ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১৬ ১৭:৫৩ Asia/Dhaka

সুরা তওবায় এ বিষয়টি ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, মক্কার মুশরিকরা যখন দেখলো যে প্রকাশ্যে ও শক্তি প্রয়োগ করে মুসলমানদের আর দমিয়ে রাখা যাবে না, তখন তাদের অনেকেই মুসলমান সেজে ভেতর থেকে ইসলামের ওপর আঘাত হানার ষড়যন্ত্র করে।

তাই সুরা তওবায় মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র বিল গেটসের স্বীকারোক্তি:

মাইক্রোসফট কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস 'উইন্ডোজ' তৈরির ধারণা প্রখ্যাত মুসলিম ও ইরানি বিজ্ঞানী খাওয়ারেজমি থেকে পেয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন। কনকোর্ডিয়া কলেজে দেয়া এক ভাষণে তিনি বলেছেন: আমি উইন্ডোজ প্রযুক্তি নির্মাণের অনুপ্রেরণা পেয়েছি প্রখ্যাত ইরানি গণিতবিদ খাওয়ারেজমির বই পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে পড়ার সময় আমি 'খাওয়ারেজমির সংখ্যাতত্ত্বের জানালা' শীর্ষক একটি বই ও দ্বিপদী বীজগণিত বিষয়ে এই বিজ্ঞানী ও তাদের দিক থেকে আসন্ন সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে মুসলমানদের সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। এই সুরায় আল্লাহর পথে জিহাদ বা সংগ্রাম এবং মুসলমানদের ঐক্য ও সংহতির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। একদল দুর্বল ঈমানদার বা মুনাফিক নানা অজুহাতে জিহাদে যেতে চাইতো না। এ সুরায় তাদের তিরস্কার করা হয়েছে। জাকাত দেয়া ও সম্পদ পুঞ্জিভূত করার বিষয়েও আলোচনা রয়েছে এ সুরায়।

মুসলিম সমাজ থেকে শির্ক বা অংশীবাদীতা ও মূর্তি পূজার প্রভাব দূর করা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মহান আল্লাহ সুরা তওবায় কাফির-মুশরিকদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ এবং তাদের সঙ্গে মুসলমানদের অতীতের চুক্তিগুলো বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন। মহান আল্লাহ মক্কার মুশরিকদেরকে এ জন্য চার মাস সময় দেন যাতে তারা যথেষ্ট মাত্রায় চিন্তা-ভাবনার সুযোগ পায়। তাদেরকে এই চার মাসের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা কি মুসলমান হবেন নাকি অজ্ঞতা ও কুসংস্কারে পরিপূর্ণ মূর্তি পূজা করে যাবে? কিংবা মক্কা থেকে বেরিয়ে যেতে হবে বা বেকার থাকতে হবে। কারণ, তৌহিদের প্রাণকেন্দ্রে মুশরিকদের নানা অনাচার ও ইবাদতের নামে অশ্লীল তৎপরতা ইসলামী সমাজের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

এটা স্পষ্ট যে মুশরিকদের সঙ্গে সব চুক্তি বাতিল করার ঘোষণা হঠাৎ করেই দেয়া হয়নি। বরং তাদেরকে যথেষ্ট সময় দেয়া হয়েছিল। পবিত্র কুরবানির ঈদের দিন বিষয়টিকে পবিত্র কাবা ঘরের কাছে সবাইকে জানিয়ে দেয়া হয়। ইসলাম যদি নৈতিক সীমারেখা মেনে না চলতো তাহলে কখনও মুশরিকদের জন্য সময়সীমা বেঁধে দিতো না। বরং একতরফাভাবে চুক্তি বাতিল ঘোষণার পর তাদেরকে কোনো সময় না দিয়েই এবং অন্য কথায় কাফিরদেরকে শক্তি সঞ্চয়ের কোনো সুযোগ না দিয়েই তাদের ওপর হামলা চালাতো।

মহান আল্লাহ পবিত্র হজের সময় মুসলমানদেরকে কাফির-মুশরিকদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছেন ও তাদেরকে যথেষ্ট সময় দিয়েছেন যাতে শত্রুরা কোনো অজুহাত দেখানোর সুযোগ না পায় তথা এটা বলতে না পারে যে হঠাৎ করে এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে অপ্রস্তুত অবস্থায় এবং তা কাপুরুষোচিত কাজ! মজার ব্যাপার হলো বেশিরভাগ মুশরিকই চার মাসের সুযোগ নিয়ে ইসলাম সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিয়ে মুসলমান হয়ে যায়।

অবশ্য যেসব মুশরিক মুসলমানদের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ করেনি তাদের সঙ্গে চুক্তি বহাল রাখতে মুসলমানদের নির্দেশ দিয়েছেন মহান আল্লাহ। এ প্রসঙ্গে সুরা তওবার ৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

'তবে যে মুশরিকদের সাথে তোমরা চুক্তি বদ্ধ, অতপরঃ যারা তোমাদের ব্যাপারে কোন ত্রুটি করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্যও করেনি, তাদের সাথে কৃত চুক্তিকে তাদের দেয়া মেয়াদ পর্যন্ত পূরণ কর। অবশ্যই আল্লাহ খোদাভীরুদের পছন্দ করেন।'

সুরা তওবার ১৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:

'মুশরিকরা অধিকার রাখে না আল্লাহর মসজিদ আবাদ করার, যখন তারা নিজেরাই নিজেদের কুফরীর স্বীকৃতি দিচ্ছে। এদের আমল বরবাদ হবে এবং এরা আগুনে স্থায়ীভাবে বসবাস করবে।'

মুশরিকদের সঙ্গে মুসলমানদের চুক্তি বাতিল ঘোষণার পর কেউ কেউ এ ধারণা পোষণ করতেন যে মসজিদগুলোর উন্নয়নে মুশরিকদের ও তাদের সম্পদ ব্যবহার করা যাবে। তারা মনে করতেন এই বিশাল গোষ্ঠীকে দূরে সরিয়ে দেয়া ঠিক হবে না। কারণ, হজ্বের মওসুমে তাদের অংশগ্রহণ সব দিক থেকেই লাভজনক। যেমন, মুশরিকদের অর্থ সাহায্য ব্যবহার করে মক্কার কাবা ঘর সংলগ্ন মসজিদুল হারামের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করা যায়। কিন্তু মহান আল্লাহ মুশরিকদের মাধ্যমে মসজিদগুলোর উন্নয়নকে অবৈধ বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি এটাও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে মাসজিদুল হারাম ও এর আশাপাশে তাদের উন্নয়ন তৎপরতার কোনো মূল্যই নেই। মহান আল্লাহ পবিত্র এবং তাঁর ঘর তথা মসজিদকেও পবিত্র হতে হবে। তাই মসজিদের সেবক ও অভিভাবকদেরকেও হতে হবে সবচেয়ে সৎ ও পবিত্র ব্যক্তি। কাবা ঘর ও মসজিদগুলো থেকে যে কোনো দূষিত হাতকে দূরে রাখতে হবে।

ইসলামের দৃষ্টিতে সৎকর্ম হচ্ছে ঈমানের পবিত্র ফল। কাজ হচ্ছে মানুষের ইচ্ছা ও বিশ্বাসের আলোর প্রতিফলন। মানুষের কাজের ধরন ও রঙ্গে তার বিশ্বাস ও ইচ্ছার ছায়া পড়ে। তাই অশুভ ইচ্ছাগুলো থেকে কখনও লাভজনক কোনো ফল অর্জিত হয় না। মসজিদ ও ইসলামী স্থাপনাগুলো তখনই ভালো মানুষ গড়ার কারখানা বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হবে যখন তার রক্ষকরা হবেন সৎ ও পবিত্র ব্যক্তি এবং পরকাল ও বিচার-দিবসে দৃঢ় বিশ্বাসী হওয়ার পাশাপাশি নামাজ কায়েম করেন ও জাকাত দেন; আর আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকেই ভয় পান না।

মহান আল্লাহ সুরা তওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে বলেছেন:

নিশ্চয় আল্লাহর বিধান ও গননায় (সৃষ্টি জগতে) মাস রয়েছে বারটি, আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। তন্মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান; সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না। আর মুশরিকদের সাথে তোমরা যুদ্ধ কর সমবেতভাবে, যেমন তারাও তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছে সমবেতভাবে। আর মনে রেখো, আল্লাহ মুত্তাকীনদের সাথে রয়েছেন।

পৃথিবীর চারদিকে চাঁদের ঘূর্ণনের আলোকে এক বছরে হয় ১২টি মাস। অর্থাৎ এক বছরে চাঁদ সূর্যের চারদিকে ১২ বার ঘুরে। এটি একটি অপরিবর্তনীয় প্রাকৃতিক বিধান। দিবস ও মাস গণনার এই ব্যবস্থা মানুষের জীবনকে করে সুশৃঙ্ক্ষল। ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম বা পবিত্র মাসগুলো হলো জিলক্বদ, জিলহজ ও মহররম এবং রজব। প্রথমোক্ত তিনটি মাস পরপর আসে। তবে রজব মাস এইসব মাসের সঙ্গে লাগোয়া নয়। হারাম মাসগুলোতে যুদ্ধ করা হারাম বা নিষিদ্ধ। ইসলামের এই নীতি বা ঘোষণা দীর্ঘস্থায়ী নানা যুদ্ধ বন্ধ করতে ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছে। সারা বছরের মধ্যে চার মাস শান্তিতে কাটানোর সুযোগ দেয়া হলে মানুষ গভীরভাবে চিন্তাভাবনার সুযোগ পায় এবং শান্তির সম্ভাবনা বেড়ে যায়। কিন্তু ইসলামের শত্রুরা যদি এইসব নিষিদ্ধ মাসেও যুদ্ধ করে তাহলে মুসলমানদেরকেও আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধ করতে হবে বলে ইসলামের বিধান রয়েছে।

চন্দ্র মাস ঋতু অনুযায়ী হয় না, ফলে একই মাস কখনও শীতকালে আসে, আবার কখনও গ্রীষ্মকালে আসে। মুশরিকরা যখন যুদ্ধের দিনের মধ্যে নিষিদ্ধ মাস পড়ে যেত তখন তারা আগ-পিছ করে নিত। যেমন যুদ্ধ মহররম মাসে পড়লে সে মাসকে সফর মাস ঘোষণা করত ও সফর মাসকে মহররম বলে অভিহিত করত। সুরা তওবার পরবর্তী (৩৭) আয়াতে সেটাই নিষেধ করা হয়েছে।#