জুন ২৮, ২০১৭ ১৭:১৭ Asia/Dhaka

আমরা সবাই যেমনটি জানি, মসজিদ হচ্ছে জামায়াতে নামাজ আদায় করার স্থান। পেশ ইমামের ইমামতিতে দলবদ্ধভাবে সবাই মিলে নামাজ আদায় করাকে জামায়াতের নামাজ বলা হয়।

ফজর, জোহর, আসর, মাগরিব ও এশা- এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ছাড়া আরো যেসব নামাজ জামায়াতে পড়া যায় সেগুলো হচ্ছে, জুমার নামাজ, দুই ঈদের নামাজ এবং জানাযার নামাজ।

 

জামায়াতের নামাজ হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে আড়ম্বরপূর্ণ ও সবচেয়ে বেশি আধ্যাত্মিক মহিমায় পূর্ণ সামাজিক জমায়েত। এই নামাজের মর্যাদা ও সওয়াব অনেক বেশি। জামায়াতে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে একজন মুমিন ব্যক্তি যখন এক এক কদম করে মসজিদের দিকে অগ্রসর হয় তখন প্রতিটি কদমের জন্য তার নামে নেকি লেখা হতে থাকে। আর যে জামায়াতে ১০ জনের বেশি মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন সে নামাজের সওয়াব এত বেশি হয় যে, তার হিসাব আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কারো পক্ষে রাখা সম্ভব নয়।

 

হাদিসে এসেছে, “যে ব্যক্তি জামায়াতের নামাজকে ভালোবাসে, তাকে আল্লাহ এবং ফেরেশতারা ভালোবাসেন।” মহানবী (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি জামায়াতে নামাজের উদ্দেশ্যে মসজিদে রওনা দেয় তার প্রতি কদমের জন্য ৭০ হাজার সওয়াব লেখা হয়, তার আমলনামা থেকে ৭০ হাজার গুনাহ কাটা যায় এবং আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা ৭০ হাজার গুণ বেড়ে যায়। আর এ অবস্থায় যদি তার মৃত্যু হয় তাহলে কবরে  তাকে সঙ্গ দেয়ার জন্য ৭০ হাজার ফেরেশতা পাঠানো হয়। এসব ফেরেশতা পুনরুত্থান দিবসের আগ পর্যন্ত এই বান্দার জন্য এস্তেগফার পড়তে থাকে।

 

রাসূলে আকরাম (সা.) নবুওয়াত প্রাপ্তির পর থেকে আমৃত্যু জামায়াতে নামাজ আদায় করেছেন। সর্বাবস্থায় এমনকি অসুস্থ অবস্থায়ও জামায়াতে নামাজ ত্যাগ করেননি তিনি। এ কারণে তাঁর সাহাবীরাও কঠিনভাবে জামায়াতের নামাজের প্রতি একনিষ্ঠ ছিলেন।  বর্ণনায় এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসুদ বলেন, “রাসূলের যুগে কেউ জামায়াতের নামাজ ত্যাগ করত না। তবে, যেসব মুনাফিকের নিফাকের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল তারাই শুধু জামায়াতের নামাজ ত্যাগ করত। এ ছাড়া, কেউ কঠিন অসুখে পড়লে নামাজে আসত না। অবশ্য এরকম বহু সাহাবীকে দেখা গেছে, যারা অসুস্থ অবস্থায় অন্য দুই ব্যক্তির কাঁধে ভর দিয়ে মসজিদে এসেছেন জামায়াতে নামাজ আদায় করতে।”

 

ইমাম ছাড়া আর একজন মুসল্লি হলেই জামায়াতে নামাজ আদায় করা যায়। তবে জুমার নামাজের জন্য ইমামের পাশাপাশি আরো অন্তত তিনজন মুসল্লি থাকতে হয়। জামায়াতে নামাজ আদায় করার সওয়াব সম্পর্কে বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, “জিবরাইল আমার কাছে এসে বলল: আল্লাহ তায়ালা আপনাকে সালাম দিয়েছেন এবং আপনার জন্য এমন একটি উপহার পাঠিয়েছেন যা এর আগে অন্য  কোনো নবীকে দেননি। আমি জিজ্ঞাসা করলাম: জিবরাইল! সেই উপহারটি কি? উত্তরে সে জানাল: সময়মতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামায়াতে আদায় করুন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম: এতে আমার উম্মত কতখানি সওয়াবের অধিকারি হবে? জিবরাইল বলল: যখন জামাতে দুই ব্যক্তি শরীক হবে তখন সে নামাজের সওয়াব হবে ‌১৫০ গুণ, তিনজনের জামায়াতের সওয়াব ৭০০ গুণ, চারজনের জামায়াতের সওয়াব ১,২০০ গুণ। যদি পাঁচজনে মিলে জামায়াত হয় তাহলে তার সওয়াব ২,১০০ গুণ এবং ১০ জনে মিলে জামায়াত হলে তার সওয়াব সাত লাখ ২,৮০০ গুণ। আর যে জামায়াতে ১০ জনের বেশি মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন সে জামায়াতের সওয়াব হিসাব করা জিন বা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।”

 

আসরের এ পর্যায়ে আমরা ইরাকের কুফা নগরীতে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত মসজিদ তথা ‘সাহলা মসজিদ’ নিয়ে আলোচনা করব। এই মসজিদটি হিজরি প্রথম শতাব্দিতে কুফায় পুনর্নির্মাণ করা হয়। কুফা মসজিদ থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এটি অবস্থিত। সাহলা অর্থ এমন এলাকা যার ভূমি লাল রঙের বালু দিয়ে ঢাকা। এরকম একটি এলাকায় এ মসজিদটি অবস্থিত বলে এ মসজিদের নাম দেয়া হয়েছে সাহলা মসজিদ। এটিকে ‘কুরা’ মসজিদ নামেও অভিহিত করা হয়েছে।  আমীরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ.)’র একটি বর্ণনা অনুযায়ী এ নামকরণ করা হয়েছে। তিনি বলেছেন: কুফা শহরে চারটি পবিত্র স্থান আছে যেগুলোর প্রত্যেকটিতে মসজিদ রয়েছে। এর মধ্যে সাহলা মসিজদ ছিল আল্লাহর নবী হযরত খিযির (আ.)’র বসবাসস্থল। এই মসজিদে প্রবেশকারী প্রতিটি ব্যক্তির মনের দুঃখকে আল্লাহ তায়ালা ভুলিয়ে দেন। আমরা আহলে বাইত এই মসজিদকে ‘কুরা মসজিদ’ নামে অভিহিত করে থাকি।”

 

নবী-রাসূল ও আহলে বাইত আলাইহিমুস সালামের নামে এই মসজিদের বিভিন্ন মেহরাবের নামকরণ করা হয়েছে। এই স্থানগুলোকে মাকাম নামেও অভিহিত করা হয়। মসজিদের পশ্চিম ও উত্তর দেয়ালের মাঝখানে অবস্থিত একটি মেহরাবের নাম হযরত ইব্রাহিম (আ.) মাকাম। বর্ণনায় এসেছে, সাহলা মসজিদ এক সময় ছিল হযরত ইব্রাহিম (আ.)’র বাসস্থান। এখান থেকেই তিনি ‘আমালাকা’ জাতির কাছে ঐশী ধর্মের দাওয়াত দিয়ে গিয়েছিলেন। আমালাকা ছিল সুঠামদেহ ও অতি উচ্চতাবিশিষ্ট জনগোষ্ঠীর জাতি। হযরত ইব্রাহিম (আ.) নিজ স্ত্রী হাজেরাকে নিয়ে মক্কায় আসার আগ পর্যন্ত আমালাকা জাতির সঙ্গ বসবাস করেছেন।

 

মসজিদে সাহলার আরেকটি মাকামের নাম মাকামে হযরত ইদ্রিস (আ.)। এই মাকামটিকে বাইতুল খিযির নামেও অভিহিত করা হয়। এই মাকাম সম্পর্কে ইমাম সাদেক (আ.) বলেছেন,  কেউ কুফায় আসলেই যেন সাহলা মসজিদে গিয়ে দু’রাকাত নফল নামাজ আদায় করে। এই মসজিদে হযরত ইদ্রিস (আ.) বসবাস করতেন বলে এখানে বসে আল্লাহ তায়ালার কাছে ইহকালীন ও পারলৌকিক যেকোনো কিছু চাইলে তিনি সে চাওয়া পূর্ণ করেন। হযরত ইদ্রিস (আ.) এখানে বসে কাপড় সেলাই করতেন ও নামাজ পড়তেন। কেউ এই মসজিদে এসে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করলে আল্লাহ তাকে হযরত ইদ্রিসের সমমর্যাদা দান করবেন এবং দুনিয়ার সব বিপদআপদ ও শত্রুর ষড়যন্ত্র থেকে তাকে রক্ষা করবেন।”

 

সাহলা মসজিদের পূর্ব পার্শ্বে রয়েছে মাকামে হযরত সালেহ (আ.)। এ ছাড়া, মসজিদের মাঝখানে মাকামে ইমাম সাদেক (আ.) অবস্থিত। বর্ণনায় এসেছে, ইমাম সাদেক (আ.) এখানে কিছুদিন অবস্থান করে ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল ছিলেন। সাহলা মসজিদের আরেকটি মাকামের নাম মাকামে ইমাম মাহদি (আ.)। মাকামে ইমাম সাজ্জাদ ও মাকামে হযরত ইউনুসের মধ্যবর্তী স্থানে এটির অবস্থান। বর্তমানে এখানে একটি ছোট ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।

 

মর্যাদার দিক দিয়ে মসজিদুল হারাম, মসজিদে নববী, মসজিদুল আকসা ও কুফা মসজিদের পরই সাহলা মসজিদের অবস্থান।  ইমাম সাদেক (আ.) এ সম্পর্কে তাঁর ঘনিষ্ঠ সঙ্গী আবু বাসিরকে বলেছেন, “হে আবু বাসির! দৈব দৃষ্টিতে আমি দেখতে পাচ্ছি,  রাসূলের সন্তান ইমাম মাহদি (আ.)’র আবির্ভাবের পর তিনি সপরিবারে এই মসজিদে আসবেন।” এ সময় আবু বাসির জিজ্ঞাসা করেন, “এই মসজিদ কি ইমামের বাসস্থান হবে?” ইমাম সাদেক জবাব দিলেন, “হ্যা। এই মসজিদে এর আগে বসবাস করেছেন হযরত ইদ্রিস ও হযরত ইব্রাহিম আলাইমুস সালাম। এ ছাড়া, মহান আল্লাহ পৃথিবীতে যত নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন তাদের সবাই এই মসজিদে নামাজ আদায় করেছেন। ফেরেশতারা এই মসজিদে এসে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হন। আমার বাড়ি এই মসজিদের কাছে হলে আমি জীবনের সব নামাজ এখানে আদায় করতাম।”#

 

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/২৮