রংধনু আসর: জ্ঞানী বহলুলের আধ্যাত্মিক উপদেশ
রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদ ছিলেন একজন জালিম শাসক।
তার শাসনামলে নবীবংশের মহান ইমামদের ওপর জুলুম-নির্যাতন এবং আলেম ও প্রতিবাদীদের কারাগারে নিক্ষেপ ও হত্যা বহু ঘটনা ঘটেছে। হারুনুর রশিদ একবার ওহাব ইবনে উমার নামের এক বিখ্যাত আলেমকে বাগদাদের প্রধান বিচারপতি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আহলে বাইতপন্থি ওই আলেম একজন জালিম শাসককে সহযোগিতা করতে চাননি বলে বাকী জীবন ‘পাগল' হবার ভান করে রাজদরবার থেকে দূরে ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ‘বহলুল পাগল' এবং 'জ্ঞানী বহলুল' নামে পরিচিতি পান। আজকের আসরে আমরা বিখ্যাত সুফিসাধক শেখ জুনাইদ বাগদাদি ও আবদুল্লাহ ইবনে মোবারকের প্রতি বহলুলের দুটি আধ্যাত্মিক উপদেশের ঘটনা তোমাদের শোনাব। আর সবশেষে থাকবে একটি গান। আশাকরি আমাদের আজকের আয়োজনও তোমাদের ভালো লাগবে।
(শেখ জুনাইদ বাগদাদির প্রতি বহলুলের নসিহত)
ইরাকের বিখ্যাত আরেফ শেখ জুনাইদ বাগদাদি একবার সফরের উদ্দেশ্যে বাগদাদ থেকে তার কয়েকজন মুরীদকে নিয়ে বের হলেন। কিছুদূর যাওয়ার পর শেখ জুনাইদ আধ্যাত্মিক ব্যক্তি বহলুলের কথা জিজ্ঞেস করলেন। মুরীদরা বলল: “সে তো পাগল; তার কাছে আপনার প্রয়োজন কি?”
জুনাইদ বললেন : “তাঁকে খুঁজে বের করো এবং আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে যাও; আমার দরকার আছে।”
মুরীদরা তাঁকে খুঁজতে বের হল এবং মরুভূমিতে তাঁর দেখা পেল। তারপর শেখ জুনাইদ বাগদাদিকে বহলুলের কাছে নিয়ে গেল।
শেখ জুনাইদ বহলুলের কাছে পৌঁছে দেখলেন, মাথার নীচে একটা ইট দিয়ে বহলুল শুয়ে আছেন এবং গভীর চিন্তায় ডুবে আছেন।
শেখ জুনাইদ বাগদাদি তাঁকে সালাম দিলেন। বহলুল সালামের জবাব দিলেন এবং আগের মতই চিন্তামগ্ন রইলেন। এসময় শেখ জুনাইদ নিজের পরিচয় দিলে বহলুল বললেন : “তুমি কি সেই শেখ বাগদাদি যে মানুষকে হেদায়াত করে?”
শেখ জুনাইদ বললেন: “জ্বী। কিন্তু আমি আপনাকে উপদেশ দিতে আসিনি, নিতে এসেছি। আমাকে কিছু উপদেশ দিন।
বহলুল বললেন, তোমার উপদেশ শোনার কী প্রয়োজন? তুমি নিজেই তো একজন মহাজ্ঞানী মানুষ।
জুনাইদ বললেন, কী যে বলেন হুজুর! আমি একজন মুখ্য-সুখ্য মানুষ। আপনার কাছ থেকে কিছু মূল্যবান কথা না শুনলে আমার তৃপ্তি মিটবে না।
বহলুল বললেন, ঠিকাছে। আমি তোমাকে তিনটি প্রশ্ন করব। যদি ঠিক ঠিক উত্তর দিতে পারো তাহলে কিছু উপদেশ দেবো। তুমি কি জানো- কিভাবে খানা খেতে হয়?”
শেখ জুনাইদ বললেন : “হ্যাঁ, জানি। প্রথমে ‘বিসমিল্লাহ’ বলি। তারপর নিজের সামনে থেকে খাওয়া শুরু করি, ছোট করে লোকমা নেই এবং মুখের মধ্যে ডানদিকে লোকমা দেই, তারপর আস্তে আস্তে চিবিয়ে খাই। অন্যদের খাবারের দিকে তাকাই না। আর খাবার সময় আল্লাহকে স্মরণে রাখতে ভুলি না। প্রতিটি লোকমা খেয়েই ‘আলহামদুল্লিাহ’ বলি। আর খাওয়া শুরুর আগে ও খাওয়ার শেষে হাত ধুই।”
বহলুল উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন : “তুমি মানুষের মুরশিদ হতে চাও? অথচ কিভাবে খানা খেতে হয় তাও জানো না!” এ কথা বলেই তিনি সেখান থেকে রওয়ানা হলেন।
শেখ জুনাইদের মুরীদরা বললেন: “শেখ! আমরা তো আগেই বলেছি এই লোকটি পাগল।”
শেখ জুনাইদ বললেন: “তোমরা চুপ করো। আমি জানি, তিনি এমন এক পাগল যিনি নিজের দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতন। সঠিক ও হক কথা এমন পাগলের কাছ থেকেই শোনা উচিত।” এ কথা বলে শেখ জুনাইদ বহলুলের পেছনে ছুটলেন এবং বললেন : “তাঁর কাছে আমার প্রয়োজন আছে।”
বহলুল মরুভূমি থেকে দ্রুতবেগে চলে এসে একটি পোড়োবাড়ির ধ্বংসস্তূপে পৌঁছে বসে পড়লেন। জুনাইদও সেখানে পৌঁছে বললেন: “কে বলেছে যে, শেখ বাগদাদি খানা খেতে জানে না?”
বহলুল একথার জবাব না দিয়ে উল্টো জিজ্ঞেস করলেন : আমি বলেছি- তুমি খানা খেতে জানো না। ঠিক আছে, এবার বলো- কথা কিভাবে বলতে হয় তা কি তুমি জানো?”
শেখ জুনাইদ বললেন : “জ্বী, জানি।”
বহলুল বললেন : “তুমি কিভাবে কথা বলো?”
শেখ জুনাইদ বললেন : “ঠিক প্রয়োজন মতো ও পরিমাণ মতো কথা বলি; অসময় কথা বলি না, বেহিসাবি কথাও বলি না। শ্রোতাদের অনুধাবনক্ষমতা অনুযায়ী কথা বলি। মানুষকে আল্লাহ ও রসূলের দিকে আহ্বান করি। এত পরিমাণ কথা বলি না যাতে মানুষ আমার ওপর বিরক্ত হতে পারে। এছাড়া প্রকাশ্য ও গোপন জ্ঞানগত শর্তাবলী যথাযথভাবে রক্ষা করে কথা বলি।” এরপর তিনি কথা বলার যত রকম আব-কায়দা ও নিয়ম-কানুন আছে তার একটা বর্ণনা দিলেন।
সব শুনে বহলুল বললেন : “খানা খেতে তো জানোই না; এখন দেখছি কথা বলতেও জানো না।” একথা বলে বহলুল উঠে দাঁড়ালেন এবং শেখের গায়ে জামার বাতাস লাগিয়ে দিয়ে দ্রুত সেখান থেকে সরে পড়লেন।
এ দৃশ্য দেখে মুরীদরা বলল : “শেখ! দেখলেন তো, লোকটা পাগল। আপনি পাগলের কাছ থেকে কী আশা করছেন?”
শেখ জুনাইদ বললেন : “তাঁর কাছে আমার দরকার আছে; তোমরা এটা বুঝবে না।” এই বলে তিনি আবারো বহলুলের পেছনে ছুটলেন। জুনাইদ পৌঁছার পর বহলুল বললেন : “তুমি আমার কাছে কি চাও? তুমি তো খানা খেতে এবং কথা বলতে জান না। তাহলে কি ঘুমাতে জানো?”
শেখ জুনাইদ বললেন : “জ্বী, তা জানি।”
বহলুল বললেন : “তাহলে বল দেখি, তুমি কিভাবে ঘুমাও?”
শেখ জুনাইদ বললেন : “এশা’র নামায এবং তার পরবর্তী ইবাদত শেষ করার পর বিছানায় যাই। শুয়ে শুয়েই কালেমা শাহাদত পাঠ করি, এরপর ঘুমিয়ে পড়ি।"
বহলুল বললেন : “বুঝতে পেরেছি, তুমি ঘুমাতেও জান না।”
একথা বলে বহলুল চলে যেতে উদ্যত হলেন। তখন শেখ জুনাইদ তাঁর জামার প্রান্ত ধরে ফেললেন এবং অনুনয় করে বললেন, “হুজুর! আমি জানি না; আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে শিক্ষা দিন।”
বহলুল বললেন : “তুমি জানার দাবি করছিলে এবং বলছিলে: ‘জানি।’ এ কারণেই তোমার কাছ থেকে সরে যাবার চেষ্টা করছিলাম। এখন যেহেতু নিজের অজ্ঞতার কথা স্বীকার করেছ, তাই তোমাকে শেখাব।” তারপর বললেন : “জেনে রেখো, তুমি যা বললে তার সবই শাখা-প্রশাখা এবং প্রাসঙ্গিক বিষয়, আসল বিষয় নয়। খানা খেতে জানার মূলকথা হচ্ছে, খানা হালাল হতে হবে। খানা যদি হারাম হয় তাহলে একশবারও যদি আদব-কায়দার পুনরাবৃত্তি করো তাতে ফায়দা নেই, বরং এতে অন্তঃকরণে অন্ধকারের মাত্রাই বৃদ্ধি পাবে।”
জুনাইদ বললেন : “জাযাকাল্লাহ আল্লাহ আপনাকে পুরস্কৃত করুন।”
বহলুল বললেন : “কথা বলার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম অন্তর পবিত্র ও নিষ্কলুষ হতে হবে এবং উদ্দেশ্য সঠিক ও মহৎ হতে হবে। আর কথা বলতে হবে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে। যদি কোনো অসদুদ্দেশ্যে বা পার্থিব লক্ষ্য হাসিলের জন্য কথা বলো তাহলে তুমি যেভাবেই কথা বলো না কেন- সেসব কথা তোমার জন্যে আজাবের কারণ হবে। অতএব, এ জাতীয় কথা বলার চেয়ে চুপ থাকা ভালো।”
তারপর বহলুল বললেন : “আর ঘুমানো সম্পর্কে তুমি যা কিছু বললে তার সবই আনুষঙ্গিক ব্যাপার মাত্র। আসলে যা প্রয়োজন তা হচ্ছে, ঘুমাতে যাবার সময় তোমার অন্তরে যেন মুসলমানদের প্রতি কোনো হিংসা-বিদ্বেষ ও দুশমনি না থাকে। তোমার অন্তরে যেন দুনিয়া ও ধন-সম্পদের লোভ না থাকে। আল্লাহ তা‘আলার স্মরণ অন্তরে থাকা অবস্থায় ঘুমাতে যাবে।”
উপদেশগুলো শোনার পর শেখ জুনাইদ বাগদাদি বহলুলের হাতে চুমু খেলেন এবং তাঁর জন্য দোআ করলেন। মুরীদরা আগে বহলুলকে পাগল মনে করলেও শেখ জুনাইদ ও বহলুলের কথা শুনে নিজেদেরকে তুচ্ছ মনে করতে লাগল এবং তাঁদের পূর্ববর্তী আমলসমূহ অর্থহীন মনে হলো। তাঁরা বহলুলের কথা অনুযায়ী আমল করতে শুরু করল।
(আবদুল্লাহ ইবনে মোবারকের প্রতি বহলুলের উপদেশ)
আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক নামে সে যুগের এক বিখ্যাত ব্যক্তি একবার বহলুলের সাথে সাক্ষাৎ করতে এলেন। খোরাসানি স্কলার নামে পরিচিত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে মরুভূমিতে গিয়ে দেখা পেলেন। তিনি দেখলেন- বহলুল মরুভূমিতে বসে 'আল্লাহ আল্লাহ' বলে জিকির করছিলেন। মুবারক তাঁর সামনে গিয়ে তাঁকে সালাম দিলেন। বহলুলও সালামের জবাব দিলেন। আবদুল্লাহ বললেন : “হুজুর! আমাকে এমন কিছু নসিহত করুন যাতে এ দুনিয়ায় গুণাহ থেকে মুক্ত থেকে জীবনযাপন করতে পারি। কারণ, আমি একজন গুনাহ্গার ব্যক্তি এবং কিছুতেই গুণাহ থেকে বিরত থাকতে পারি না। আমাকে কোনো পথ দেখিয়ে দিন; আশা করি আপনার পবিত্র মুখের নসিহতে আমি গুণাহ থেকে বিরত থাকতে পারব।”
বহলুল বললেন: “দেখ, আবদুল্লাহ! আমি নিজেই দিশাহারা ব্যক্তি; নিজের চিন্তায় অস্থির। আমার কাছে তুমি কি আশা করতে পার? আমার যদি বুদ্ধি-জ্ঞান থাকত তাহলে লোকেরা আমাকে পাগল বলত না। পাগলের কথায় কি ফায়দা আছে? এতে কোনো প্রভাব সৃষ্টি হয় না। তুমি বরং অন্য কারো কাছে গিয়ে নসিহত চাও?”
আবদুল্লাহ বললেন: “বহলুল! লোকেরা পাগল বললেও পাগল যখন নিজের ব্যাপারে সতর্ক তখন সত্য কথা পাগলের কাছ থেকেই শোনা উচিত।”
এ কথায় বহলুল চুপ করে রইলেন। তখন আবদুল্লাহ পীড়াপীড়ি ও অনুনয় বিনয় করে বলতে লাগলেন: “হুজুর! আমাকে ফিরিয়ে দেবেন না; অনেক আশা নিয়ে আপনার কাছে এসেছি।?”
বহলুল মাথা তুলে বললেন : “আবদুল্লাহ। প্রথমে আমার সাথে অঙ্গীকার করো যে, এই পাগলের কথা অনুযায়ী কাজ করবে। তাহলে আমি তোমাকে এমন নসিহত করব যা তোমাকে সঠিক পথে ধরে রাখবে এবং তোমার আর গুণাহ হবে না। এ ব্যাপারে আমি তোমাকে চারটি শর্ত দেব; এ চারটি শর্ত তোমাকে মেনে চলতে হবে।”
আবদুল্লাহ বললেন : “আমি অঙ্গীকার করছি, আপনার দেয়া চারটি শর্তই মেনে চলব; এবার বলুন শর্তগুলো কী।”
বহলুল বললেন : “প্রথম শর্ত এই যে, তুমি যখন গুণাহ করবে এবং আল্লাহর হুকুমের বরখেলাফ করবে তখন তাঁর দেয়া রুজী ভোগ করবে না।”
আবদুল্লাহ বললেন : “তাহলে কার দেয়া রুজী ভোগ করব?”
বহলুল বললেন : “তুমি তো বুদ্ধিমান লোক; বিচারবুদ্ধির অধিকারী। অথচ এটা কি করে ঠিক মনে করো যে, নিজেকে আল্লাহর বান্দাহ বলে দাবি করবে, তাঁর দেয়া রুজী ভোগ করবে, আবার তাঁরই হুকুম অমান্য করবে! একটু ন্যায়নীতি ও নিরপেক্ষতার সাথে ভেবে দেখো, এটা কি বান্দাহ বা গোলাম হওয়ার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ?"
আবদুল্লাহ বললেন : “ঠিক বলেছেন। এবার দ্বিতীয় শর্ত বলুন।”
বহলুল বললেন : “দ্বিতীয় শর্ত এই যে, যখন আল্লাহর নাফরমানী করতে চাইবে তখন আল্লাহর রাজত্বে না থাকার চেষ্টা করো।”
আবদুল্লাহ বললেন: “এটা তো প্রথম শর্তের চেয়েও কঠিন। সর্বত্র আল্লাহর রাজত্ব; সকল জমিনই আল্লাহর; তাহলে কোথায় যাব?”
বহলুল বললন: “এটা খুবই জঘন্য কাজ যে, তাঁর দেয়া রিজিক ভোগ করবে এবং তাঁরই রাজত্বে থাকবে অথচ তাঁর হুকুম মানবে না। একটু ইনসাফের সাথে চিন্তা করে দেখ, বান্দাহ বা গোলাম হওয়ার সাথে এটা কি সামঞ্জস্যশীল?”আর আল্লাহ তো বলেই দিয়েছেনঃ
“নিঃসন্দেহে তাদেরকে তো আমারই দিকে ফিরে আসতে হবে; অতঃপর নিঃসন্দেহে আমারই ওপর তাদের হিসাব-নিকাশের এখতিয়ার বর্তাবে।” (সূরা-গাশিয়াহ্, আয়াত-২৫-২৬)
আবদুল্লাহ বললেন : “তৃতীয় শর্তটি কী?”
বহলুল বললেন : “তৃতীয় শর্ত হচ্ছে, যখন গুণাহ করতে চাইবে অর্থাৎ আল্লাহর হুকুমের বরখেলাফ করবে তখন এমন এক জায়গায় লুকিয়ে তা করবে- যেন আল্লাহ দেখতে না পান এবং তুমি কি করছ তা যেন আল্লাহ জানতে না পারেন। এরপ যা খুশী তাই করো।”
আবদুল্লাহ বললেন: “এটা সবচেয়ে কঠিন কাজ। কারণ, আল্লাহ তা’আলা সবকিছু জানেন ও দেখেন; তিনি সর্বত্র উপস্থিত, সবকিছুর পর্যবেক্ষক। বান্দাহ যা কিছু করে তিনি তার সবই দেখতে পান।”
বহলুল বললেন : “দেখা যাচ্ছে তুমি একজন বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন ও বুদ্ধিমান লোক। তুমি নিজেই জানো যে, তিনি সর্বত্র উপস্থিত, সবকিছুর পর্যবেক্ষক এবং সবকিছু জানেন। ভেবে দেখো, এটা কেমন জঘন্য কাজ যে, তাঁর রিজিক ভোগ করবে, তাঁর রাজত্বে থাকবে, অথচ তাঁরই উপস্থিতিতে তাঁর নাফরমানী করবে যা তিনি দেখতে ও জানতে পারবেন; আর এরপরও তুমি নিজেকে তাঁর বান্দাহ বলে দাবি করবে! আর আল্লাহ তা’আলা তো কুরআনে মজীদে এরশাদ করেছেন:
“জালেম গুনাহ্গাররা যা কিছু করেছে সে সম্পর্কে আল্লাহকে বে-খবর নন।” (সূরা-ইবরাহীম, আয়াত-৪২)
আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক বললেন : “ঠিকই বলেছেন হুজুর। এবার চতুর্থ শর্ত বলুন।”
বহলুল বললেন : “চতুর্থ শর্ত এই যে, হঠাৎ করে যখন মৃত্যুর ফেরেশতা এসে হাজির হবে তখন তাঁকে বলবে: একটু অপেক্ষা করো, আমি আমার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এবং সকলের কাছ থেকে দাবি-দাওয়া ও অভিযোগের ক্ষমা চেয়ে আসি, আর আখেরাতের জন্যে কিছু পাথেয় সংগ্রহ করে আসি; এরপর আমার প্রাণ হরণ করো।”
আবদুল্লাহ বললেন: “এটা সবচেয়ে কঠিন শর্ত। কারণ, ওই সময় মৃত্যুর ফেরেশতা কাউকেই অবকাশ দেয় না।”
বহলুল বললেন : “ওহে বুদ্ধিমান লোক! তুমি এটাও জানো যে, মৃত্যুকে এড়াবার কোনো পথ নেই এবং মৃত্যুর ফেরেশতা হাজির হবার পর এক মুহূর্তও অবকাশ দেয় না। আর আল্লাহ তা’আলাও এরশাদ করেছেন :
“যখন তাদের শেষ সময় এসে হাজির হবে তখন এক মুহূর্ত অগ্র-পশ্চাত হবে না।” (সূরা-আ‘রাফ, আয়াত-৩৪); অতএব, আবদুল্লাহ! পাগলের কাছ থেকে সঠিক কথা শোনো এবং শৈথিল্য ও উদাসীনতার নিদ্রা হতে জাগ্রত হও। গর্ব-অহঙ্কার ও হীনতা-নীচতা থেকে মুক্ত হও। পরকালের কাজে যত্মবান হও। কারণ, তোমার সামনে এক দীর্ঘ পথ পড়ে আছে; অতএব, এই সংক্ষিপ্ত জীবন থেকে সে পথের জন্যে পাথেয় সংগ্রহ করে নাও। আজকের কাজ কালকের জন্যে রেখে দিও না। কারণ, তোমার জীবনে কালকের দিনটি না-ও আসতে পারে। অতএব, এখনকার এই মুহূর্তটাকে মূল্যবান মনে করো এবং আখেরাতের কাজে শৈথিল্য করো না। কালকে যাতে সেখানে লজ্জিত না হতে হয় সে লক্ষ্যে আজকেই আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করে নাও।”
আব্দুল্লাহ, এ হৃদয়স্পর্শী নসিহত শুনে মাথা নত করলেন এবং চিন্তায় নিমগ্ন হলেন।
বহলুল বললেন : “আবদুল্লাহ! তুমি এই পাগলের কাছে এমন উপদেশ চেয়েছ যা আগামীদিন তোমার কাজে আসবে। শোনো, তোমার জন্য এমন কিছু বলতে চাই যাতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই। তুমি মাথা নীচু করে আছ কেন? কিয়ামতের দিন যখন হিসাব নেয়া হবে সে সম্পর্কে ভাবছ? নাকি আযাবের ফেরেশতার প্রশ্ন সম্পর্কে? আজ যদি এখানে তোমার হিসাব-নিকাশ পরিস্কার থাকে তাহলে সেখানে তোমার ভয়ের কি আছে?
আবদুল্লাহ মাথা তুলে বললেন: “জনাব বহলুল! আপনার হৃদয়স্পর্শী নসিহত মন-প্রাণ দিয়ে শুনেছি এবং চারটি শর্তকেই মেনে নিয়েছি।
বহলুল বললেন : “আবদুল্লাহ! বান্দাহ যা কিছু করবে কেবল আল্লাহর হুকুম পালনের জন্যই করবে। তেমনি যা কিছু বলবে ও শুনবে তাও আল্লাহর হুকুমের অনুবর্তী হয়ে। আর এ ধরনের বান্দাহই হচ্ছে আল্লাহর বান্দাহ।” (সূত্র- জ্ঞানী বহলুল ও খলীফা হারুন)
বন্ধুরা, শেখ জুনাইদ বাগদাদি ও আবদুল্লাহ ইবনে মুবারকের প্রতি জ্ঞানী বহলুলের উপদেশগুলো জানলে। আশা করি এ উপদেশগুলো তোমরাও কাজে লাগাবে। সেইসঙ্গে নিজেকে জানার জন্য এবং আল্লাহকে চেনার জন্য জ্ঞানার্জনের চেষ্টা করবে-কেমন? #
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/ মো: আবু সাঈদ/১৩