মে ৩১, ২০১৭ ২০:২৭ Asia/Dhaka

আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য ইসলামে যত ইবাদতের কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে নামাজ অন্যতম। গভীর মনযোগ এবং বিশুদ্ধ চিত্তে এই ইবাদত করার জন্য মসজিদ হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম স্থান। এ কারণে পবিত্র কুরআনের যতবার মসজিদের কথা এসেছে ততবারই এই পবিত্র স্থানে দাঁড়িয়ে ইবাদত-বন্দিগিতে মশগুল হতে বলা হয়েছে।

আল্লাহ রব্বুল আলামিন সূরা আ’রাফের ২৯ নম্বর আয়াতে বলেছেন, “আপনি বলে দিন: আমার প্রতিপালক সুবিচারের নির্দেশ দিয়েছেন এবং তোমরা প্রত্যেক মসজিদের সময় (অর্থাৎ প্রত্যেক নামাজের সময়) স্বীয় মুখমণ্ডল সোজা রাখ এবং তাঁকে খাঁটি আনুগত্যশীল হয়ে ডাক।...”

এখান থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মসজিদ হচ্ছে একাগ্রচিত্তে ইবাদত করার স্থান এবং এই ইবাদত বলতে বিশেষভাবে নামাজ আদায়ের কথা বলা হয়েছে। কাজেই মসজিদে বসে এই ইবাদতের বিঘ্ন ঘটে এমন কাজ করতে ইসলামে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।

মসজিদের অন্যতম আদব হচ্ছে, এখানে প্রবেশ করেই বসার আগে দুই রাকাত ‘তাহিয়্যাতুল মসজিদ’ বা ‘দুখুলুল মসজিদ’ নামাজ আদায় করা। বেশিরভাগ ফকিহ অভিমত দিয়েছেন: “মসজিদে প্রবেশ করেই বসে পড়ার মাধ্যমে যাতে আল্লাহর ঘরের সম্মান নষ্ট না হয় সেজন্য তাহিয়্যাতুল মসজিদ নামাজ পড়তে হবে।” এখান থেকে বোঝা যায়, মসজিদে প্রবেশের পর দুনিয়াবি কাজ করা বা কথা বলাকে ইসলাম অনুমোদন করেনি।

অবশ্য ‘তাহিয়্যাতুল মসজিদ’ নামাজের অর্থ এই নয় যে, মুসল্লিকে মসজিদে প্রবেশের পর ফরজ নামাজ পড়ার আগে বাধ্যতামূলকভাবে এই নফল নামাজটি আদায় করতে হবে; বরং এর মূল উদ্দেশ্য মসজিদে প্রবেশ করেই কোনো না কোনো নামাজে মশগুল হওয়া। কেউ মসজিদে প্রবেশ করেই যদি দেখে জামায়াত শুরু হয়ে গেছে তাহলে সেই জামায়াতে অংশে নিলেই তার ‘তাহিয়্যাতুল মসজিদ’ নামাজ আদায় করার কাজ হয়ে যাবে। তবে উত্তম হচ্ছে, জামায়াত শুরু হওয়ার আগেই হাতে সময় নিয়ে মসজিদে উপস্থিত হয়ে তাহিয়্যাতুল মসজিদ আদায় করা।

আল্লাহর রাসূলের সাহাবী হযরত আবু যর গিফারি বলেন, “একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে বলেন, হে আবু যর! মসজিদের বিশেষ সালাম ও তাহিয়্যাত রয়েছে। আমি আরজ করলাম, মসজিদের তাহিয়্যাত সম্পর্কে একটু বুঝিয়ে বলবেন কি? তিনি বললেন: মসজিদে প্রবেশ করেই দুই রাকাত নামাজ আদায় করবে।”  এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, মসজিদে প্রবেশ করেই তাহিয়্যাতের নামাজ আদায় করা মানে আল্লাহর ঘরকে সালাম দেয়া। এর মাধ্যমে মসজিদের প্রতি মুমিনের চরম শ্রদ্ধা ও ভক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটে। মুসল্লি এই আমলের মাধ্যমে একথা বোঝানোর চেষ্টা করেন, মসজিদ আর দশটি স্থাপনার মতো সাধারণ কোনো গৃহ নয় বরং এর আবেগ-অনুভূতি রয়েছে। কাজেই এখানে অন্যান্য ঘরের মতো যেমন খুশি তেমনভাবে যাতায়াত করা যাবে না।

আল আকসা মসজিদ

পাঠক! এ পর্যায়ে আমরা মুসলমানদের প্রথম ক্বেবলা মসজিদুল আকসা সম্পর্কে আরো কিছু আলোচনা করব। এই মসজিদের নামকরণ হয়েছে এখানকার একটি টিলার নামে। অতীতে বাইতুল মোকাদ্দাস শহরের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত একটি বিষমবাহু টিলার নাম ছিল আল-আকসা। এই টিলার দক্ষিণ পাশে প্রায় সবুজ রঙের গম্বুজবিশিষ্ট যে মসজিদটি রয়েছে সেটিই বর্তমানে আল-আকসা মসজিদ হিসেবে সুপরিচিত। কিন্তু ইসলামে যে মসজিদুল আকসার কথা বলা হয়েছে সেটি শুধু এই মসজিদের সংক্ষিপ্ত এই স্থাপনায় সীমাবদ্ধ নয় বরং সেই মসজিদুল আকসার একটি অংশ মাত্র। ইসলামে মসজিদুল আকসা বলতে এখানকার গোটা কমপ্লেক্সকে বোঝানো হয়েছে।

এই কমপ্লেক্সের একটি বিখ্যাত অংশের নাম ‘কুব্বাতুস সাখরা’ মসজিদ। অনেকে এই মসজিদকে আল-আকসা মসজিদ ভেবে ভুল করেন। আট কোনবিশিষ্ট যে ভবনটির শীর্ষে সোনালি রঙের গম্বুজ দেখা যায় সেটিই কুব্বাতুস সাখরা মসজিদ। মসজিদুল আকসার ঠিক বাম দিকে এই স্থাপনাটি অবস্থিত। এই স্থাপনার নামকরণ একটি বিশেষ পাথরের কারণে হয়েছে যেটির উপর থেকে রাসূলুল্লাহ (সা.) মিরাজের রাতে আল্লার সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন বলে বলা হয়। নাসের খসরু ভ্রমণ কাহিনীতে বলা হয়েছে, মিরাজের রাতে আল্লাহর রাসূল মসজিদুল আকসায় গেলে এই পাথরটি দাঁড়িয়ে তাঁকে সম্মান জানায় এবং তিনি ঊর্ধ্বাকাশে গমন করলে পাথরটি শূন্যে উঠে ভাসতে থাকে। এই পাথরের নীচে রয়েছে একটি গুহা যার ভেতর ১০ ব্যক্তি একসঙ্গে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতে পারে। এ কারণে এই গুহাকে মসজিদুস সাখরা বলা হয়।

কুব্বাতুস সাখরা মসজিদের ভেতরে এক কেন্দ্রভিত্তিক দু’টি বৃত্তাকার সারিতে অনেকগুলো পিলার বা স্তম্ভ রয়েছে। ছোট বৃত্তের চার প্রান্তে রয়েছে চারটি বড় স্তম্ভ এবং তার ভেতরে স্থাপিত হয়েছে আরো ১২টি ছোট পিলার। সোনালি গম্বুজটি এই পিলারগুলোর শীর্ষে বসানো রয়েছে। গম্বুজের ভেতরের অংশে কুফি হরফে রয়েছে সুন্দর ক্যালিগ্রাফি যার দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪০ মিটার। এখানে কুরআন মজিদের বিভিন্ন আয়াতের পাশাপাশি এই স্থাপনাটি নির্মাণের ইতিহাস লেখা রয়েছে। গম্বুজের বাইরের অংশ এমন একটি মূল্যবান ধাতু দিয়ে তৈরি করা হয়েছে যে, এটি সারাক্ষণ হলুদ রং বিকিরণ করে। এই কুব্বাতুস সাখরা বর্তমানে নারীদের নামাজের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

এই মসজিদটি এমন একটি বিশাল প্ল্যাটফর্মের ওপর দাঁড়িয়ে আছে যেটির চারদিক দিয়ে আটটি সিঁড়ি গিয়ে মসজিদুল আকসার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এই সিঁড়িগুলোকে বলা হয় ‘মাওয়াজিন’। এই সিঁড়িগুলো নির্মাণ করা হয়েছে অনিন্দ্য সুন্দর কারুকাজ দিয়ে।

কুব্বাতুস সাখরা মসজিদের পূর্ব পাশে ছয়টি স্তম্ভের উপরে দাঁড়িয়ে আছে ‘কুব্বাতুস সিলসিলা’ নামের আরেকটি গম্বুজ। এখানে এক সময় পাথরের তৈরি একটি বিশাল আসন ছিল যেখানে বসতেন আল্লাহর নবী হযরত দাউদ (আ.)। সাধারণ মানুষের অভাব অভিযোগ শোনা, বিচারকাজ পরিচালনা এবং ধর্মীয় বিধিবিধান ঘোষণার জন্য সকাল ও সন্ধ্যায় তিনি এই আসনে বসতেন। পবিত্র কুরআনের সূরা সোয়াদের ২৬ নম্বর আয়াতে এ বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে, “হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি, অতএব, তুমি মানুষের মাঝে ন্যায়সঙ্গতভাবে রাজত্ব কর এবং খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না।”

মসজিদুল আকসা কমপ্লেক্সের আরেকটি অংশের নাম বুরাক প্রাচীর। মিরাজের রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সা.) বুরাক নামক যে বাহনে চড়ে ঊর্ধ্বাকাশে গমন করেছিলেন সেটি এই প্রাচীরের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছিল। এ কারণে পরবর্তীতে মুসলমানরা এই জায়গায় এই নামে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। অবশ্য ইহুদিবাদীরা দাবি করে, প্রাচীরটি সলোমান মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের অংশ। এই দাবির সত্যতা প্রমাণের জন্য তারা এই মসজিদ কমপ্লেক্সে অনেক খোঁড়াখুড়ি করেও কোনো প্রমাণ আবিষ্কার করতে পারেনি।

বিংশ শতাব্দির গোড়ার দিকে  ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী শাসনামলে ইহুদিরা মসজিদুল আকসা কমপ্লেক্সের মালিকানা দাবি করে। ব্রিটিশ সরকার সে মালিকানা ইহুদিদের দেয়ার উদ্যোগ নিলে ফিলিস্তিনি মুসলমানরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। শুরু হয় বুরাক বিপ্লব। ১৯২৯ সালের ওই বিপ্লবে ১১৯ মুসলমান শহীদ ও ২৩২ জন আহত হন। এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে বন্দি করা হয়। মুসলমানদের ওপর ওই পাশবিক গণহত্যার জের ধরে আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন গঠিত হয়। ওই কমিশন ১৯৩০ সালের জানুয়ারি মাসে এক প্রতিবেদনে ঘোষণা করে, মসজিদুল আকসার মালিক মুসলমানরাই।

কিন্তু এরপরও ইহুদিবাদীরা বসে নেই। তারা এখনো দাবি করে যাচ্ছে, সলোমান মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের উপর মসজিদুল আকসা স্থাপন করা হয়েছে। তারা সলোমান মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পেতে এই মসজিদ কমপ্লেক্সের নীচে অব্যাহতভাবে খননকাজ চালিয়ে যাচ্ছে।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/আশরাফুর রহমান/৩১