মে ২৭, ২০১৭ ১৯:৪৬ Asia/Dhaka

সব ঐশী ধর্মে মহান আল্লাহর ইবাদতের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে এবং এই ধর্মীয় বিধান পালনের জন্য প্রতিটি ধর্মের রয়েছে ইবাদতের বিশেষ স্থান। ইসলাম ধর্মে নামাজ আদায়সহ অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগী করার জন্য নির্ধারিত স্থান হলো মসজিদ।

ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ নামাজ জামায়াতে আদায় করার ওপর বিশেষ তাগিদ দেয়া হয়েছে; যদিও একাকী নামাজও আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য। জামায়াতে নামাজ আদায় করার বিশেষ গুরুত্বের কারণে নবুওয়াতপ্রাপ্তির পর হযরত আলী (আ.) ও বিবি খাদিজা সালামুল্লাহি আলাইহাকে নিয়ে জামায়াতে নামাজ আদায় করতেন বিশ্বনবী (সা.)।

এ সম্পর্কে আফিফ কান্দি নামের একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, “আমি ছিলাম একজন ব্যবসায়ী। প্রতি বছর ব্যবসার কাজে মক্কা সফরে যেতাম। এক বছর মক্কায় গিয়ে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখলাম। বেশিরভাগ মানুষকে দেখলাম কাবায় সংরক্ষিত কাঠ ও পাথরে তৈরি মূর্তিগুলোর পূজা করছে। কিন্তু মাত্র তিন ব্যক্তিকে দেখলাম শামের দিকে (মসজিদুল আকসার) মুখ করে ইবাদত করছে। আমি রাসূলের চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের কাছে জানতে চাই- এরা কারা এবং কি করছে? উত্তরে আব্বাস বলেন, যাকে সামনে দাঁড়ানো দেখছো সে আমার ভাতিজা মোহাম্মাদ, তার পেছনে ডানদিকে যে ছেলেটিকে দেখছো সে আমার আরেক ভাতিজা আলী এবং যে নারী বামদিকে দাঁড়িয়ে আছে সে মোহাম্মাদের স্ত্রী খাদিজা। ওরা নামাজ আদায় করছে। আল্লাহর এই আসমানের নীচে এই তিনজন ছাড়া আর কেউ তাদের ধর্মের অনুসারী নেই।”

জামায়াতে নামায

মসজিদ তৈরির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য জামায়াতে নামাজ আদায় করা। পেশ ইমামের ইমামতিতে এই নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর পেছনে মুসল্লিরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সারিবদ্ধভাবে নামাজে দাঁড়িয়ে যান। নামাজের জামায়াত দেখলে মনে হবে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল এসব মানুষ একই পথের যাত্রী- একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যে যেতে উন্মুখ। ধনী-গরীব, সাদা-কালোর ভেদাভেদ এখানে নেই। সবাই একসঙ্গে রুকু ও সিজদা করছেন এবং সবার মধ্যে গভীর ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয়েছে। কেউ কাউকে অবহেলা বা ঘৃণা করছে না, বংশ মর্যাদার কারণে কাউকে সামনে বা পেছনে দাঁড়াতে হয়নি। এখানে সবার পরিচয় এক। সবাই মুসলমান ও এক আল্লাহর বান্দা। যিনি মসজিদে আগে এসেছেন তিনি সামনের কাতারে দাঁড়াতে পেরেছেন। তার বংশ পরিচয় বা সামাজিক মর্যাদা জানতে চায়নি কেউ।

জামায়াতে নামাজ আদায়ের আরেকটি উপকারিতা হচ্ছে মুসলমানদের মধ্যে সময়ানুবর্তিতার চর্চা থাকা। একটি নির্দিষ্ট সময়ে সবাই জামায়াতে শরীক হন। জামায়াতে নামাজ আদায়ের ফজিলত সম্পর্কে বলা হয়েছে, যদি কোনো জামায়াতের নামাজে ১০ জনের বেশি মুসল্লি উপস্থিত হয় তাহলে সেই নামাজের সওয়াব লিখে শেষ করা যায় না। এমনকি সব সাগর-মহাসাগরের পানি যদি কালিতে পরিণত হয়, ভূপৃষ্ঠের সব গাছ যদি কলমে পরিণত হয় এবং সব মানুষ, জীন ও ফেরেশতা মিলে যদি একসঙ্গে লিখতে থাকে তারপরও ওই জামায়াতের এক রাকাত নামাজের সওয়াব তারা লিখে শেষ করতে পারবে না। একবার এক অন্ধ ব্যক্তি আল্লাহর রাসূলের কাছে জানতে চান- আমি অন্ধ এবং একা। বাড়ি থেকে একাকী মসজিদে যাওয়া কঠিন। আমি কীভাবে জামায়াতে নামাজ আদায় করব? এ প্রশ্নের উত্তরে বিশ্বনবী (সা.) বলেন, প্রয়োজনে বাড়ি থেকে মসজিদ পর্যন্ত একটি রশি টানাও। তারপর প্রতি নামাজের সময় সেই রশি ধরে ধরে হলেও মসজিদে গিয়ে জামায়াতে নামাজ আদায় করো।

জামায়াতে নামাজ আদায় করার গুরুত্ব এত বেশি যে, মহান আল্লাহ দ্বীনের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময়ও জামায়াত ত্যাগ করার অনুমতি দেননি। সূরা নিসার ১০২ নম্বর আয়াতে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, “(যুদ্ধের সময়) যখন আপনি তাদের মধ্যে থাকেন, অতঃপর নামাযে দাঁড়ান, তখন যেন একদল দাঁড়ায় আপনার সাথে এবং তারা যেন স্বীয় অস্ত্র সাথে নেয়। অতঃপর যখন তারা সেজদা সম্পন্ন করে, তখন আপনার কাছ থেকে যেন সরে যায় এবং অন্য দল যেন আসে, যারা নামায পড়েনি। অতঃপর তারা যেন আপনার সাথে নামায পড়ে এবং আত্মরক্ষার হাতিয়ার সাথে নেয়।”

এই আয়াতে দেখা যাচ্ছে,  যুদ্ধের সময়ও আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর সাহাবীদেরকে জামায়াতে নামাজ আদায়ের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দেয়া হয়নি। এখান থেকে শান্তির সময়ে জামায়াতে নামাজ আদায় করার গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়।

আল আকসা মসজিদ

পাঠক! এ পর্যায়ে আমরা মুসলমানদের তৃতীয় পবিত্রতম মসজিদ ও প্রথম ক্বেবলা মসজিদুল আকসা নিয়ে আলোচনা করব।  রাসূলুল্লাহ (সা.)’র সাহাবী আবু যর গিফারি বলেছেন, “আমি রাসূলে খোদার কাছে জিজ্ঞাসা করি, ইয়া রাসূলুল্লাহ, পৃথিবীর বুকে প্রথম স্থাপিত মসজিদের নাম কি? তিনি উত্তরে বলেন, মসজিদুল হারাম। আমি জিজ্ঞাসা করি তারপর কোন মসজিদ? তিনি বলেন, মসজিদুল আকসা।”

বর্ণনায় এসেছে, মসজিদুল হারাম তৈরির ৪০ বছর পর আদি পিতা হযরত আদম (আ.) মসজিদুল আকসা নির্মাণের কাজে হাত দিয়েছিলেন। হযরত ঈসা (আ.)’র জন্মের প্রায় দুই হাজার বছর আগে হযরত ইব্রাহিম (আ.) এবং পরবর্তীতে তাঁর দুই সন্তান হযরত ইয়াকুব ও হযরত ইসহাক (আ.) এ মসজিদ সংস্কার করেন। তারও বহু বছর পর হযরত সুলায়মান (আ.) মসজিদুল আকসাকে পুনর্নির্মাণ করেন। নবুওয়াতপ্রাপ্তির পর ১৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বনবী (সা.) এই মসজিদ অভিমুখী হয়ে নামাজ আদায় করেন। ততদিন পর্যন্ত মহান আল্লাহর নির্দেশে মসজিদুল আকসাই ছিল মুসলমানদের কিবলা।

মসজিদুল আকসার এত বেশি ফজিলতের আরেকটি কারণ হচ্ছে, এখান থেকে বিশ্বনবী (সা.)’র মিরাজ গমন। সূরা বনি ইসরাইলের প্রথম আয়াতে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, “পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যান্ত-যার চার দিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি যাতে আমি তাঁকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই।” কাজেই দেখা যাচ্ছে, পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ এই মসজিদের নাম উল্লেখ করেছেন। আরবি ‘কুসা’ শব্দের অর্থ দূর এবং আকসা শব্দের অর্থ আরো দূরে। মক্কা ও মদীনা থেকে এই মসজিদের অবস্থান অনেক দূরে ছিল বলে এর নাম দেয়া হয়েছে মসজিদুল আকসা। আর এই মসজিদ থেকে মিরাজ গমনের কারণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার জন্য ঊর্ধ্বাকাশে গমন করার উড্ডয়নস্থল হিসেবে মসজিদের চেয়ে উত্তম স্থান আর হতে পারে না। কাজেই কোনো মুমিন ব্যক্তি আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে চাইলে সে যেন মসজিদে আগমন করে। 

৬৮৫ থেকে ৭১৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ৩০ বছর ধরে এই মসজিদের বর্তমান স্থাপনাটি নির্মাণ করা হয়। মসজিদুল আকসাকে হারাম শরীফও বলা হয়। সপ্তম শতকে এর নির্মাণের সময়ে এর পাশেই ছিল পাহাড় ফেটে বেরিয়ে আসা পানির ঝর্না। মুসলমানরা এই পানি ব্যবহার করে হারাম শরীফের আঙ্গিনায় নানা সমাজসেবামূলক তৎপরতা চালাতেন। জর্দানের আওকাফ ও ইসলামি পবিত্র স্থাপনা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি সংস্থা বর্তমানে হারাম শরীফের প্রশাসনিক ও অর্থ বিভাগের দেখভাল করে। এ মসজিদে বর্তমানে পরিচালিত হচ্ছে ইসলামি যাদুঘর, লাইব্রেরী, মাদ্রাসা, দারুল কুরআন ও দারুল হাদিস বিভাগ।

মসজিদুল আকসার ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, এই মসজিদে নামাজ আদায় করলে ৫০ হাজার গুণ বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। আরেক হাদিসে বলা হয়েছে, এই চারটি মসজিদ সফর না করা পর্যন্ত তোমরা ভ্রমণ শেষ করো না। মসজিদ চারটি হচ্ছে- মসজিদুল হারাম, মসজিদে নববী, মসজিদুল আকসা এবং মসজিদে কুফা। #

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/২৭