্পর্কে কিছু কথা বলা হয়েছে।

হাখামানেশীয়রা ইরান উপত্যকার নানা সভ্যতার মধ্যে সংহতি সৃষ্টি করেছিল এবং তারা নির্মাণ করেছিল 'শাহী মহাসড়ক' যা নানা জাতির মধ্যে সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে যোগাযোগ বা লেন-দেনসহ আধ্যাত্মিক এবং বস্তুগত বন্ধন গড়ে তুলেছিল। এই মহাসড়কটি দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের শুষ থেকে শুরু হয়ে মসোপটেমিয়া বা আধুনিক ইরাক-সিরিয়া-লেবানন অঞ্চল থেকে এশিয়া মাইনর হয়ে পশ্চিম তুরস্কের এফসুস শহর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। দু' হাজার ৬৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ মহাসড়ক আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, তথ্য-বিনিময় ও সামরিক কৌশলগত দিক থেকেও ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

হাখামানেশীয়দের 'শাহী মহাসড়ক' পরবর্তীকালে তথা (আশকানিয়ান) পার্থিয়ানদের যুগে সিল্ক বা রেশম মহাসড়কের অন্যতম অংশে পরিণত হয়। ফলে এই সিল্ক-রোড ভূমধ্য-সাগরীয় উপকূল হতে চীনের সিনকিয়াং পর্যন্ত বিস্তৃত ভূ-ভাগকে যুক্ত করে। আর এই মহাসড়কেরও মধ্য-মনি ছিল ইরান তথা পারস্য। দু'হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে সিল্ক-রোড মানব-জাতির নানা ধর্ম, সংস্কৃতি তথা সভ্যতাকে গেঁথেছে একই সুতোর মালায়।

প্রাচ্যের এক-প্রান্তে থাকা চীন, জাপান ও ভারতের বিপরীতে ইরান ছিল বিশ্বের কেন্দ্রস্থলে। তাই তা ছিল বিশ্ব অঙ্গনে সভ্যতাগুলোর লেনদেন ও যোগাযোগের জন্য বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে। একই কারণে ইরানের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন বহির্বিশ্বকেও প্রভাবিত করতো। অন্য কথায় ইরানি সংস্কৃতি অব্যাহত থাকার শর্ত বা নিয়ামক ছিল নানা সংস্কৃতির মধ্যে ইরানের এক সৃষ্টিশীল ও মধ্যস্থতাকারী সংস্কৃতির অস্তিত্ব।

আশকানিয়ান বা পার্থিয়ানরা সিল্করোডের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল। সাসানিয়রাও এই মহাসড়ককে ব্যাপক মাত্রায় কাজে লাগিয়েছে। এ যুগেও আধুনিক বাগদাদ-সংলগ্ন ইরানের রাজধানী মাদায়েন ছিল সিল্ক-রোডের মধ্যমণি।

সাসানিয় যুগ থেকে ইরানিরা কাঁচা রেশমের ব্যবসা ছাড়াও রেশমি কাপড়ের উৎপাদনও শুরু করেছিল। কাঁচা রেশম আসতো চীন থেকে। সাসানীয় যুগে রেশমি কাপড়ের কারখানাগুলো ছিল পশ্চিম ইরানের শুষ, জান্দিশাপুর ও শুষতার অঞ্চলে। রেশম মহাসড়ক থেকে এইসব কাপড় ইউরোপে এমনকি চীন ও জাপানেও রপ্তানি হতো। জাপানের রাজকীয় যাদুঘরে এখনও সাসানিয় যুগের রেশমি কাপড়ের নমুনা সংরক্ষিত রয়েছে।

সাসানিয়রা সিল্ক-রোড অঞ্চলের সাগর-পথগুলোর ওপরও কর্তৃত্ব রাখত। তাদের ছিল শক্তিশালী নৌ-বাহিনী। এই বাহিনী বাণিজ্য-বহরগুলোকে সক্রিয় রাখত এবং পূর্বের সাগরগুলোতে রোমান সাম্রাজ্যকে মোকাবেলা করতো ও তাদেরকে ওই অঞ্চল থেকে প্রায় পুরোপুরি বিতাড়িত করেছিল। ইরানিরা সেই যুগ থেকেই সরণদ্বীপ বা শ্রীলংকা, মালয় উপকূল, ভারতের উপকূলীয় অঞ্চল ও দ্বীপগুলোতে বাণিজ্য-বহর বা কাফেলা নিয়ে আসত। এইসব অঞ্চলে ইরানিদের বাণিজ্য-অফিসও ছিল। এই সাগর-পথগুলোর ওপর ইরানিদের কর্তৃত্ব ইসলামী যুগেও অব্যাহত ছিল।

সাসানিয় যুগেই পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর এবং ভারত মহাসাগর দিয়ে মশলার ব্যবসাও করতো ইরানিরা। এই সাগর-পথটি ইতিহাসে মশলা-পথ নামে খ্যাত। ইরানিদের মাধ্যমে ভারতের মশলা আসতো মেসোপটেমিয়ায় এবং সেখান থেকে স্থল পথে যেতো রোম ও বাইজান্টাইনসহ ভূমধ্য-সাগরীয় অঞ্চলে। মশলা- পথ দিয়ে ইরানি ব্যবসায়ীরা দক্ষিনের ক্যান্টোন বন্দরেও যেতো এবং এই বন্দরে চীনাদের কাছ থেকে সরাসরি কাঁচা রেশম কিনে নিত।

সাসানিয়দের পতনের যুগ পর্যন্ত এবং ট্রান্স-অক্সিয়ানা অঞ্চল তথা মধ্য এশিয়ার অংশ বিশেষ (উজবেকিস্তান,তাজিকিস্তান, কিরগিজিস্তান এবং তুর্কমেনিস্তান ও কাজাকিস্তানের অংশবিশেষ), খাওয়ারিজম বা বর্তমান মধ্য-এশিয়ার পশ্চিমাঞ্চল ও চীনা তুর্কিস্তানের জনগণ মুসলমান হওয়ার আগ পর্যন্ত সিল্ক-রোডের তুর্কিস্তানি বাণিজ্য-পথগুলো ছিল ইরানিদেরই নিয়ন্ত্রণে। বাণিজ্যের মধ্য দিয়ে তাদের সাংস্কৃতিক প্রভাবও ছড়িয়ে পড়তো। এই যুগে ইরানিদের বাণিজ্য বহর যেতো হ্যানয়, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ চীনের ক্যান্টোনসহ নানা বন্দরে। এইসব পথ কয়েক শতক আগ পর্যন্ত বাণিজ্যের পাশাপাশি ইরানি-ইসলামী সংস্কৃতি বিস্তারেরও মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।

ইরান প্রাচীনকাল থেকেই সভ্যতা, শিল্প-সংস্কৃতি, ধর্ম, মাজহাব, চিন্তাধারা এবং সভ্যতাগুলোর নানা ধরনের বিনিময়, প্রচার, আবর্তণ ও বিবর্তণের কেন্দ্রভূমি। ইরান ছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সভ্যতাগুলোর সংযোগ-সেতু। ইরান-সংলগ্ন সিল্ক রোড সেই প্রাচীন যুগ থেকে ইসলামী যুগগুলো পর্যন্ত বিশ্বের ওপর একক কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিল এবং এমনকি বর্তমান আধুনিক যুগেও এর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব কম নয়।

ভারতবর্ষসহ বিশ্বের নানা অঞ্চলে ইরানি এবং আরব চিন্তাবিদ, সুফি-সাধক, কবি-সাহিত্যিক ও ধর্ম-প্রচারকরা তাদের সমৃদ্ধ চিন্তাধারা আর উন্নত ধর্ম ও সংস্কৃতি প্রচার করেছেন। এ জন্য তারা ভ্রমণের নানা পথ, বিশেষ করে সিল্ক-রোড ও মশলা-পথও ব্যবহার করেছেন। তারা এক্ষেত্রে সাহায্য নিতেন ব্যবসায়ীদের। কারণ আরব ও ইরানি ব্যবসায়ীরা ছিল নৌ-পথ ও সাগর-বিদ্যায় পারদর্শী।

চীনা ও তুর্কিরা ইরান উপত্যকায় আসার ফলে পূর্ব এশিয়ার কিছু সংস্কৃতি ইরানে ঢুকে পড়ে। চীনাদের কাগজ ও ভারতীয়দের চায়ের ব্যবসা ছিল এর অজুহাত। ইসলামের আবির্ভাব ও প্রাচ্যে মুসলমানদের বিজয়গুলো জাতিগুলোর মধ্যে সাংস্কৃতিক লেনদেন জোরদার করে। দক্ষিণ, মধ্য ও পূর্ব ইরান জয় করে মুসলমানরা হিজরি প্রথম শতকেই খোরাসান ও ট্রান্স-অক্সিয়ানাও জয় করে এবং ৯৬ হিজরিতে চীনের দুয়ার হিসেবে পরিচিত ‘কাশগাড়’ চলে আসে তাদের হাতে। ফলে সিল্ক-রোডের পূর্ব অংশের ওপর মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর পশ্চিম এশিয়া ও ভূমধ্য-সাগরীয় অঞ্চলও জয় করে মুসলমানরা। ফলে রেশম-মহাসড়কের মূল বা আসল অংশটাও পুরোপুরি মুসলিম কর্তৃত্বাধীন হয়।

খ্রিস্টিয় ১৫ ও ষোড়শ শতকেও সিল্ক-রোড ছিল জাতি এবং সভ্যতাগুলোর অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বা বন্ধনের প্রাণ-রেখা। কিন্তু ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীরা এশিয়ায় উপনিবেশ ও নতুন কিছু স্থল-পথ প্রতিষ্ঠা করায় এবং নতুন নতুন সাগর-পথ আবিস্কৃত হওয়ায় অতীতের ঐতিহাসিক পথগুলো ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যায়। আর একইসঙ্গে বদলে যায় এশিয় জাতিগুলোর স্বাভাবিক জীবন-ধারা ও সামাজিক জীবন।#