অক্টোবর ১৭, ২০২২ ১৫:২৫ Asia/Dhaka

প্রিয় পাঠক-শ্রোতা! ইরানের কালজয়ী গল্পের পসরা "গল্প ও প্রবাদের গল্পের" আজকের আসরে আমরা শুনবো চমৎকার একটি প্রাচীন গল্প। গল্পটি এরকম:

এক লোক প্রতিদিন সকালে মরুপ্রান্তরে যেতো। ঘরে ব্যবহারের জ্বালানি সংগ্রহ করে সেগুলো বিক্রি করার জন্য শহরে যেত। এভাবে তার দিনকাল ভালোই কাটছিলো। একাই ছিল সে। সে কারণে লাকড়ি বিক্রির পয়সায় তার চলে যেতো। একদিন সে মরুতে গিয়ে লাকড়ি সংগ্রহ করে ভাবলো যা হয়েছে, চলবে। শহরের উদ্দেশে রওনা হতে চাইলো। লাকড়ির বোঝা ঘাড়ে চেপে রওনা হলো। দূরে একটা ছায়া তার নজরে এলো। ছায়াটা প্রথম প্রথম তার কাছে অস্পষ্ট ছিল কিন্তু ধীরে ধীরে সেই ছায়ার নড়াচড়া বোঝা গেল। খুব মনোযোগের সাথে বোঝার চেষ্টা করলো কীসের ছায়া ওটা। অস্পষ্টতা দূর হয়ে ছায়াটা তার কাছাকাছি চলে আসছিল। সে আরও বেশি সতর্ক হলো। বুঝতে পারলো একটা পাগলা বুনো উট তার দিকে ধেয়ে আসছে হিংস্রভাবে। যে-কোনো মুহূর্তে ওই উট তাকে পায়ের নীচে পিষে ফেলতে পারে বলে তার মনে হলো এবং স্বাভাবিকভাবেই ভয় পেয়ে গেল।

বলছিলাম জ্বালানির কাঠ সংগ্রহকারী লোকটি বুনো উটকে ধেয়ে আসতে দেখে ভয় পেয়ে গেল। কী করবে, কোনদিকে যাবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলো না। উটও আরো কাছে চলে এলো। উপায়ন্তর না দেখে পিঠের বোঝা ফেলে হালকা হয়ে দৌড়ে পালালো। বোঝা না ফেললে অত দ্রুত দৌড়তে পারতো না। ফলে উট তাকে ধরে ফেলতে পারতো। এখন সে হালকা হলো। এখন উটও দৌড়াচ্ছে সেও দৌড়াচ্ছে। সামনেই সে দেখতে পেল একটা কূপ। এই কূপটা সে প্রতিদিনই তার আসা-যাওয়ার পথে দেখতে পেতো। মাথায় একটা বুদ্ধি এলো তার। যদি কূপের ভেতর লুকানো যায়-কেমন হয়। হ্যাঁ! মুক্তির একমাত্র পথ মনে হয় এটাই। এভাবেই হয়তো বুনো উটের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে।

উট চলে গেলে পরে কূপ থেকে উঠে এসে লাকড়িগুলো পিঠে তুলে নিয়ে আবার শহরমুখী যাত্রা শুরু করা যাবে। চিন্তা অনুযায়ী কাজ শুরু করে দিলো। কূপের পাড়ে পৌঁছলো সে। কূপের মুখে একটা গাছ ছিলো। ওই গাছের দুটি শাখা কূপের মাঝখানে প্রসারিত হয়ে গিয়েছিল। কাঠুরে ওর একটিতে শক্ত করে ধরে ঝুলে থাকলো। মাটি এবং শূন্যতার মাঝখানে ঝুলন্ত সে। এই শাখা দুটিই এখন তার জীবন-মৃত্যুর মাঝে রয়েছে। কিন্তু এভাবে কতক্ষণ ঝুলে থাকা যায়! দুই-তিন মিনিট পরই বুনো উটের পায়ের শব্দ তার কানে এলো। সে ও আর ঝুলে থাকতে পারছিল না। অন্তত পা দুটোকে যদি কোনো কিছুর ওপর রাখা যেতো তাহলে স্বস্তি পাওয়া যেতো। একটু নড়েচড়ে কূপের দেয়ালে পা রাখার চেষ্টা করলো এবং সফল হলো। স্বস্তির একটা নি:শ্বাস ফেললো সে। যাক! আরও কিছুক্ষণ থাকা যাবে। তারপর উঠে চলে যাবো গন্তব্যের দিকে।

কাঠুরে লক্ষ্য করলো এখন আর উটের পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে না। তার মানে হয়তো বুনো উট চলে গেছে। তবু আরেকটু অপেক্ষা করা যাক। কোথায় সে পা রাখলো দেখার জন্য নীচের দিকে তাকালো সে। কূপের ভেতরের অন্ধকারে হুট করেই বোঝা গেল না। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বুঝতে পারলো … হায় আল্লাহ! এ কী দেখলো সে। বিশ্বাসই হচ্ছিলো না তার। কূপের দেয়ালের গর্ত থেকে চারটি সাপের ফনা বেরিয়ে এসেছিল, সেগুলোর মাথার ওপর তার পা রাখা। এক সেকেন্ডের জন্য পা সরালে যে কী হতো-ভেবে সে অজ্ঞান হয়ে যাবার উপক্রম। ভয়ে সে কাঁপতে শুরু করে দিলো। তার দৃষ্টি গেল এবার কূপের তলদেশে। কতোটা গভীর বোঝা গেল না। তবে তার ভয়ের মাত্রা বেড়ে গেল এবং আনমনেই চীৎকার দিয়ে উঠলো। নাহ! আল্লাহ তুমি সাহায্য করো! কূপের তলায় বিশাল দুটি চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো। অজগর তার পতনের অপেক্ষায় তাকিয়ে ছিলো। কী করবে সে এখন। বুঝে উঠতে পারছিলো না।  

আল্লাহকে সে কৃতজ্ঞতা জানালো এজন্য যে ঝুলে থাকা শাখাদুটো বেশ শক্ত সামর্থ ছিলো। আনমনে তার দৃষ্টি গেল উপরের দিকে। বিশাল দুটি মরু-ইঁদুর কূপের মুখে বসে আছে আর মাঝে মাঝে শাখা দুটির গোড়া কাটছে। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে আরও খারাপের দিকেই যাচ্ছে। সে চেষ্টা করলো ইঁদুর দুটোকে তাড়িতে দিতে। কাজ হলো না। তারা শাখা দুটোতে দাঁত চালাতে থাকলো। আশার বাতি এবার নিভে যাবার উপক্রম। মৃত্যু তাকে আলিঙ্গনের অপেক্ষায়। মনে মনে বললো: কাম শেষ তাহলে। মুক্তির তো আর কোনো পথই থাকলো না। না উপরে, না নীচে। জমিন এবং আসমান উভয় দিক থেকে বিপর্যয় ঘিরে ধরেছে। হাত দুটো হাত ভীতি আর ক্লান্তিতে কাঁপতে লাগলো। ঝুলে থাকতে পারছিলো না আর। যে-কোনো মুহূর্তে তার হাত খুলে গেলে কিংবা ইঁদুরেরা শাখাটি কেটে দিলে সোজা অজগরের মুখে গিয়ে পড়বে সে। পা দুটোও তার আগের অবস্থানেই সাপের মাথায়। একটুও নড়াচড়ার সুযোগ নেই।

শাখা দুটির দিকে আবারও তাকালো। ইঁদুরগুলো কেটে যাচ্ছিলো শাখা। ইচ্ছে করছিলো ওদের দিকে কিছু ছুঁড়ে মারতে। অন্তত ওদেরকে সরিয়ে দিতে পারলে শুধু সাপের দিকে নজর দেওয়া যেতো। অন্ধকারে হাত বাড়ালো শাখার দিকে। হাত যেন নরম কিছুতে লাগলো। তাকিয়ে দেখলো মৌচাক। মুখে হাসি ফুটে উঠলো তার। এতো ক্ষুধার্ত সে অথচ বিপর্যয় তাকে ভুলিয়ে রেখেছে। একটু মধু মুখে দিলে তো একটু পাওয়া যেতো। আঙুল ঢুকিয়ে দিলো মৌচাকে। মধু চেটে খেলো। আহা! কী মিষ্টি আর সুস্বাদু। আরেক আঙুল দিলো তারপর আরেকটি তারও পরে অপর একটি। এভাবে সবকটা আঙুল ঢুকিয়ে মধু খেয়ে মজা পেয়ে সে ভুলেই গেল কোথায় কী অবস্থায় আছে এখন। শুধু মধু খেতেই তার মন সায় দিচ্ছিলো, আর কিছুতেই তার খেয়াল নেই-না ইঁদুর না সাপ আর না অজগরের প্রতি। অজগর তো তাকে খাওয়ার অপেক্ষায় হা করে বসে আছে। মধু তাকে ভুলিয়ে রাখলো। হঠাৎ সে একটু নড়ে উঠলো এবং একটু নীচে চলে গেল। এবার তার হুশ ফিরে এলো। মৌচাক থেকে এবার চোখ ফেরালো ইঁদুরের দিকে। শাখা কাটা শেষ প্রায়। কিছুই করার আর অবকাশ নেই।

চূড়ান্ত দু:সময়ে সে অবহেলা করে মধুপানে লিপ্ত ছিল। একটু আগেও যদি তার হুশ হতো! মুক্তির জন্য কিছু একটা চিন্তা তো করতে পারতো! সফল হোক বা না হোক। মধুর লোভে সে সব হারালো। কল্পনা করতে লাগলো সে ঝুলে আছে আকাশ আর মাটির মাঝখানে। সে চীৎকার দিয়ে পড়ে যাচ্ছে কূপের তলায়। তার চীৎকার কূপের ভেতর ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে হতে তাকেই যেন বলছে: বিপদের সময় যে অলস, উদাসীন, নিষ্কর্মা থাকে, মুক্তির কোনো উপায় নিয়ে ভাবে না, তার পরিণতি এরকমই হয়। একটু পরেই সত্যি সত্যি বিকট চীৎকার ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে থেমে গেল। কূপের ভেতর যেন কোনো ঘটনাই ঘটে নি। এমনকি কেউ যেন কূপের ভেতর গাছের শাখায় ঝুলে ছিল না। সাপগুলো তার পায়ের চাপ থেকে রক্ষা পেয়ে গর্তে ঢুকে গেল। উপরে কুপের বাইরে কিছুই নেই-না ইঁদুর, না বুনো উট। কেবল কাঠুরের কেটে আনা লাকড়িগুলো ঝোড়ো বাতাস এদিক ওদিক উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।#

পার্সটুডে/এনএম/১৭