ধরণীর বেহেশত মসজিদ-৯ (কুফা মসজিদ-১)
'ধরণীর বেহেশত মসজিদ' ধারাবাহিকের এই পর্বের প্রথমে এতেকাফের ফজিলত বর্ণনা করা হবে। আর দ্বিতীয় অংশে থাকবে ইরাকের কুফা মসজিদ সম্পর্কে আলোচনা।
ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের সর্বোৎকৃষ্ট ও পবিত্রতম স্থান হচ্ছে মসজিদ। দুনিয়াবি সবকিছুর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে মহান আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য মসজিদের চেয়ে উৎকৃষ্ট ও সম্মানিত স্থান আর হতে পারে না। এ কারণে ঈমানদার ব্যক্তিরা বছরের নির্ধারিত কিছু দিনের পুরোটা সময় মসজিদে অবস্থান করেন। আল্লাহ তায়ালার ইবাদত-বন্দেগি করার উদ্দেশ্যে মসজিদে এই অবস্থানকে বলা হয় এতেকাফ। এতেকাফরত ব্যক্তি রোজা রাখা ও নামাজ আদায়ের পাশাপাশি কুরআন তেলাওয়াত এবং দোয়া ও মুনাজাতে মশগুল থাকেন।
ইসলামের সকল ইবাদত ও শিক্ষার মূল চেতনা হচ্ছে ঐক্য ও সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করা। বৈরাগী জীবন বা সমাজচ্যুত হয়ে একাকী জীবন যাপনের কোনো স্থান ইসলামে নেই। কিন্তু সেই ইসলামই বস্তুগত জীবনে আপাদমস্তক ডুবে থাকা একজন মানুষকে কয়েকদিনের জন্য হলেও আল্লাহর ধ্যানে মশগুল করার সুযোগ দিতে এতেকাফের ব্যবস্থা করেছে। একজন মানুষকে দুনিয়াবি জীবনের প্রায় সব কাজের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে এতেকাফে বসতে হয়। এর ফলে তিনি নিজের আত্মিক অবস্থা সম্পর্ক চিন্তাভাবনা করার পাশাপাশি আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্ক কোন অবস্থায় আছে তা সঠিকভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ পান। দৈনন্দিন ব্যস্ত জীবনে যেসব ভুল মানুষের চোখে ধরা পড়ে না সেসব ভুল এই সময়ে মানুষ বুঝতে পারে। ফলে একজন এতেকাফরত ব্যক্তি বেশি বেশি তওবা ও এস্তেগফার করেন এবং কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর কাছে বেশি বেশি ক্ষমা চান। ফলে এতেকাফে বসলে মানুষের জন্য গুনাহ মাফ করার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়।
এতেকাফরত অবস্থায় নামাজ, রোজা, কুরআন তেলাওয়াত, দোয়া, মুনাজাত ও এস্তেগফারসহ যত ইবাদত করা হয় তার সবগুলোর লক্ষ্য একটিই; আর তা হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা। তবে এগুলোর প্রত্যেকটি ইবাদতের আলাদা আলাদা লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য রয়েছে। যেমন- নামাজ মানুষকে গুনাহ ও পাপকাজ থেকে বিরত রাখে। অন্যদিকে রোজা মানুষের ধৈর্য্য ও সহনশীলতাকে বাড়িয়ে দেয়। সার্বিকভাবে এতেকাফে গয়রুল্লাহ বা আল্লাহ ছাড়া অন্য সব কিছুর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার অনুশীলন হয়। এতেকাফরত ব্যক্তি আল্লাহর ঘর মসজিদ থেকে নিজের ঘরে পর্যন্ত যেতে পারেন না। তিনি আল্লাহর কালাম অর্থাৎ কুরআনের আয়াত, নামাজ ও দোয়া ছাড়া অন্য কোনো কথা মুখে উচ্চারণ করেন না। তিনি আল্লাহর নির্ধারিত লক্ষ্যের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করেন নেন।
ইসলাম আসার আগে অন্যান্য ঐশী ধর্মেও এতকাফের নিয়ম চালু ছিল। যেমন- হযরত মূসা (আ.)’র ওপর নিজ উম্মতকে হেদায়েতের গুরুদায়িত্ব অর্পিত থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর সঙ্গে একান্তে সময় কাটাতে তিনি তুর পাহাড়ে চলে গিয়েছিলেন। হযরত সুলায়মান (আ.)ও বাইতুল মোকাদ্দাসে এতেকাফে বসতেন। আল্লাহর আরেক নবী হযরত জাকারিয়া এবং বিবি মরিয়ম সালামুল্লাহি আলাইহাও বাইতুল মোকাদ্দাসে এতেকাফে বসেছিলেন। আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)ও নবুওয়াত প্রাপ্তির আগে বছরের কয়েক মাস হেরা পর্বতের গুহায় আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হতেন। নবুওয়াত প্রাপ্তির পর তিনি আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে দিকনির্দেশনা পেয়ে এতেকাফের নিয়মাবলী বর্ণনা করেন। তিনি জানান, এতেকাফে বসতে হবে মসজিদে। তিনি নিজে প্রতি বছর পবিত্র মাহে রমজানের শেষ ১০ দিন নিয়মিত মসজিদে এতেকাফে বসতেন। ফলে মুসলমানদের মধ্যে এই সুন্নত চালু হয়ে যায় যা আজও বহাল আছে এবং কেয়ামত পর্যন্ত বহাল থাকবে বলে আশা করা যায়।
পাঠক, আসরের এ পর্যায়ে ইরাকের কুফা শহরে অবস্থিত কুফা মসজিদ নিয়ে আলোচনা করা হবে। বর্ণনায় এসেছে, মক্কার মসজিদুল হারাম ও মদীনার মসজিদে নববীর পর মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ হচ্ছে এই কুফা মসজিদ। অনেকে মসজিদুল আকসার চেয়েও এই মসজিদের মর্যাদা বেশি বলে উল্লেখ করেছেন। কোনো কোনো বর্ণনা অনুযায়ী, আদি পিতা হযরত আদম (আ.) সর্বপ্রথম বিশাল আয়তনের এ মসজিদটি নির্মাণ করেন। মহাপ্লাবনের পর হযরত নূহ (আ.) মসজিদটি পুনর্নির্মাণ করেন। বর্ণনায় আরো এসেছে, হযরত আলী (আ.) কুফার জনগণকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, “মহান আল্লাহ তোমাদের এমন কিছু দান করেছেন যা আর কাউকে দেননি। তিনি এই জায়গাকে (কুফা মসজিদ) বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। এই মসজিদ ছিল আদমের ঘর, নূহের অবস্থান কেন্দ্র, ইদ্রিসের বসবাসস্থল, ইব্রাহিম খলিলুল্লাহর নামাজের স্থান এবং আমি এখানে নামাজ আদায় করছি।... একদিন এখানে ইমাম মাহদি (আ.)সহ সব মুমিন মুসলমান নামাজ আদায় করবেন। খবরদার! এই মসজিদ থেকে কখনো মুখ ফিরিয়ে নিও না। এখানে নামাজ আদায় করবে, সেই নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করবে এবং মনের আকাঙ্ক্ষাগুলো আল্লাহর কাছ থেকে চেয়ে নেবে।”
মহানবী (সা.)’র উদ্ধৃতি দিয়ে ইমাম সাদেক (আ.)ও এই মসজিদ সম্পর্কে বলেছেন, “নিঃসন্দেহে এটি বেহেশতের অন্যতম বাগান। এখানে প্রতি রাকাত ফরজ নামাজের সওয়াব এক হাজার গুণ এবং নফল নামাজের সওয়াব ৫০ গুণ। কোনো ইবাদত না করেও এই মসজিদে শুধুমাত্র বসে থাকাও সওয়াবের কাজ। মানুষ যদি এই মসজিদের মর্যাদা অনুধাবন করত তাহলে পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে শিশুদের মতো হামাগুড়ি দিয়ে হলেও এখানে ছুটে আসত।”
১৭ হিজরিতে মুসলিম সেনাবাহিনী যখন বর্তমান ইরান ও ইরাকের সীমান্তে অবস্থান করছিল তখন তৎকালীন খলিফার পক্ষ থেকে হযরত সালমান ফারসি ও খুযাইফা ইবনে ইয়ামানকে সেনাবাহিনীর ঘাঁটি স্থাপনের জন্য উপযুক্ত স্থান খোঁজার দায়িত্ব দেয়া হয়। তাঁরা দু’জন খুঁজে খুঁজে কুফা এলাকাকে এ কাজের জন্য উপযুক্ত মনে করেন। এ কারণে তারা দুই রাকাত শুকরানা নামাজ আদায় করেন। মুসলিম বাহিনী এখানে সর্বপ্রথম যে স্থাপনা নির্মাণ করে সেটি ছিল কুফা মসজিদ। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই এই মসজিদ মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। ৩৬ হিজরিতে ইমাম আলী (আ.) কুফা নগরীতে প্রবেশ করেই কুফা মসজিদে যান এবং সেখানে সাধারণ মানুষের উদ্দেশে ভাষণ দেন।
কুফা মসজিদের একেকটি স্থানের নাম একেকজন নবী-রাসূলের নামে নামকরণ করা হয়েছে। এই স্থানগুলোকে বলা হয় মাকাম। মসজিদটির যে স্থানে দাঁড়িয়ে হযরত আলী (আ.) নামাজ আদায় করতেন সেটি মুসলমানদের কাছে, বিশেষ করে আহলে বাইতের অনুসারীদের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত স্থান। এখানেই ইবনে মুলজাম নামক পাপিষ্ঠ খারেজি হযরত আলী (আ.)’র মাথায় বিষ মাখানো তরবারি দিয়ে আঘাত করেছিল। কুফা মসজিদের একটি অংশের নাম দিক্কাতুল কাযা। এখানে বসে হযরত আলী (আ.) বিচারকাজ পরিচালনা করতেন। এখানে রয়েছে নাতিদীর্ঘ একটি স্তম্ভ যাতে পবিত্র কুরআনের সূরা নাহলের ৯০ নম্বর আয়াতের একাংশ লেখা আছে যার অর্থ হচ্ছে- আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা ও সদাচারণের নির্দেশ দেন। মসজিদটির সপ্তম স্তম্ভের নাম হযরত আদম (আ.)। এটি হচ্ছে সেই জায়গা যেখানে মহান আল্লাহ হযরত আদম (আ.)’র তওবা কবুল করেছিলেন। হযরত আলী (আ.) এই স্তম্ভের কাছে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তেন বলে এই স্তম্ভকে আমীরুল মু’মিনিন (আ.) স্তম্ভও বলা হয়।
কুফা মসজিদের একটি স্তম্ভ হযরত জিব্রাইল (আ.)’র নামে নামকরণ করা হয়েছে। মে’রাজের রাতে রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় যাচ্ছিলেন তখন কুফা এলাকায় পৌঁছালে জিব্রাইল আমিন আল্লাহর রাসূলকে বলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি এখন কুফা মসজিদের কাছে অবস্থান করছেন। এটি শোনার পর বিশ্বনবী মহান আল্লাহর অনুমতি নিয়ে এখানে দু’রাকাত নামাজ আদায় করেন। যে জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি এ নামাজ আদায় করেছিলেন সে স্থানটি বর্তমানে মাকামে জিব্রাইল নামে পরিচিত।
কুফা মসজিদের আরেকটি অংশের নাম মাকামে ইমাম সাজ্জাদ (আ.)। বর্ণনায় এসেছে, এই স্থানে দাঁড়িয়ে ইমাম সাজ্জাদ (আ.) চার রাকাত নফল নামাজ আদায় করেছিলেন। এই মসজিদের মসজিদের মাঝখানের একটি ঢালু জায়গার নাম ‘সাফিনাতুন নূহ’ বা নূহের কিশতি। মহা প্লাবনের পর হযরত নূহ (আ.)’র কিশতি এখানে এসে মাটিতে ঠেকেছিল বলে জানা যায়।#
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/আশরাফুর রহমান/৭