এপ্রিল ১৩, ২০১৭ ১২:৪৯ Asia/Dhaka
  • ধরণীর বেহেশত মসজিদ-৩ (মসজিদুল হারাম)

মসজিদ হচ্ছে আল্লাহর ঘর এবং বান্দার ইবাদত-বন্দেগির স্থান। মহান আল্লাহ তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও নৈকট্য লাভের লক্ষ্যে আমাদের জন্য মসজিদকে নিজের ঘর বলে ঘোষণা করেছেন। গত আসরে আমরা মসজিদের আদব বা শিষ্টাচার নিয়ে আলোচনা করেছি। এ পর্বে মসজিদের আরো কিছু আদব সম্পর্কে কথা বলবো; আর অনুষ্ঠানের শেষদিকে থাকবে মসজিদুল হারামের আরো কিছু অংশের পরিচিতি।

পাক-পবিত্রতার সঙ্গে মসজিদে উপস্থিত হওয়া আল্লাহর ঘরের একটি বড় আদব। মহানবী (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি পবিত্রতা অর্জন করে নিজের ঘর থেকে বের হয় এবং মসজিদে গিয়ে জামাতে নামাজ আদায় করে তার জন্য ফেরেশতারা এই বলে আল্লাহর কাছে দোয়া করে যে, হে আল্লাহ! এই ব্যক্তিকে আপনি ক্ষমা করে দিন, ওকে আপনার রহমতের ছায়াতলে আশ্রয় দিন।”

আত্মা ও মনকে পরিশুদ্ধ করার প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে শরীর ও পোশাক পবিত্র করা। সূরা তওবার ১০৮ নম্বর আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, “... সেখানে (অর্থাৎ মসজিদে) সেসব লোক উপস্থিত হয় যারা পবিত্র হতে চায়। আর আল্লাহ পবিত্রদের ভালোবাসেন।”

অন্যদিকে সূরা আ’রাফের ৩১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “হে আদম সন্তান!‍ মসজিদে যাওয়ার সময় সাজসজ্জা পরিধান করো।”

পার্থিব জীবনে আমরা যখন কোনো অনুষ্ঠানে যাই তখন চেষ্টা করি নিজের সেরা পোশাকটি পরিধান করতে। এখান থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, মহান সৃষ্টিকর্তার সামনে উপস্থিত হওয়ার জন্য আমাদের কি ধরনের সাজসজ্জা প্রয়োজন। ইমাম হাসান (আ.) নামাজে দাঁড়ানোর আগে নিজের  সেরা পোশাকটি পরে নিতেন। লোকজন তাঁকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বলেন,  “আল্লাহ নিজে সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। তিনি মসজিদে সেজদা করার সময় পরিপাটি থাকার নির্দেশ দিয়েছেন বলে আমি নামাজ আদায় করার সময় আমার সেরা পোশাকটি পরিধান করি।”

এ ছাড়া, ইমাম আলী (আ.) বলেছেন, পরিচ্ছন্ন পোশাক-আশাক মানুষের মন থেকে দুঃখ-কষ্ট ঝেড়ে ফেলে দেয় এবং এ অবস্থায় আদায় করা নামাজ আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়।  

ইরানের একটি মসজিদে নামায পড়ছেন এক নারী

পোশাকের পাশাপাশি সুগন্ধী ব্যবহারের ওপরও ইসলামে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বিশ্বনবী (সা.) ও তাঁর আহলে বাইত  আলাইহিমুস সালাম জামাতে নামাজ আদায় করার আগে শরীরে আতর ব্যবহার করতেন। ইমাম সাদেক (আ.) বলেছেন, “সুগন্ধী ব্যবহার করে আদায় করা নামাজের সওয়াব সাধারণ নামাজের চেয়ে ৭০ গুণ বেশি।”

নামাজে শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য, সাজগোজ এবং সুগন্ধী ব্যবহারই যথেষ্ট নয়; বরং একাগ্রতাও জরুরি। মসজিদে গিয়ে একাগ্রচিত্ত না হয়ে বাহ্যিকভাবে নামাজের কিছু আনুষ্ঠানিকতা পালন করলে এর কোনো আধ্যাত্মিক সুফল পাওয়া যায় না। হাদিসে এসেছে, মহান আল্লাহ হযরত ঈসা (আ.)কে বলেন, তুমি বনি-ইসরাইলকে বলে দাও পরিশুদ্ধ অন্তর, নেক দৃষ্টি এবং পবিত্র হাত ছাড়া তাদের কেউ যেন আমার কোনো ঘরে প্রবেশ না করে। কাজেই এতক্ষণের আলোচনা থেকে প্রকৃত সৌন্দর্য অর্জনকে আমরা তিনভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথমত, অন্তর হতে হবে পবিত্র। সেখানে কোনো পাপ-পঙ্কিলতাকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। দ্বিতীয়ত, চোখকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে এবং নিষিদ্ধ কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর দিকে তাকিয়ে অন্তরকে কলুষিত করা যাবে না। এবং তৃতীয়ত, হাত থাকতে হবে পবিত্র অর্থাৎ হারাম উপায়ে অর্থ উপার্জনের কাজে হাতকে ব্যবহার করা যাবে না।

এ পর্যায়ে আগের পর্বের ধারাবাহিকতায় মসজিদুল হারামের আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশের সঙ্গে পরিচিত হব।  কাবাঘর নির্মিত হয়েছে কালো ও কঠিন পাথর দিয়ে যা এর উপরের গিলাফ সরালে দেখতে পাওয়া যায়। ১০৪০ হিজরি সালে বর্তমান কাবাঘরটি সর্বশেষ পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। আল্লাহর নবী হযরত ইসমাইল (আ.) সর্বপ্রথম কাবাঘরের দেয়ালগুলোকে রক্ষা করার লক্ষ্যে এগুলোকে পর্দা বা গিলাফ দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলেন। বর্তমানে কাবাঘর ঢাকতে কালো রঙের গিলাফ ব্যবহার করা হয় যার উপরের লেখাগুলো স্বর্ণ দিয়ে লেখা। প্রতি বছর হজের মৌসুমের আগে এই গিলাফ পরিবর্তন করা হয়। কাবাঘরের ভিতরেও রয়েছে আরেকটি গিলাফ যেটি কয়েক বছর পরপর পরিবর্তন করা হয়। এর কারণ হচ্ছে, বাইরের গিলাফটি রোদ, বৃষ্টি, ঝড় এবং হাজিদের হাতের ছোঁয়ায় নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু ভিতরের গিলাফের এ ধরনের কোনো ক্ষতি হয় না বলে এটিকে প্রতি বছর পরিবর্তন করার প্রয়োজন পড়ে না।

কাবা শরীফের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে জমজম কূপ। হাজরে আসওয়াদের দিকে কাবাঘর থেকে ২১ মিটার দূরে এই কূপ অবস্থিত। এই কূপ সৃষ্টি সম্পর্কে বলা হয়েছে, হযরত ইব্রাহিম (আ.) নিজের স্ত্রী হাজেরা ও শিশুপুত্র ইসমাইলকে আল্লাহর নির্দেশে মক্কার উষ্ণ ও শুষ্ক মরুদ্যানে রেখে চলে যান। তিনি স্ত্রী-পুত্রকে আল্লাহর হাতে সঁপে দিয়ে যান। অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই বিবি হাজেরার কাছে থাকা পানি শেষ হয়ে যায়। এ সময় পানির সন্ধানে তিনি সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে সাতবার দৌড়ে যাওয়া-আসা করেন। কিন্তু কোথাও পানির সন্ধান না পেয়ে  শিশুপুত্রের কাছে ফিরে এসে দেখেন ইসমাইলের পায়ের ধাক্কায় অলৌকিকভাবে মাটি ফেটে পানি বেরিয়ে আসছে। পানিকে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে দেখে বিবি হাজেরা বলে ওঠেন ‘জম জম’ অর্থাৎ থেমে যাও। তিনি পানিকে ছড়িয়ে না গিয়ে এক জায়গায় জড়ো হতে বলতে চেয়েছিলেন। সেইসঙ্গে তিনি নিজে আশপাশের মাটি ও বালু জড়ো করে পানি জমানোর চেষ্টা করেন।

বিবি হাজেরা হয়তো ভেবেছিলেন পানির এই ঝর্ণাধারা থেমে যেতে পারে। তাই তিনি নিজের কাছে থাকা পানির পাত্র পূর্ণ করে নেন। কিন্তু জমজমের সে পানি আর কখনোই থেমে যায়নি। সেদিনের ঘটনার কয়েকদিনের মধ্যে জুরহুম গোত্রের লোকজন সেখানে পানির অস্তিত্ব টের পেয়ে যায়। তারা এই পানির উৎসের পাশেই বসতি গড়ে তোলে। ততদিনে পানির সে উৎসটি একটি বড় কূপে পরিণত হয়েছে। প্রথমদিকে জমজম কূপের পানি ছিল সেখানকার বসতির একমাত্র পানির উৎস। কিন্তু ধীরে ধীরে আশপাশে আরো কিছু কূপ সৃষ্টি হয়।

জমজম কূপ

 

প্রতি বছর হজের মৌসুমে কাবাঘরে প্রচুর মানুষের সমাগম হওয়ার কারণে তাদের পানির চাহিদা মেটাতে আরো কিছু পানির উৎসের প্রয়োজন দেখা দেয়। এ কারণে ইসলামের আবির্ভাবের অনেক আগে থেকে মক্কার অন্যতম পেশা ছিল হজের মৌসুমে মানুষের পানির চাহিদা মেটানো। ইসলামের আবির্ভাবের সময় এই দায়িত্ব ছিল রাসূলুল্লাহ (সা.)’র চাচা আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিবের হাতে। ইসলাম আসার পর আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব মসজিদুল হারামের আঙিনায় রোক্‌ন ও মাকামের মধ্যবর্তী স্থানে প্রথম জমজমের পানি বিতরণের স্থান নির্ধারণ করেন।  পরবর্তীতে এই মসজিদ সংস্কার ও এর পরিসর বাড়াতে গিয়ে স্থানটি মসজিদুল হারামের পূর্ব পাশে নিয়ে আসা হয়।

১৯৫৫ সালে জমজমের পানি উঠানোর জন্য সেখানে পাম্প বসানো হয়। পরবর্তীতে হাজিদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে মসজিদুল হারামের আঙিনায় আরো কিছু পরিবর্তন আনা হয় যার মধ্যে ছিল জমজম কূপের পানি উঠানো ও বিতরণের স্থানটি আন্ডারগ্রাউন্ডে নিয়ে যাওয়া। ১৯৬৪ সালে এ কাজটি সম্পন্ন হয়। এ সময় কূপটিকে ভূপৃষ্ঠ থেকে ৫ মিটার গভীরে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এটির মুখের আকারকে এক মিটার থেকে বাড়িয়ে আড়াই মিটার করা হয়। কয়েক বছর আগে জমজম কূপের সেই ভূগর্ভস্থ স্থাপনাও ভেঙে ফেলা হয়। বর্তমানে জমজমের পানি পাম্পের মাধ্যমে মসজিদুল হারামের বাইরে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে পরিশোধন করার পর পাইপলাইনের সাহায্যে আবার মসজিদুল হারামে সরবরাহ করা হয়।

জমজম কূপের পানির গুরুত্ব ও তা পান করার ফজিলত সম্পর্কে অনেক হাদিস রয়েছে। মহানবী (সা.) জমজমকে বলেছেন, “পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পানির কূপ।” তিনি সব সময় এই কূপের পানি পান করতেন। যেখানেই যেতেন ওজু করা ও খাওয়ার জন্য সাহাবীদেরকে বলতেন জমজমের পানি নিয়ে আসতে। বর্তমানে সারাবিশ্বের  মুসলমানরা হজ বা ওমরাহ করতে মক্কায় গেলে নিকটাত্মীয়দের জন্য উপহার হিসেবে জমজমের পানি নিয়ে আসেন। এটি এখন মুসলিম সমাজের একটি সুন্দর সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। #