জুন ২০, ২০১৭ ১৪:৫৯ Asia/Dhaka

গত আসরে আমরা বলেছিলাম, মসজিদে যেসব ইবাদত করা হয় তার অন্যতম হচ্ছে এতেকাফ। যেকোনো সময় যেকোনো স্থানে বসে আল্লাহর ইবাদত করা যায়।

কিন্তু পবিত্র কুরআন ও হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, ইবাদতের জন্য আল্লাহ তায়ালার কাছে কোনো কোনো স্থানের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। এসব স্থানে আল্লাহর নৈকট্য লাভ এবং দোয়া কবুল হওয়ার সুযোগ অন্যান্য স্থানের চেয়ে অনেক বেশি। এসব বিশেষ স্থানের মধ্যে আল্লাহর ঘর মসজিদের মর্যাদা সবার উপরে। তবে অন্যান্য ইবাদত সব জায়গায় করা গেলেও এতেকাফে বসতে হয় একমাত্র মসজিদে। মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীতে এতেকাফে বসার ওপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। কিন্তু যাদের পক্ষে তা সম্ভব নয় তারা জামে মসজিদে এতকাফে বসতে পারেন।

 

এতেকাফ হচ্ছে এমন একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুশোভিত  ইবাদত যার জন্য স্থান ও কাল নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এটি একটি নফল ইবাদত হলেও কেউ যদি তা শুরু করে এবং প্রতি বছর করতে থাকে তাহলে তা তার জন্য ওয়াজিব হয়ে যায়। তখন আর এতেকাফ ত্যাগ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। এতেকাফের সর্বনিম্ন সময় নিয়ে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমাম মালেক ও ইমাম আবু হানিফাসহ সুন্নি ফকিহগণ বলেছেন, এতেকাফের সর্বনিম্ন সময় হচ্ছে এক রাত ও একদিন। তবে শিয়া ফকিহগণ বলেছেন, এতকাফ কবুল হওয়ার জন্য অন্তত তিন দিন ও তিন রাত মসজিদে অবস্থান করা জরুরি।

 

রমজান মাসে এতেকাফে বসার জন্য বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। অন্য সময়েও এতেকাফে বসা যাবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে এমন কোনো দিন যেন এতেকাফে বসা না হয় যখন রোজা রাখা যায় না। কারণ, এতেকাফের প্রধান শর্তই হচ্ছে রোজা রাখা। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে রোজা রাখা যায় না। এ ছাড়া, সফরে কিংবা অসুস্থ থাকলে রোজা রাখা সম্ভব হয় না। আর কেউ যদি এতেকাফে বসে ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভাঙে তবে তার এই ইবাদত আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। রমজান মাসের শেষ ১০ দিন এতেকাফে বসার সর্বোত্তম সময়। এ ছাড়া প্রতি চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫তম দিন এতেকাফে বসা যায়। প্রতি মাসের এই তিন দিন রোজা রাখায়ও বিশেষ ফজিলত রয়েছে।

 

এতেকাফের প্রধান শর্তই হচ্ছে, বিরতিহীনভাবে মসজিদে অবস্থান করা। ইমাম আলী (আ.) বলেছেন, এতেকাফরত ব্যক্তির মসজিদ থেকে বের হওয়া উচিত নয়। অবশ্য অতি জরুরি প্রয়োজন হলে ভিন্ন কথা। সেক্ষেত্রে প্রয়োজন মিটিয়ে অনতিবিলম্বে মসজিদে ফিরে আসতে হবে। যেসব প্রয়োজনে এতেকাফরত ব্যক্তি মসজিদ থেকে বের হতে পারবেন সেসবের মধ্যে রয়েছে, জুমার নামাজ বা জানাযার নামাজে অংশগ্রহণ, রোগীকে দেখতে যাওয়া, মুমিন ব্যক্তির প্রয়োজন মেটানো ইত্যাদি। এসব প্রয়োজন মেটানোর পরপরই কোনো বিলম্ব ছাড়াই মসজিদে ফিরে আসতে হবে।  ইসলামে মুমিন ব্যক্তির প্রয়োজনে তার সাহায্যে এগিয়ে যাওয়ার গুরুত্ব  এত বেশি যে, এতেকাফরত ব্যক্তিকে এই কাজে মসজিদ থেকে বাইরে বের হওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে। মুমিন ব্যক্তিকে সাহায্য করে আবার তিনি মসজিদে ফিরে এতেকাফ চালিয়ে যেতে পারবেন। ফলে ওই সাহায্যের বিষয়টি এতেকাফেরই অংশ বলে গণ্য করবেন আল্লাহ তায়ালা।

 

একবার মাইমুন বিন মেহরান নামের এক ব্যক্তি ইমাম হাসান (আ.)’র সঙ্গে মসজিদে এতেকাফে বসেছিলেন। এ অবস্থায় একদিন এক ব্যক্তি এসে ইমামের কাছে বললেন, “হে রাসূলের সন্তান! এক ব্যক্তি আমার কাছে টাকা পাবে। সেই পাওনা টাকার জন্য সে এখন আমাকে জেলে দিতে চায়।”  ইমাম হাসান বললেন, “আমার কাছে তো টাকা নেই যে, তোমার ঋণ শোধ করে দেব।” তখন লোকটি বলল: “আপনি শুধু আমার সঙ্গে এসে ওই লোকটির সঙ্গে কথা বলুন। তাহলেই সে নিরস্ত হবে।” একথা শুনে ইমাম জুতা পায় দিয়ে ওই লোকের সঙ্গে হাঁটা শুরু করলেন। আমি পেছন থেকে ডেকে ইমামকে বললাম, “হে রাসূলের সন্তান! আপনি কি এতেকাফের কথা ভুলে গেছেন?” উত্তরে তিনি বললেন: আমি মোটেই ভুলে যাইনি। তবে আমার পিতার কাছে শুনেছি, রাসূলে করিম (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি তার দ্বীনি ভাইয়ের প্রয়োজন মেটানোর জন্য চেষ্টা করে তার মর্যাদা আল্লাহর কাছে এমন যে, সে যেন হাজার হাজার বছর পৃথিবীতে জীবিত ছিল এবং এর প্রতিটি দিন রোজা রেখেছে এবং প্রতিটি রাত ইবাদত করে কাটিয়েছে।”

আসরের এ পর্যায়ে আমরা গত আসরের ধারাবাহিকতায় ইরাকের কুফা শহরে অবস্থিত কুফা মসজিদ নিয়ে আরো আলোচনা করব।

বর্ণনায় এসেছে, ইমাম সাদেক (আ.) একদিন কুফা মসজিদের কাছাকাছি এসে তাঁর বাহন থেকে নেমে পড়েন। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটি হচ্ছে কুফা মসজিদের সীমানা। এই সীমানা নির্ধারণ করেছেন হযরত আদম (আ.)। কাজেই ঘোড়ায় চড়ে এই সীমানা অতিক্রম করা আমার পছন্দ নয়।” এখান থেকে বোঝা যায়, আদি পিতা ও নবী হযরত আদম (আ.)’র সময় থেকে এই মসজিদ আল্লাহর ইবাদতগৃহ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। কিন্তু পরবর্তীতে হযরত নূহের তুফানসহ আরো নানা কারণে এই মসজিদ ধ্বংস ও বারবার পুনর্নির্মিত হয়েছে।

 

কুফা মসজিদের আয়তন ১১ হাজার বর্গমিটার। এর চারপাশে রয়েছে ১০ মিটার উঁচু প্রাচীর। এটির স্তম্ভের সংখ্যা ১৮৭টি, এতে ৩০ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট মিনার রয়েছে চারটি। মসজিদে প্রবেশের দরজার সংখ্যা পাঁচটি।

 

ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় এই মসজিদে আগমন করেছেন বহু নবী-রাসূল ও আওলিয়া। ইমাম আলী (আ.) এই মসজিদে নামাজ পড়েছেন, এখানকার মিম্বারে দাঁড়িয়ে খুতবা দিয়েছেন, এখানে বসে বিচারকাজ পরিচালনা করেছেন এবং সবশেষে এই মসজিদের মেহরাবে মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে শাহাদাতবরণ করেছেন। কুফা মসজিদের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে রয়েছে একটি ছোট ঘর। বলা হয় এই ঘরে আলী (আ.) বসবাস করতেন। ঘরটির অদূরে রয়েছে ইমামের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী মেইসাম তাম্মারের কবর।

 

মসজিদের বাইরে দক্ষিণ-পূর্ব কোণে রয়েছে হযরত মুসলিম ইবনে আকিল (আ.)’র মাজার। মুসলিম ইবনে আকিল ছিলেন আবু তালেবের নাতি এবং ইমাম হোসেইন (আ.)’র চাচাত ভাই। ইমাম হোসেইন (আ.) তাঁকে কুফার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং সেখানকার জনগণের কাছ থেকে বায়াত বা আনুগত্যের শপথ নেয়ার জন্য পাঠিয়েছিলেন।

 

মুসলিম ইবনে আকিল কুফায় প্রবেশ করে ইমাম হোসেইনের পক্ষে ১৮ হাজার মানুষের বায়াত গ্রহণ করেন। কিন্তু ইবনে যিয়াদ কুফার গভর্নর হয়ে আসার পর পরিস্থিতি পাল্টে যায় এবং মুসলিমের পক্ষে মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা কঠিন হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে প্রশাসনের ভয়ে ১৮ হাজার অনুসারীর মধ্যে মুসলিম ইবনে আকিলকে সহযোগিতা করতে একজনকেও পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ইবনে যিয়াদের নির্দেশে একটি উঁচু ভবনের ছাদ থেকে নীচে ফেলে দিয়ে মুসলিমকে হত্যা  করা হয়। তাঁর মৃতদেহ ইবনে যিয়াদের প্রাসাদের কাছেই দাফন করা হয়। ইমাম হোসেইন (আ.)’র অনুসারীরা যাতে এই কবর জিয়ারত করতে আসতে না পারে সেজন্যই এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। ৬৫ হিজরি সাল পর্যন্ত এই কবরটি এভাবে উন্মুক্ত অবস্থায় ছিল। ওই বছর মুখতার সাকাফি এখানে প্রথম মাজার নির্মাণের নির্দেশ দেন।

 

মুসলিম ইবনে আকিলের মাজারের পাশেই রয়েছে হানি বিন উরওয়াহ’র কবর। তিনি ছিলেন ইমাম হোসেইন (আ.)’র একনিষ্ঠ অনুসারী। কুফা সফরে এসে উরওয়াহ’র বাড়িতে উঠেছিলেন মুসলিম ইবনে আকিল এবং তাঁরা দু’জন একসঙ্গে শহীদ হয়ে যান। #

 

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/২০